বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বর্তমানে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে বলে মনে করেন কাজী সারওয়ার হাবিব।
কাজী সারওয়ার হাবিব একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, বিজিএমইএর উপদেষ্টা এবং ১৪ বারের এনআরবি-সিআইপি। তিনি চার দশক ধরে জাপানে বসবাস করছেন। জাপান ও বাংলাদেশে তার একাধিক ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্মাননাপ্রাপ্ত এই ব্যবসায়ী দুই দেশের বাণিজ্য সম্ভাবনা, তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের সম্প্রসারণ, ভিসা জটিলতা নিরসন, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে কথা বলেছেন।
জাপানের স্থানীয় সময় বুধবার বিকেলে টোকিওর তারকা হোটেল নিউ ওতানিতে ঢাকা মেইল-এর প্রধান প্রতিবেদক বোরহান উদ্দিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি।
প্রশ্ন: জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সম্ভাবনা কতটা?
কাজী সারওয়ার হাবিব: জাপান বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক আমদানিকারক দেশ। দেশটি প্রতিবছর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করে। বাংলাদেশ বিশ্বমানের পোশাক তৈরি করলেও জাপানের বাজারে এখন পর্যন্ত মাত্র ১.৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করতে পেরেছে।
এ বছর বিজিএমইএতে জাপান ডেস্ক চালু হয়েছে। বিজিএমইএর ৫২ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো জাপানি রাষ্ট্রদূত প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছেন। জাপানের পক্ষ থেকে আগামীতে বাংলাদেশ থেকে ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক কেনার প্রত্যাশার কথা জানানো হয়েছে। এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য বড় সম্ভাবনা।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) রপ্তানি বাড়াতে কীভাবে ভূমিকা রাখবে?
কাজী সারওয়ার হাবিব: বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (ইপিএ) আওতায় প্রায় ৭ হাজার ৩৯৮টি পণ্য, অর্থাৎ রপ্তানি পণ্যের ৯৮ শতাংশ ট্যাক্স-ফ্রি সুবিধা পাচ্ছে। এই সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বহুগুণ বেড়ে যাবে।
প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন? এ সফরে বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা কতটা?
কাজী সারওয়ার হাবিব: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই জাপান সফরকে আমি স্বপ্নের মতো একটি সফর হিসেবে দেখছি। টোকিওতে আমাদের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও গভর্নর মেস্তাকুর রহমানের সঙ্গে জাপানের ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দের অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।

এই সফরে প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে আমাদের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতি জাপান সরকারকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আরও বেশি উৎসাহিত করছে।
প্রশ্ন: জাপানি বিনিয়োগকারী ও ক্রেতাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে?
কাজী সারওয়ার হাবিব: জাপানি বিনিয়োগকারী ও ক্রেতাদের বাংলাদেশে ধরে রাখতে এবং তাদের যাতায়াত সহজ করতে ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ করা জরুরি। ভিসা পেতে দীর্ঘসূত্রিতা থাকলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়।
জাপানের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড ইউনিক্লো ও মুজির পক্ষ থেকেও বর্তমানে কর্মরত জাপানি ও বাংলাদেশি কর্মীদের অনুপাত এবং ভিসা প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা কমানোর বিষয়ে বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে। সরকারের উচিত বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে এসব ছোটখাটো বাধা দূর করা। এতে দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়বে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ আরও সহজ হবে।
প্রশ্ন: জাপানের বাজারে ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?
কাজী সারওয়ার হাবিব: জাপানের বাজারে ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভাষা ও সাংস্কৃতিক ব্যবধান। জাপানের ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান না থাকলে সেখানে কাজ করা এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে এ ক্ষেত্রে তরুণদের জন্য বড় সম্ভাবনাও রয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী যদি বাংলাদেশে বসেই এক থেকে দেড় বছর জাপানি ভাষা শেখে, বিশেষ করে এন-২ লেভেল অর্জন করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশেই ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত বেতনের চাকরি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাপানে দক্ষ ও জাপানি ভাষায় পারদর্শী জনশক্তির প্রচণ্ড চাহিদা রয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জাপানি ভাষা শিক্ষার প্রসার ঘটাতে পারলে তা দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখবে।
প্রশ্ন: জাপানে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কী ধরনের সুযোগ রয়েছে?
কাজী সারওয়ার হাবিব: আমি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে জাপানে বসবাস করছি। জাপানি একটি বহুজাতিক কোম্পানির সাউথ এশিয়া হেডের দায়িত্বেও ছিলাম। আমার অভিজ্ঞতায়, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য জাপান অত্যন্ত উপযোগী একটি দেশ।
বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় জাপানে পড়াশোনার খরচ কম। পাশাপাশি সেখানে প্রচুর স্কলারশিপের সুযোগ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি দক্ষতা অর্জনেরও ভালো সুযোগ রয়েছে।
তরুণরা জাপানে পড়াশোনা শেষে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারে। একই সঙ্গে তারা দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নে অবদান রেখে বাংলাদেশের জন্য বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
বিইউ/এআর




