রাজধানীর ফুটওভারব্রিজে পথচারীদের ওঠানামা সহজ করতে চলন্ত সিঁড়ি (এসকেলেটর) স্থাপন করা হলেও সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও দীর্ঘদিন ধরে সিঁড়ি অচল, কোথাও যন্ত্রাংশ চুরি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বন্ধ হয়ে আছে। অন্যদিকে, নতুন প্রকল্পেও যুক্ত হচ্ছে ব্যয়বহুল এই ব্যবস্থা। ফলে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ কতটা সফল হচ্ছে এবং এর পেছনে ব্যয় করা অর্থের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নগর পরিকল্পনাবিদেরা।
রাজধানীর নিউ মার্কেটে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্মিত নতুন ফুটওভারব্রিজে চলন্ত সিঁড়ি যুক্ত করা হয়েছে। নয় কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ব্রিজটি উদ্বোধন করা হয় ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। পথচারীদের নিরাপদ পারাপার ও ওঠানামা সহজ করার উদ্দেশ্যে নেওয়া এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। উদ্বোধনের কয়েক মাসের মধ্যেই ব্রিজটির বড় অংশ হকারদের দখলে চলে যায়। এতে পথচারীদের চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে চলন্ত সিঁড়িটিও বন্ধ থাকায় প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পথচারীরা।
নিউ মার্কেট ফুটওভারব্রিজের চলন্ত সিঁড়িটি নিয়মিত সচল থাকা নিয়ে পাশেই দায়িত্ব পালন করা নিউ মার্কেটের একজন নিরাপত্তাকর্মী জানান, নির্মাণের পর চলন্ত সিঁড়িটি মাত্র তিন দিন অল্প সময়ের জন্য চালু করা হয়েছিল। এরপর থেকে সেটি নিয়মিত চালু থাকতে দেখা যায়নি।

শুধু নিউ মার্কেট নয়, ঢাকার অন্যান্য ফুটওভারব্রিজেও চলন্ত সিঁড়ির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত এসব সিঁড়ির কোনোটি দীর্ঘদিন অচল পড়ে থেকেছে, আবার কোনোটি মেরামতের পর চালু হয়েছে। ফলে চলন্ত সিঁড়ি স্থাপনের পাশাপাশি সেগুলো সচল রাখার ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর ফার্মগেট ফুটওভারব্রিজের চলন্ত সিঁড়িটি বন্ধ রয়েছে। এটি কবে চালু করা হয়েছিল, সে বিষয়ে জানেন না অনেক পথচারী। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ফুটওভারব্রিজটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের এক সপ্তাহের মধ্যেই এর এসকেলেটর বন্ধ হয়ে যায় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বর্তমানে সিঁড়িটির অবস্থা নিয়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন নিয়মিত ব্যবহারকারীরা। ফার্মগেট ফুটওভারব্রিজ ব্যবহারকারী পথচারী ফাদিন খান বলেন, উদ্বোধনের কিছুদিন পর থেকেই চলন্ত সিঁড়িটি দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। তবে কিছুদিন ধরে সেটি আবার চালু হয়েছে এবং এখন নিয়মিত চলছে।
বিমানবন্দর বাসস্ট্যান্ডের ফুটওভারব্রিজের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের। ২০১৭ সালে স্থাপিত সেখানকার চলন্ত সিঁড়ি প্রথম দিকে সচল থাকলেও পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিজটির দুই পাশের এসকেলেটর দুই বছরের বেশি সময় ধরে অচল ছিল। এতে বয়স্ক ব্যক্তি ও শারীরিকভাবে দুর্বল পথচারীদের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
_20261024_063950964.jpg)
এমন পরিস্থিতিতে চলন্ত সিঁড়ি স্থাপনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান। তার মতে, ঢাকায় চলন্ত সিঁড়ি স্থাপনের আগে এর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি ছিল। কারণ, যন্ত্র স্থাপন করাই শেষ কথা নয়; সেটি নিয়মিত সচল রাখা এবং নাগরিকদের সেবা নিশ্চিত করাও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘বাংলাদেশে চলন্ত সিঁড়ি কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায় না এমন অভিজ্ঞতার কথা বারবার বলা হয়েছে। এরপরও কেন এ ধরনের প্রকল্পে চলন্ত সিঁড়ি যুক্ত করতে হলো? ঢাকার অধিকাংশ চলন্ত সিঁড়িই অচল পড়ে থাকে। ঢাকার মতো শহরে এই ব্যবস্থা কতটা উপযোগী, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারপরও এ ধরনের প্রকল্প অব্যাহত রাখা হচ্ছে এবং চলন্ত সিঁড়ি যুক্ত করে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত যদি এসব যন্ত্র অচলই পড়ে থাকে, তাহলে প্রকল্পে চলন্ত সিঁড়ি যুক্ত করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের নাগরিকের অর্থ অপচয়ের দায় নিয়ে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।’
এম/এসআই




