- ৭ মাসে ৪০০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
- ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির অডিও রেকর্ড ঘিরে নানা সমালোচনা
- ঢালাওভাবে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে যেন কোনো সৎ পুলিশের নাম না আসে: সাবেক র্যাব ডিজি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশের ভেতরেই এখন তৈরি হয়েছে নানা ধরনের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গত সাত মাসে অন্তত ৪০০ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বদলি, প্রত্যাহার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বদলে যাচ্ছে মাঠপর্যায়ের পুলিশের চিত্র।
প্রশ্ন উঠছে, এগুলো কি শুধুই নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, নাকি দায়িত্ব পালনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই কঠোর হচ্ছে পুলিশ প্রশাসন। একের পর এক কর্মকর্তার বদলি ও প্রত্যাহারে পুলিশের মনোবল নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এতে বাহিনীর কর্মকর্তাদের মনোবল নষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই।
এদিকে, গত ১১ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণকে কেন্দ্র করে গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ও গুলশান থানার ওসিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়াও, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাঠপর্যায়ে দুর্বল অবস্থা। শেখ হাসিনা চাইলে এই সুযোগে দেশে ফিরতে পারেন—এমন মন্তব্যের জেরে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রাকিবুল হাসানকে বরখাস্ত করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার। এ ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাতে ডিবি ডেকে নিয়ে আসে।
বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো পুলিশ কর্মকর্তারা:
পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সাত মাসে ৪০০ পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি, সংযুক্ত ও অবসরে পাঠিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার।
৫৬ কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে:
১৪ আগস্ট (শুক্রবার) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুই প্রজ্ঞাপনে সাত সহকারী পুলিশ কমিশনার ও ৪৯ পুলিশ পরিদর্শকসহ ৫৬ জনকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: ২২ পুলিশ সুপারকে বদলি
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত নির্ধারিত ৪৯ জন পুলিশ কর্মকর্তা চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ করায় সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী জনস্বার্থে তাদের সরকারি চাকরি থেকে অবসর প্রদান করা হলো।
অবসরপ্রাপ্ত ৪৯ পুলিশ পরিদর্শক বিভিন্ন জেলা, ডিএমপি, সিআইডি, পিবিআই, এসবি, রেলওয়ে পুলিশসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। অন্যদিকে, আরেক প্রজ্ঞাপনে সহকারী পুলিশ সুপার সমপর্যায়ের সাত কর্মকর্তাকেও একই আইনের আওতায় অবসর দেওয়া হয়েছে।
তারা হলেন—ঢাকা র্যাব হেডকোয়ার্টার্সের সহকারী পুলিশ সুপার নূরে আলম সিদ্দিকী, ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের সহকারী কমিশনার (পেট্রোল) মো. নুরুল মোত্তাকিন, খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার কাজী ওয়াজেদ আলী, পটুয়াখালীর গলাচিপা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. সৈয়দুজ্জামান, ঢাকা মোহাম্মদপুর র্যাব-২-এর সহকারী পুলিশ সুপার মো. গোলাম কিবরীয়া, ঢাকা আরআরএফের এএসপি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, সিরাজগঞ্জ জেলার সহকারী পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম।
৩ ডিআইজিসহ ২০ কর্মকর্তা অবসরে:
গত ২৩ জুলাই (বৃহস্পতিবার) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মঞ্জুর মোরশেদ চৌধুরীর সই করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৩ ডিআইজিসহ ১৭ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন তিনজন ডিআইজি, ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি ও পুলিশ সুপার (এসপি) পদমর্যাদার দুজন কর্মকর্তা।
অবসরে পাঠানো তিন ডিআইজি হলেন—হাইওয়ে পুলিশের মোহাম্মদ আবদুল্লাহীল বাকী, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির (সারদা) মো. ওয়ালিদ হোসেন ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সানা শামীনুর রহমান।
আরও পড়ুন: পুলিশের ঊর্ধ্বতন ৬ কর্মকর্তাকে বদলি
অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তারা হলেন—সিআইডির মোহাম্মদ সারওয়ার হোসেন ও রেবেকা সুলতানা, ট্যুরিস্ট পুলিশের বিধান ত্রিপুরা ও সুলতানা নাজমা হোসেন, পুলিশ স্টাফ কলেজের এ কে এম ইকবাল হোসেন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সোহেলী ফেরদৌস, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির (সারদা) মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ, পুলিশ টেলিকমের হাসিনা রহমান, পুলিশ সদর দপ্তরের অধীন সেন্ট্রাল পুলিশ হাসপাতালের ফয়সল মাহমুদ, পুলিশ সদর দপ্তরের কানিজ ফাতেমা, নৌপুলিশের জেসমিন বেগম এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ফরিদা ইয়াসমিন। এছাড়াও, অবসরে পাঠানো হয়েছে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও ট্রাফিক অ্যান্ড ড্রাইভিং স্কুলের (টিডিএস) পুলিশ সুপার (এসপি) আবদুর রহিম শাহ চৌধুরীকে।
৩৩ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর:
গত ৫ জুলাই (রোববার) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত পুলিশ-১ শাখা থেকে জারি হওয়া এক প্রজ্ঞাপনে পুলিশের ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি ও পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ৩৩ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের মধ্যে ডিআইজিদের পাশাপাশি ১৮ জন অতিরিক্ত ডিআইজি এবং একজন পুলিশ সুপার (এসপি) রয়েছেন।
অবসরে পাঠানো ডিআইজিরা হলেন—মোল্যা নজরুল ইসলাম (বর্তমানে গ্রেফতার) ও মো. সাইফুল ইসলাম (বর্তমানে গ্রেফতার), মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ, শাহ মিজান শাফিয়ার রহমান, এস এম মোস্তাক আহমেদ খান, জিহাদুল কবির, মঈনুল হক, মো. ইলিয়াছ শরীফ, শ্যামল কুমার নাথ, মো. জাকির হোসেন খান, মো. শাহ আবিদ হোসেন, মো. জামিল হাসান, মো. মাহবুবুর রহমান ও মো. মনিরুজ্জামান।
অতিরিক্ত ডিআইজিরা হলেন—মো. বরকতুল্লাহ খান, এ টি এম মোজাহিদুল ইসলাম, মো. আনোয়ার হোসেন খান, মোহা. মনিরুজ্জামান, মো. মেহেদুল করিম, মো. আলমগীর কবীর, মো. রশীদুল হাসান, সঞ্জয় কুমার কুণ্ডু, মো. নিজামুল হক মোল্যা, এস এম এমরান হোসেন, মুহাম্মদ সাইদুর রহমান খান, ড. শামসুন্নাহার, মোল্লা জাহাঙ্গীর হোসেন, সাইফুল্লাহ আল মামুন, খান মুহাম্মদ রেজোয়ান, মো. সাজিদ হোসেন, শেখ রফিকুল ইসলাম ও মাশরুকুর রহমান খালেদ। এছাড়াও, অবসরে পাঠানো পুলিশ সুপার হলেন আবদুল্লাহ আরেফ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মন্তব্য ঘিরে সমালোচনা:
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে স্বয়ং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে ইতিমধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বদলি, প্রত্যাহার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বদলে যাচ্ছে মাঠপর্যায়ের পুলিশের চিত্র। প্রশ্ন উঠছে, এগুলো কি শুধুই নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, নাকি দায়িত্ব পালনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই কঠোর হচ্ছে পুলিশ প্রশাসন?
পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তৈরি হয় আলোচনা-সমালোচনা। এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাকে প্রত্যাহারের পর গত বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে তাকে হেফাজতে নেওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিনি কোথায় আছেন, তা জানা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টরা কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
সম্প্রতি, গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল ঘিরে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) গুলশানের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাউদ হোসেনকে এবং বিকেলে ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
সকালে ওসি দাউদ হোসেনকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে যুক্ত করা হয়। বিকেলে ডিসি তানভীর আহমেদকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক কারণে ডিএমপি সদর দপ্তরে যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও, একই ঘটনায় শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ডিএমপির এক আদেশে গুলশান জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) সারোয়ার হোসাইনকে গোয়েন্দা-ওয়ারী বিভাগে বদলি করা হয়।
পুলিশের মনোবলের প্রশ্নে বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা যা বলছেন:
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ.এইচ.এম. শাহাদাত হোসাইন ঢাকা মেইলকে বলেন, কোনো কর্মকর্তার বদলি বা প্রত্যাহার বাহিনীর স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে কিংবা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে অথবা প্রশাসনিক কারণসহ নানা কারণে বদলি হয়। বদলি হচ্ছে চাকরির একটা অংশ।
তিনি আরও বলেন, আমরা মনে করি না বদলি নিয়ে আতঙ্কের কিছু আছে। চাকরিটা হচ্ছে, ভালো কাজ করলে পুরস্কার এবং খারাপ কাজ করলে তিরস্কার। সুতরাং এ মন-মানসিকতা থাকলে মনে হয় না কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এ বিষয় নিয়ে মনঃক্ষুণ্ন হওয়ার সুযোগ আছে।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) সাবেক মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, একটা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অবসর দেওয়া হয়। মনে হয় না পুলিশের মধ্যে এমন অবসর দেওয়ার ফলে বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে প্রভাব পড়বে। তবে ঢালাওভাবে বাধ্যতামূলক এই অবসর দেওয়ার ক্ষেত্রে এ তালিকায় যেন কোনো সৎ পুলিশের নাম না আসে, সেদিক খেয়াল রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে রদবদল এটাই স্বাভাবিক বিষয়। এ রদবদলের কারণে বাহিনীর সদস্যদের মনঃক্ষুণ্ন কিংবা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
একেএস/এআর




