বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

মরিয়মের বিয়ে, ভিডিও ফাঁস ও আত্মহত্যা: নেপথ্যে ওবায়দুর?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২১ পিএম

শেয়ার করুন:

মরিয়মের বিয়ে, ভিডিও ফাঁস ও আত্মহত্যা: নেপথ্যে ওবায়দুর?
মামা ওবায়দুর রহমান ও ভাগনি মরিয়ম আক্তার।

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় তার মামা ওবায়দুর রহমানকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।

গ্রেফতারের পর বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ওবায়দুরকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের তেজগাঁও জোনাল টিমের পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

কারাগারে আটক রাখার আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মরিয়মের আত্মহত্যার ঘটনায় ওবায়দুরের জড়িত থাকার বিষয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়।

মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় তার মামা মো. ওবায়দুর রহমানকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। মরিয়মের বাবা, গাজী নজরুল ইসলাম ও পরিবারের অন্য সদস্যদের বক্তব্যে গোপনে ব্যক্তিগত ভিডিও ধারণ, ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল, অর্থ দাবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়াসহ নানা অভিযোগের কথা এসেছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। 

মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহর অভিযোগ, তার শ্যালক ওবায়দুর রহমানই মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের পরিচয় ও সম্পর্ক তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। পরে তার মধ্যস্থতায় তাদের বিয়েও হয়। কিন্তু বিয়ের পর ওবায়দুরই মরিয়ম ও গাজী নজরুলের ব্যক্তিগত ভিডিও গোপনে ধারণ করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মাসুম বিল্লাহর ভাষ্য, মরিয়ম ইস্যুতে নানাভাবে ব্ল্যাকমেইল করে মরিয়মের বাবা ও গাজী নজরুলের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ আদায় করেন ওবায়দুর। একপর্যায়ে আরও অর্থ দাবি করা হলেও তা না পাওয়ায় ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তার। এতে মরিয়ম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।

মরিয়মের বাবা বলেন, মরিয়ম তাকে প্রায়ই বলতেন, আব্বু, আমি মানুষকে মুখ দেখাব কীভাবে? মামাকে আমি অনেক বিশ্বাস করতাম, মামা এমন কাজ কীভাবে করতে পারলেন।

গাজী নজরুল ইসলামও ওবায়দুরের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ভিডিও গোপনে ধারণ করে একটি গ্রুপের কাছে দেওয়ার এবং ওই ভিডিও ব্যবহার করে তাকে ব্ল্যাকমেল করার অভিযোগ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওবায়দুর তার ব্যক্তিগত চালক ছিলেন এবং তাদের সম্পর্কের বিষয়ে তিনি আগে থেকেই জানতেন।

মরিয়মের ফুফু শামসুন্নাহার রোকসানাও বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে ওবায়দুরকে ঘিরে সন্দেহের কথা বলেছেন। তার দাবি, মরিয়ম ওবায়দুরকে খুব বিশ্বাস করতেন। একবার ওবায়দুর তাকে সাতক্ষীরা সীমান্ত এলাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন। এর আগেও কোথাও নিয়ে যাওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা মরিয়মের খোঁজ পাচ্ছিলেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।

এ ছাড়া পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে মরিয়মের ব্যক্তিগত বিষয় ও গতিবিধি সম্পর্কে ওবায়দুরের জানাশোনা এবং সেই সুযোগ ব্যবহার করে তাকে প্রভাবিত বা হয়রানি করার অভিযোগের কথাও এসেছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওবায়দুর রহমান। তার দাবি, তিনি বরং মরিয়ম ও গাজী নজরুলের সম্পর্কের বিরোধিতা করেছিলেন এবং গাজী নজরুলকে ওই সম্পর্ক থেকে সরে আসার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত ভিডিও ধারণ, ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া বা ব্ল্যাকমেলের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

ওবায়দুরের ভাষ্য, ভিডিও ফাঁসের ঘটনায় তাকে সন্দেহ করার কারণেই তার ওপর হামলা করা হয়। এ ঘটনায় তিনি নিজেও মামলা করেছেন বলে জানান।

মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ও ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় ওবায়দুরকে পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২১ সেপ্টেম্বর গাজী নজরুলের চার দিন এবং মাকছুদার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পুলিশের রিমান্ড আবেদনে ওবায়দুরের ভূমিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ, তার অবস্থান শনাক্ত এবং তাকে গ্রেফতারের কথা বলা হয়। মামলায় অন্য কেউ জড়িত কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২২ সেপ্টেম্বর মামলাটি শেরেবাংলা নগর থানা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান এ তথ্য জানিয়েছেন।

মরিয়মের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গাজী নজরুল ইসলামের চার দিনের রিমান্ড চলছে। অন্যদিকে, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঙ্গলবার শেষ হয়েছে। রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে উল্লেখ করে ডিবি তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করে। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

মামলাটি এখন ডিবি তদন্ত করছে। তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং মরিয়মের মৃত্যুর সঙ্গে ওবায়দুরের কোনো যোগসূত্র কতটুকু, তা এখন বেরিয়ে আসার অপেক্ষায়।

এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর