রাজধানীর যানজট কমানো, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ৪ হাজার আধুনিক বাস ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক পরিচালনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বাসসেবা বাধ্যতামূলক করা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে লেখা এক খোলা চিঠিতে তিনি এসব প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। চিঠিতে পরিবহন খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ, বিআরটিসির বাস ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং রেল ও নৌপরিবহনের উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
চিঠিতে সাইদুর রহমান বলেন, রাজধানীর যানজট কমাতে রুট রেশনালাইজেশনের আওতায় আধুনিক বাস দিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক পরিবহনসেবা চালু করা প্রয়োজন। পুরোনো বাস দিয়ে এই ব্যবস্থা চালু করলে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীদের গণপরিবহনে আগ্রহী করা কঠিন হবে। এতে যানজট কমানোর মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হবে না।
তার প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজধানীতে ৪ হাজার আধুনিক বাস চালু করতে সর্বোচ্চ ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। এতে ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার কমবে এবং গণপরিবহনে যাতায়াত আরও স্বাচ্ছন্দ্যকর হবে।
নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা বাস চালুর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী অনেক নারী এই সেবার আওতায় আসতে পারছেন না। ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক আধুনিক বাসসেবা চালু হলে সব বাসকে নারীবান্ধব করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
রাজধানীর যানজট কমাতে মেট্রোরেল, পাতালরেল, সার্কুলার সড়ক ও ওয়াটার বাসের মতো প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে তিনি বলেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থের প্রয়োজন। তাই তুলনামূলক কম ব্যয়ে যানজট কমানোর উপায় হিসেবে আধুনিক বাসসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক যানজট কমাতে রাজধানীর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব বাসসেবা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছেন সাইদুর রহমান। তার মতে, সকালে ও দুপুরে শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ার জন্য বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ি সড়কে নামে। শিক্ষার্থীদের বাসে যাতায়াত নিশ্চিত করা গেলে সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ কমবে। প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাস কেনার জন্য ঋণ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।
বিআরটিসির বাস ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থাটির বিপুলসংখ্যক বাস বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ইজারা দেওয়া হয়। এসব বাস সকালে প্রতিষ্ঠানের কর্মী বা শিক্ষার্থীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে দিনের বড় অংশ অব্যবহৃত থাকে। অথচ রাজধানীর অনেক মানুষ জরাজীর্ণ বেসরকারি বাসে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিআরটিসির প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে বাস পরিচালনার লোকসান বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। যেসব প্রতিষ্ঠান বিআরটিসির বাস ইজারা নেয়, সেসব প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি মালিকদের কাছ থেকে বাস ইজারা নেওয়া অথবা নিজস্ব অর্থায়নে কিংবা সরকারি ঋণে বাস কেনার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।
সরকারের বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগকে ইতিবাচক উল্লেখ করে সাইদুর রহমান বলেন, এসব বাস পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বিআরটিসির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। অতীতে উন্নতমানের বাস রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল হয়ে পড়ার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বৈদ্যুতিক বাসসেবায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করার পরামর্শ দেন।
দেশের শহরাঞ্চলে অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার যানজট ও সড়ক নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকায় মানুষ সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী অটোরিকশার ওপর নির্ভর করছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানসম্মত গণপরিবহন নিশ্চিত করার পাশাপাশি অটোরিকশার বিকল্প গড়ে তুলতে হবে।
অটোরিকশার নিবন্ধন ও চলাচল নিয়ন্ত্রণে পর্যায়ক্রমে তথ্যভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে গ্রাম ও শহরকেন্দ্রিক কৃষি ও শিল্পখাতে কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।
পরিবহনখাতের তিন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন সাইদুর রহমান। তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।
সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ কোর্সে পূর্ণাঙ্গ মডিউল অন্তর্ভুক্ত করারও প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
চিঠিতে সারাদেশে পাঁচ লাখের বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন থাকার কথা উল্লেখ করে সাইদুর রহমান দাবি করেন, এসব যানবাহন ৮২ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। দুর্ঘটনারোধে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন দ্রুত সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তবে এই পরিসংখ্যানের উৎস ও তথ্য সংগ্রহের সময়কাল চিঠিতে উল্লেখ করা হয়নি।
রেল ও নৌপরিবহন উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এই দুই মাধ্যমে কম খরচে বেশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করা সম্ভব। রেল ও নৌপথে পণ্য পরিবহন বাড়লে সড়কে পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ কমবে। এতে পরিবহন ব্যয় ও সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। এ লক্ষ্যে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনকে সমন্বিতভাবে পরিচালনার জন্য একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।
চিঠির শেষাংশে সাইদুর রহমান বলেন, পরিবহনখাতের অব্যবস্থাপনা, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন, অদক্ষ ও অসুস্থ চালক এবং অসচেতন যাত্রী ও পথচারীদের কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় বহু মানুষ নিহত ও পঙ্গু হচ্ছেন। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই পরিবারের একমাত্র বা প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ফলে এসব পরিবার আর্থিক ও সামাজিক সংকটে পড়ছে।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, সড়ক ব্যবহারকারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে অর্থ বরাদ্দের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে যৌক্তিক ব্যয়ে টেকসই সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়ার অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রীকে।
এএইচ/এসআই




