মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

৩০০ কোটি টাকার প্রকল্পে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন কতটা বাস্তব?

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০১ পিএম

শেয়ার করুন:

৩০০ কোটি টাকার প্রকল্পে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন কতটা বাস্তব?
  • প্রকল্পে সরকার দেবে ২৫৫ কোটি টাকা
  • সুইজারল্যান্ড দেবে ৪৫ কোটি টাকার অনুদান
  • ডিজিটাল সেবায় বরাদ্দ ৩০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা
  • চালু হবে ডিজিটাল ওয়ানস্টপ সেবা কেন্দ্র
  • ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেবে

স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী না হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত থেকে যায়। অথচ কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিল্প ও সেবাভিত্তিক নানা কর্মকাণ্ড ঘিরে বিভিন্ন পৌরসভায় অর্থনৈতিক বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। কোনো এলাকায় কৃষিপণ্য ঘিরে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে, কোথাও ক্ষুদ্র শিল্প ও স্থানীয় বাজারকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা আছে। কিন্তু বিনিয়োগের অভাব, ব্যবসা পরিচালনায় নানা সীমাবদ্ধতা এবং পৌরসভার সেবার দুর্বলতায় অনেক ক্ষেত্রেই এসব সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

এমন পরিস্থিতিতে দেশের আট বিভাগের ৭০টি পৌরসভায় স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প নিচ্ছে সরকার। তবে এই বিনিয়োগ স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও আয় বৃদ্ধিতে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

‘প্রবৃদ্ধি : নির্বাচিত পৌরসভায় স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ২৫৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা এবং সুইজারল্যান্ডের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সুইস ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের অনুদান ৪৫ কোটি টাকা। স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন।

প্রকল্পটির লক্ষ্য নির্বাচিত পৌরসভাগুলোতে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাঠামো গড়ে তোলা, নাগরিক সেবার মান বাড়ানো, পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করা। এর পাশাপাশি নারী, যুব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়িয়ে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের ব্যয় বিভাজন অনুযায়ী, ৭০টি পৌরসভায় স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাঠামো বাস্তবায়নে অনুদান হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৯৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। পৌরসভাগুলোর ডিজিটাল সেবা চালু করতে ৩০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ২৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে দুই কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং গবেষণায় ১৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় পৌরসভাগুলোতে ডিজিটাল ওয়ানস্টপ সেবা কেন্দ্র ও ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা হবে। এতে নাগরিকদের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন সেবা গ্রহণ সহজ হওয়ার কথা। একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসার সম্ভাবনা চিহ্নিত করা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির মাধ্যমে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সাত পৌরসভায় আগের প্রকল্পের অভিজ্ঞতা

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ‘প্রবৃদ্ধি : স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে নির্বাচিত সাতটি পৌরসভায় ‘বাংলা এলইডি মডেল’ চালু করা হয়েছিল। পৌরসভা, বেসরকারি খাত ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত অংশগ্রহণের ভিত্তিতে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়।

প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রমে প্রায় ৩৮ হাজার উদ্যোক্তা এবং ৫০ হাজার সেবাগ্রহীতা সরাসরি উপকৃত হয়েছেন বলে পরিকল্পনা কমিশনের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময়ে প্রায় ৪৯ হাজার ১১১টি নতুন কর্মদিবস সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আয় বেড়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট পৌরসভাগুলো অতিরিক্ত প্রায় আট কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।

প্রথম পর্যায়ে পৌরসভার প্রতিনিধি, বেসরকারি খাত ও অন্যান্য অংশীজনদের নিয়ে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কমিটি গঠন করা হয়। এর মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতির সম্ভাবনা চিহ্নিত করা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

আগের পর্যায়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবার প্রকল্পের আওতা সাতটি থেকে বাড়িয়ে ৭০টি পৌরসভায় নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে আগের পর্যায়ে উপকৃত উদ্যোক্তা ও সেবাগ্রহীতার সংখ্যা দিয়ে নতুন প্রকল্পের কর্মসংস্থান সৃষ্টির সাফল্য নির্ধারণ করা যাবে না। একইভাবে প্রায় ৪৯ হাজার কর্মদিবস সৃষ্টি এবং স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরির মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। কতজন দীর্ঘমেয়াদি কাজ পেয়েছেন, কতটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখনো কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং উদ্যোক্তাদের আয় বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা কতটা বজায় রয়েছে, সেসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।

কর্মসংস্থান সংকটে পড়বে ৮০ কোটি তরুণ, বাড়ছে চাপ

বরাদ্দের বড় অংশ উন্নয়ন কাঠামো বাস্তবায়নে 

প্রকল্পের মোট ব্যয়ের বড় অংশই ব্যয় হবে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাঠামো বাস্তবায়নে। এ খাতে ১৯৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ডিজিটাল সেবা চালু করতে ৩০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের জন্য ২৮ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। প্রশিক্ষণ ও গবেষণার জন্য বরাদ্দ যথাক্রমে দুই কোটি ৯৫ লাখ ও ১৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

প্রকল্পের মাধ্যমে পৌরসভাগুলোর রাজস্ব আদায় ব্যবস্থার উন্নয়ন, স্থানীয় ব্যবসার সম্ভাবনা চিহ্নিত করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার উদ্যোগও নেওয়া হবে। নারী, যুব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।

তবে শুধু ডিজিটাল সেবা চালু বা অনুদান বিতরণ করলেই কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে না। উদ্যোক্তাদের পুঁজি, বাজারে প্রবেশের সুযোগ, পণ্য বিপণন এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও তাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্থানীয় চাহিদা ও বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে একই ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হলে সব পৌরসভায় সমান সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।

নির্বাচনে বিবেচনায় নানা সূচক

প্রকল্পের আওতায় দেশের আট বিভাগের ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ শ্রেণির ৭০টি পৌরসভা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, পৌরসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, জনসংখ্যা ও সেবার চাহিদা, দারিদ্র্য ও উন্নয়ন ঘাটতি, স্থানীয় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের সুযোগ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নিজস্ব রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা, ডিজিটাল সেবা ও ই-পেমেন্ট চালুর প্রস্তুতি, যোগাযোগব্যবস্থা, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ভূমিকা এবং জলবায়ু ও ভৌগোলিক ঝুঁকিও বিবেচনায় ছিল।

তবে পৌরসভাগুলোর অর্থনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। কোথাও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের সুযোগ বেশি, কোথাও ক্ষুদ্র শিল্প বা সেবাভিত্তিক ব্যবসার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে পৌরসভার কর নির্ধারণ, রাজস্ব আদায় ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করেও প্রত্যাশিত রাজস্ব বৃদ্ধি অর্জন কঠিন হতে পারে।

গত ১৪ জুন ২০২৬ তারিখে পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভার সিদ্ধান্তের আলোকে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পুনর্গঠন করে পাঠানো হয়েছে। কমিশন ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে।

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (ভারপ্রাপ্ত সচিব) কবির আহমেদ জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নির্বাচিত পৌরসভাগুলোতে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে, রাজস্ব ও সেবাদানের সক্ষমতা বাড়বে এবং ডিজিটাল সেবা, উদ্যোক্তা সহায়তা ও বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।

এএইচ/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর