বাংলাদেশে ই-সিগারেট, ভেপ, নিকোটিন পাউচসহ সব ধরনের নতুন তামাক ও নিকোটিন পণ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও তামাকবিরোধী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। এ জন্য আলাদা আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তামাক কোম্পানির অপপ্রচার ও কৌশল মোকাবিলায় তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে ইমার্জিং টোব্যাকো ও নিকোটিন পণ্যের মুখোশ উন্মোচন এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলে ধরা’ শীর্ষক ওয়েবিনারে নতুন এসব পণ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি, বাজারজাতকরণ এবং আইনি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়।
ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব করেন টিসিআরসির প্রকল্প পরিচালক ও ডিআইইউর সহযোগী অধ্যাপক মো. বজলুর রহমান। সঞ্চালনা করেন সেলের জ্যেষ্ঠ প্রকল্প কর্মকর্তা মো. জুলহাস আহমেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্প সমন্বয়ক ফারহানা জামান লিজা।
মূল প্রবন্ধে ফারহানা জামান লিজা বলেন, ই-সিগারেট, ভেপ, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট ও নিকোটিন পাউচের মতো নতুন তামাক ও নিকোটিন পণ্য প্রচলিত তামাকপণ্যের পাশাপাশি দ্রুত বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। কোম্পানিগুলো প্রায় ১৬ হাজার ধরনের স্বাদ ব্যবহার করে এসব পণ্যকে স্বাস্থ্যকর ও আধুনিক হিসেবে প্রচার করছে। এর প্রধান লক্ষ্য কিশোর ও তরুণেরা। অথচ এসব পণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক রয়েছে, যা নিকোটিনের আসক্তি তৈরি করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি বাড়ায়।
তিনি বলেন, বিশ্বের ১৩২টি দেশ ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করেছে। এর মধ্যে ৪৬টি দেশে পণ্যটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর জারি করা অধ্যাদেশে এসব পণ্য নিষিদ্ধ করা হলেও ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে আইন পাসের সময় ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট ও ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিধান বাদ পড়ে যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার দাবি, তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপে আইনের সংজ্ঞা ও নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত বিধান বাদ দেওয়ায় বর্তমানে এসব পণ্যের ওপর কার্যকর আইনি বিধিনিষেধ নেই।
ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের কারিগরি উপদেষ্টা আমিনুল ইসলাম সুজন, ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের কর্মসূচি প্রধান সৈয়দা অনন্যা রহমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের প্রকল্প পরিচালক হামিদুল ইসলাম হিল্লোল।
সৈয়দা অনন্যা রহমান বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো নতুন তামাক ও নিকোটিন পণ্যকে জনপ্রিয় করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। এসব পণ্যের পক্ষে প্রচার চালানোর পাশাপাশি বিভ্রান্তিকর গবেষণার মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিপরীতে পণ্যগুলোর স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলে ধরা গবেষণাগুলো তেমন প্রচার পায় না।
তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র, যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেল এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় এসব পণ্যের ঝুঁকি নিয়ে তথ্য রয়েছে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে তরুণেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তারা গবেষণা, সংবাদপত্রে লেখালেখি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
আমিনুল ইসলাম সুজন বলেন, নতুন তামাক ও নিকোটিন পণ্যে থাকা নিকোটিন ব্যবহারকারীদের আসক্ত করে এবং স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। তরুণদের এসব পণ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং তামাক কোম্পানির কৌশলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
তিনি দাবি করেন, ই-সিগারেটের তরলের সঙ্গে এমডিএমবি নামের মাদক ব্যবহারের ঘটনাও শুরু হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এসব পণ্য নিষিদ্ধের দাবিতে সরকারের ওপর চাপ তৈরিতে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে।
হামিদুল ইসলাম হিল্লোল বলেন, ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচের ওপর কর আরোপের মাধ্যমে এসব পণ্যকে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ দেশের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। সাময়িক রাজস্ব আয়ের আশায় নতুন আসক্তির বাজার তৈরি হলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাসের কারণে অর্থনীতিকে আরও বেশি মূল্য দিতে হবে।
তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির স্বার্থে সব ধরনের নতুন তামাক ও নিকোটিন পণ্যের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা নীতিনির্ধারকদের ওপর কার্যকর চাপ তৈরি করতে পারে।
ওয়েবিনারে অংশ নেওয়া ডিআইইউর শিক্ষার্থী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও তামাকবিরোধী সংগঠনের প্রতিনিধিরাও এসব পণ্য নিষিদ্ধের পক্ষে মত দেন। তারা বলেন, তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে এসব পণ্য নিষিদ্ধের দাবিতে ছাত্রসমাজকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তারা।
এএইচ/এএম




