মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

গাজী নজরুলের এমপি পদ বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন টিআইবির

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৪ পিএম

শেয়ার করুন:

গাজী নজরুলের এমপি পদ বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন টিআইবির

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ, দলীয় তদন্তে নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হয়ে বহিষ্কার এবং পরে মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গ্রেফতার ও চার দিনের পুলিশ রিমান্ডের পরও তার সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। 

সংস্থাটি বলেছে, ফৌজদারি দায় আদালত নির্ধারণ করবে; তবে সংসদ সদস্যের নৈতিকতা, ক্ষমতার ব্যবহার ও জনগণের আস্থার প্রশ্নে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংসদের।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে টিআইবি মরিয়ম খাতুনের মৃত্যু এবং এর আগে যৌন হয়রানি ও যৌন ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগের নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্তের দাবি জানিয়েছে। একইসঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকার বিষয়ে সংসদের মর্যাদা রক্ষায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা স্পিকার, জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনকে স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। তবে সংসদ ও অন্যান্য সংসদ সদস্যদের জন্য মর্যাদাহানিকর এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী ব্যক্তির সংসদ সদস্যপদ অব্যাহত থাকবে, সেটিও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

তিনি বলেন, দলীয় তদন্তে নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হয়ে দল থেকে বহিষ্কার, পদ ও প্রভাব ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ এবং এখন দ্বিতীয় স্ত্রীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলায় গ্রেফতার ও রিমান্ডের পরও গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকাকে অন্য সংসদ সদস্যরা কীভাবে দেখছেন, সেই প্রশ্ন রয়েছে। সংসদের জন্য মর্যাদাহানিকর অবস্থার জন্য দায়ী ব্যক্তির জবাবদিহির ব্যবস্থা কেন থাকবে না, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একজন জনপ্রতিনিধিকে ঘিরে ধারাবাহিক গুরুতর অভিযোগ ও নৈতিক প্রশ্ন জাতীয় সংসদের মর্যাদার জন্য অবমাননাকর এবং সংসদ সদস্যদের জন্য চরম লজ্জাজনক। ফৌজদারি দায় নির্ধারণ করবে আদালত। কিন্তু সংসদ সদস্যের নৈতিকতা, ক্ষমতার ব্যবহার ও জনগণের আস্থার প্রশ্নে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংসদের। তাই গাজী নজরুল ইসলামের সংসদীয় অবস্থান নিয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে স্পষ্ট করতে হবে।

সংসদ সদস্যপদের সাংবিধানিক অযোগ্যতার বিষয়টিও তুলে ধরে টিআইবি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২ নম্বর উপধারার ঘ অনুযায়ী নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ড হলে একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হন। ফলে বর্তমান অভিযোগ, গ্রেপ্তার, রিমান্ড বা দলীয় তদন্তের সিদ্ধান্ত নিজে থেকেই গাজী নজরুল ইসলামের সাংবিধানিক অযোগ্যতা সৃষ্টি করে না।

তবে আইনগত এই সীমারেখাকে নৈতিক স্খলনের রক্ষাকবচে পরিণত করার চর্চা থেকে সংসদকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। গুরুতর নৈতিক স্খলন, স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্নকারী বা সংসদ-অবমাননাকর আচরণের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্যপদ বাতিল বা আসন শূন্য হওয়ার প্রশ্ন উঠবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান করার আহ্বান জানান তিনি।

একই সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে পদ ও প্রভাবের অপব্যবহার এবং বিশেষ করে যৌন ব্ল্যাকমেইলসহ সব অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে টিআইবি।

গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনাকে সংসদ সদস্যদের নৈতিক স্খলনের ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্যদের নৈতিক স্খলনের তথ্য বিভিন্ন গবেষণা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া তথ্যনির্ভর বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদনে এর আগেও ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত ও আলোচিত হয়েছে। কিন্তু তা প্রতিকারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষায়িত, পূর্ণাঙ্গ ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধির দাবি নতুন নয় বলেও উল্লেখ করেছে টিআইবি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, টিআইবির মূল খসড়ার ওপর ভিত্তি করে ২০১০ সালে সংসদে সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি বিল উত্থাপিত হলে টিআইবি তা দ্রুত পাস এবং সব দলের প্রতিনিধিত্বে একটি নৈতিকতা কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছিল। প্রস্তাবিত বিলে ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রভাব ব্যবহার না করা, স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলা এবং নিয়োগ, পদোন্নতি বা বদলিতে সুপারিশ না করার মতো বিধান ছিল। তবে উদ্যোগটি আইনে পরিণত হয়নি।

তিনি বলেন, ২০২৪-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশায়ও একই প্রয়োজন আবার স্বীকৃত হয়েছে। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সংসদ সদস্যদের জন্য পৃথক সংসদ সদস্য আচরণ আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ বিবরণী প্রতিবছর হালনাগাদ করার বিধানসহ আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব সুপারিশের প্রতি সব রাজনৈতিক দল বিনা শর্তে ঐকমত্য প্রকাশ করেছে বলেও দাবি করেছে টিআইবি।

টিআইবি জানায়, ২০২৪-পরবর্তী সংস্কার প্রস্তাব এবং ২০২৬ সালে বর্তমান সরকারের কাছে দেওয়া সুপারিশেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জন্য কার্যকর আচরণবিধির দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে সংস্থাটি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে, সমাধানের পথও জানা। তারপরও বাস্তবায়নে আগ্রহ নেই কেন—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

এএইচ/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর