- ছেলেকে হত্যা করে নদীতে ফেলার দাবি বাবার
- সুরতহালে শরীরে মেলেনি আঘাতের চিহ্ন
- বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে নিখোঁজ
- মৃত্যুর কারণ নিয়ে রহস্য, তদন্তে নৌপুলিশ
- ভিডিও ফাঁসের সঙ্গে মৃত্যুর যোগসূত্র নিয়ে সহপাঠীর সন্দেহ
বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের পর তার মৃত্যু নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। রাজধানীর উত্তরখানের তুরাগ নদের রাজবাড়ি ঘাট থেকে উদ্ধার করা মরদেহের সুরতহাল ও ময়নাতদন্তে শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে পরিবারের দাবি, তাহসিফ আত্মহত্যা করেননি; তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটি হত্যা, আত্মহত্যা নাকি দুর্ঘটনা, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না নৌপুলিশ। তাহসিফের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন অনেকে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর সোয়া ২টায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে তাহসিফের মরদেহ তার বাবার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সুরতহাল প্রতিবেদনে যা মিলল
মরদেহ উদ্ধারের পর বৃহস্পতিবার সকালে গাজীপুরের টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মুস্তাফিজুর রহমান তাহসিফ সাউরির মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া মরদেহটি তাহসিফের বলে শনাক্ত করেন তার খালাতো ভাই জহির হাসান। মরদেহের মাথার চুল কালো, উচ্চতা আনুমানিক ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। কপাল স্বাভাবিক এবং মুখমণ্ডল গোলাকার। মুখ ও চোখ বন্ধ ছিল। নাক দিয়ে রক্ত বের হতে দেখা গেছে। তার ছোট ছোট কালো দাড়ি ও গোঁফ ছিল। মরদেহের দুই হাত মাথার সামনের দিকে বাঁকানো ছিল। হাতের মুঠো খোলা অবস্থায় পাওয়া যায়। বুক, পেট, পিঠ ও দুই পা স্বাভাবিক ছিল। শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে পেট ফোলা দেখা গেছে।
এ বিষয়ে টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ফিরোজ উদ্দিন ঢাকা মেইলকে জানান, বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদের রাজবাড়ি ঘাট এলাকায় পানিতে ভাসমান অবস্থায় এক ব্যক্তির মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে জানা যায়, মরদেহটি তাহসিফ সাউরির। তিনি বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট।
ফিরোজ উদ্দিন বলেন, কচুরিপানার মধ্য থেকে পানিতে ভাসমান অবস্থায় মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। এ সময় তার পরনে ছিল সাদা ট্রাউজার ও কালো জামা। মরদেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
স্বজনেরা যা বলছেন
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ঢাকা মেইলকে বলেন, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার পর এক বন্ধু বাসায় এসে তাহসিফকে ডাকেন। তখন তাহসিফ তার মাকে বলেন, নিচে গিয়ে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে আসবেন। এরপর তিনি আর বাসায় ফেরেননি। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তিনি বলেন, ছেলের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতেন। তাহসিফ তার সঙ্গে অনেক কিছু শেয়ার করতেন। এমনকি ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও কথা বলতেন। চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার কারণে কিছুটা খারাপ লাগা স্বাভাবিক হলেও এ নিয়ে তার বড় কোনো সমস্যা ছিল না। তাহসিফ অত্যন্ত ভদ্র ও সামাজিক ছিলেন। কারও সঙ্গে তার ঝগড়া-বিবাদ বা কোনো ধরনের বিরোধ ছিল বলে মনে হয় না।
তাহসিফের বাবা বলেন, ছেলের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। তাই ছেলের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি ধারণা রাখতেন। তার বিশ্বাস, তাহসিফ আত্মহত্যা করেননি; বরং তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাহসিফের আত্মহত্যা করার প্রশ্নই আসে না। তিনি অত্যন্ত প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। বিমানবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হতে তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। বিভিন্ন কোর্স সম্পন্ন করার পাশাপাশি উড্ডয়নেও তিনি ভালো ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, তাহসিফ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও নেত্র নিউজের সঙ্গে কাজ করেছেন। সবশেষ ভার্গ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসন ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কয়েক দিন আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হওয়ায় তিনি বিশ্রামে ছিলেন।
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার দিন মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করেছিলেন এবং বাবার জন্যও কেনাকাটা করেছিলেন। এরপর বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে বাসার নিচে যাওয়ার কথা বলে বের হন। বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে এমন ঘটনা ঘটবে, তা পরিবারের কেউ ভাবতে পারেননি।
সহপাঠীর ফেসবুক পোস্টে নানা প্রশ্ন
তাহসিফের সহপাঠী কেএসএম ইনতিসার ইনজিমাম। তারা আদমজী কলেজে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন। পরে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ৭৯ বিএমএ ইক্যুইভ্যালেন্ট কোর্সে একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেন। তাহসিফের মৃত্যুর পর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ইনতিসার লেখেন, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মরদেহ তুরাগ নদে ভেসে এসেছে। ৫ আগস্টের ঘটনার একটি ভিডিও ভাইরাল করার সঙ্গে তাহসিফের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
ইনতিসার লেখেন, গত পরশু রাতে তাহসিফ বাইরে যাওয়ার পর এ ঘটনা ঘটে। মরদেহের ছবিতে তার হাতে কাদা দেখা গেলেও শরীরের বাকি অংশ পরিষ্কার ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে বিষয়টি ব্যক্তিগত বিরোধ নাকি দুর্ঘটনা, তা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চান না বলেও জানান।
ফেসবুক পোস্টে ইনতিসার আরও উল্লেখ করেন, তাহসিফ আদমজী কলেজে তার বন্ধু ছিলেন। পরে তারা বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ৭৯ বিএমএ ইক্যুইভ্যালেন্ট কোর্সে একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেন। দুজনের জীবনদর্শনে পার্থক্য থাকলেও তাহসিফ তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন বলে জানান তিনি।
ইনতিসারের দাবি, ৫ আগস্টের ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর বিভিন্ন বিষয়ে তাহসিফের মানহানি করা হয়েছিল। তবে তার জানা মতে, তাহসিফের বিরুদ্ধে কোনো পুলিশি মামলা হয়নি। এ কারণে তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে ওই ভিডিও ফাঁসের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। পোস্টে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ৫ আগস্টের ঘটনার আগেও তাহসিফের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল এবং তখন তাহসিফ নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছিলেন।
যা বলছে পুলিশ
নৌপুলিশের সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন ঢাকা মেইলকে বলেন, মরদেহের শরীরে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মরদেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরখান থানার ইনচার্জ (অপারেশন) সুব্রত দেবনাথ ঢাকা মেইলকে বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। সেখানে গিয়ে পুলিশ দেখতে পায়, রাজবাড়ি ঘাট এলাকায় তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসছে। বিষয়টি নৌপুলিশকে জানানো হলে তারা এসে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে নিয়ে যায়।
তিনি বলেন, ঘটনাটি পুরোপুরি নৌপুলিশ তদন্ত করছে। এখন পর্যন্ত থানায় পরিবারের কোনো সদস্য অভিযোগ করেননি বা এ-সংক্রান্ত কোনো কিছু জমা দেননি।
একেএস/এআর




