আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন ও নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুলিশের। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনাই যেখানে বাহিনীটির প্রধান কাজ, সেখানে পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধেই অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছে। কখনো আসামিকে পালাতে সহযোগিতা, কখনো নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি, আবার কখনো অর্থের বিনিময়ে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠছে কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে। ব্যক্তির এমন অপকর্মের দায়ে পুরো বাহিনীর জবাবদিহি ও জনআস্থা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হচ্ছে।
তবে কিছু ঘটনায় দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় পুলিশ সদস্যদের গ্রেফতার এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে তা শুধু ব্যক্তির ভাবমূর্তিতেই প্রভাব ফেলে না, পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে, কোনো আসামিকে আইনের আওতায় আনার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধেই যদি তাকে পালাতে সহযোগিতা করার অভিযোগ ওঠে, তাহলে আইন প্রয়োগ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
যেসব ঘটনায় উঠেছে প্রশ্ন
জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, মোবাইল সিমের অবস্থান, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), এসএমএস ও পাসপোর্টসহ নাগরিকদের বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও গোপনীয় তথ্য সংগ্রহ করে বিক্রির অভিযোগে চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার বিভাগ।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন- ডেমরা থানার কনস্টেবল সাইমন হোসেন রাশেদ ও মাসুম মিয়া এবং ওয়ারী থানার কনস্টেবল নিজাম উদ্দীন ও তুরাগ থানার কনস্টেবল মো. জিহাদ মিয়া।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর ডিবির এসআই আবিদুর রহমান বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় রমনা থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করছে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম উত্তর বিভাগ।
ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সিডিআরসহ বিভিন্ন গোপন তথ্য সংগ্রহ করে বিক্রির অভিযোগে চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’
প্রিজনভ্যান থেকে আসামি পালানোর ঘটনায় ব্যবস্থা
গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে ২৯ জন বন্দিকে নিয়ে ঢাকা জেলা জজ আদালত থেকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের উদ্দেশে রওনা হয় একটি প্রিজনভ্যান। রাজধানীর তাঁতীবাজার এলাকায় যানজটে আটকে থাকা অবস্থায় মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত ‘পিচ্চি রাজা’ পালিয়ে যান।
এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে প্রিজন ভ্যানের সঙ্গে থাকা পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তারা হলেন- এসআই প্রবীর কুমার, কনস্টেবল মো. জাকির হোসেন, মো. সাকিব, শাকিল হোসেন এবং প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেন।
ঘটনার পর পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমা, এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস ও চালক নায়েক কামাল হোসেনকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীটি।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার জানান, প্রিজনভ্যানে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যরা মূলত অর্থের বিনিময়ে পিচ্চি রাজাকে পালিয়ে যেতে সুযোগ করে দেন। ঠিক কত টাকার চুক্তি হয়েছিল তা নিশ্চিত না হলেও চালক নায়েক কামাল হোসেনের বাড়ি থেকে ইতোমধ্যে ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আদালত থেকে কারাগারে ফেরার পথে তাঁতীবাজার এলাকার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে প্রিজন ভ্যানটি থামানো হয়। ওই সময় ভ্যানের ইনচার্জের দায়িত্বে ছিলেন প্রবীর কুমার। তিনি চালক নায়েক কামাল হোসেনের কাছ থেকে চাবি নিয়ে ভ্যানের তালা খুলে দেন। ‘পিচ্চি রাজা’সহ দুই হাজতিকে ভ্যান থেকে নামানো হয়। অন্য হাজতি খাইরুল বাশারকে পরে ভ্যানের সামনের দিকে বসানো হলেও ‘পিচ্চি রাজা’কে আর ভেতরে নেওয়া হয়নি।
ইসরাইল হাওলাদার বলেন, ‘পুরো ঘটনাটিই ছিল পূর্বপরিকল্পিত। রাস্তার পাশে আগে থেকেই অপেক্ষমাণ একটি প্রাইভেট কারে পিচ্চি রাজাকে তুলে দেন প্রবীর কুমার। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখিয়ে তিনি আবার পাহারা দেওয়া পুলিশ দলের সঙ্গে যোগ দেন।’
যাত্রাবাড়ী থানার হেফাজত থেকে পালান নারী আসামি
গত ২৭ আগস্ট রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলায় রিমান্ডে থাকা মিতু আক্তার নামে এক নারী আসামি পালিয়ে যান। তিনি চার দিনের পুলিশি রিমান্ডে ছিলেন।
এ ঘটনায় দায়িত্বে থাকা এক উপপরিদর্শক (এসআই), এক সহকারী উপপরিদর্শকসহ (এএসআই) চার পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, হাজী সোহেল হত্যা মামলায় গ্রেফতার মিতু আক্তারকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। সেদিন রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করার কিছুক্ষণ আগে সকালে তিনি থানা হেফাজত থেকে পালিয়ে যান।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ডেমরা জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মহসিন মাসুদ ঘটনাটি নিশ্চিত করে জানান, এ ঘটনায় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
আস্থা ফেরাতে জবাবদিহি নিশ্চিতের তাগিদ
পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (এআইজি) কামারুম মুনিরা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘যেসব পুলিশ সদস্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন, আমরা তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছি। চাকরিতে থাকা অবস্থায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় ইতোমধ্যে অনেক পুলিশ সদস্য গ্রেফতার হয়েছেন। যারাই অপরাধ করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে আমরা দেরি করি না।’
অপরাধ বিশ্লেষক, সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি, আসামিকে পালাতে সহযোগিতা এবং থানা হেফাজত থেকে আসামি পালানোর মতো ঘটনায় আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি সামনে আসছে।
তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ দেখা যাচ্ছে। অল্প কয়েকজন সদস্যের এমন কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তৌহিদুল হক আরও বলেন, ‘যেসব পুলিশ সদস্য জনগণের ব্যক্তিগত তথ্য, আসামির পালাতে সহায়তা কিংবা আর্থিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়ছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হয়ে শাস্তির আওতায় আনলে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে।’
একেএস/এমআর




