- রমজান-পরীক্ষাসহ বাস্তবতা বিবেচনায় ইউপি ভোট: সিইসি
- যথাসময়ে স্থানীয় নির্বাচন না হলে ইসি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে: ইসি আনোয়ারুল
- স্থানীয় নির্বাচনে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ
- জানুয়ারি থেকে স্থানীয় নির্বাচন শুরু করার প্রস্তাব আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে
- উপনির্বাচন ও স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে ১৩ সিদ্ধান্ত ইসির
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এক্ষেত্রে স্থানীয় নির্বাচনে সহিংসতা, বলপ্রয়োগ ও বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা করবে ভোট আয়োজনকারী সাংবিধানিক এ সংস্থাটি। সম্প্রতি ২৬টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এমন বিষয় সামনে আসে।
বৈঠক সূত্র জানায়, আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতার বিষয়টি সামনে এলে সম্ভাব্য সহিংসতা, বলপ্রয়োগ ও বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রস্তুত করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বহিরাগত বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে জানতে চাইলে সূত্র জানান, স্থানীয় নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ভোটার এলাকার বাইরের প্রভাবশালীসহ রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বোঝানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও প্রভাবশালীরা যাতে নির্বাচনে কোনো রকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, একটি সফল নির্বাচন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সমন্বয়ের ওপর এটি নির্ভরশীল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে আসন্ন নির্বাচনগুলো আরও সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্যভাবে আয়োজন করতে হবে।
তিনি বলেন, আইনগত বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি বাস্তবতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে রমজান ও মার্চে এসএসসি পরীক্ষা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ এবং ন্যূনতম ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণাসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় সময় রাখতে হবে। সভায় পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, অনেক ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে হিসাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগগুলোর কাছে বাস্তবায়নযোগ্য সম্ভাব্য সময়ের একটি প্রস্তাবও চেয়েছেন তিনি।
বৈঠকে ইসি মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে আয়োজন করতে হয়। প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও লজিস্টিক বিষয়ে বিশেষ প্রস্তুতি প্রয়োজন। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচন না হলে ইসি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন পরিবর্তনের পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সম্ভাব্য সহিংসতা, বলপ্রয়োগ ও বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় আইনশৃঙ্খলা মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ক্যামেরা, ড্রোন ও সিসিটিভি ক্যামেরাসহ প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি নির্বাচনকেন্দ্রিক স্বচ্ছতা ও অভিযোগ যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
ইসির সঙ্গে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচি, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়-বিভাগগুলো ব্যস্ত রয়েছে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে উন্নয়নমূলক কাজ ও সুবিধাভোগীদের কার্ড বিতরণে ব্যস্ততা থাকবে। এ সময়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে এসব কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জানান, নভেম্বর-ডিসেম্বরে পুলিশ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে ব্যস্ত থাকবে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের আগে স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করা যেতে পারে বলে তিনি বৈঠকে মত দিয়েছেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের জন্য পরবর্তীতে পৃথক সভা আয়োজন করা যেতে পারে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে বৈঠকে পুলিশ মহাপরিদর্শক জানান, নভেম্বর-ডিসেম্বরে বিভিন্ন ধর্মীয়, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও অনুষ্ঠানে পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পাশাপাশি পুলিশের নির্বাচন-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ চলতি বছরের ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু করার অনুরোধ জানান।
অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব জানান, ডিসেম্বর মাসে শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। একই সময়ে শিক্ষক ও কেন্দ্র ব্যবহার করা হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও মূল্যায়নে ব্যত্যয় ঘটবে। এ ছাড়া ডিসেম্বর মাসে ২৫ কোটি থেকে ৩২ কোটি নতুন পাঠ্যবই বিতরণ, নভেম্বরে ২০ হাজার শিক্ষক নিয়োগ এবং ডিসেম্বরে ৩০ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে অতিরিক্ত পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমের উদ্বোধনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু করার অনুরোধ জানান।
বৈঠকে জনপ্রশাসন সচিব জানান, সরকার কর্তৃক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কয়েকটি প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। পাশাপাশি নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে পাবলিক পরীক্ষায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ফলে উক্ত সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন না করে জানুয়ারি মাস থেকে নির্বাচন শুরু করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
বৈঠক সূত্র জানায়, এ বৈঠকে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে ১৩টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সিদ্ধান্তগুলো হলো—
১. ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা ও কার্যকর সমন্বয় ব্যবস্থা ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনেও অনুসরণ করতে হবে।
২. ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ক্যামেরা, ড্রোন, সিসি ক্যামেরাসহ প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং ভুল ও ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো ভুল তথ্য প্রতিরোধে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
৩. ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে প্রয়োজনীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন থাকবে এবং সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
৪. প্রত্যেক বাহিনীর বিদ্যমান কমান্ড কাঠামো বহাল রেখে পারস্পরিক সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী যৌথ বা সুনির্দিষ্ট অপারেশনের মাধ্যমে নেতৃত্ব ও দায়িত্ব বিধান ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
৫. নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও বাহিনীর সদস্যদের নির্বাচনী আইন, বিধিবিধান, দায়িত্ব ও আচরণবিধি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা দিতে হবে।
৬. ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে।
৭. রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর স্থানীয় প্রধানদের সমন্বয়ে সমন্বয় কমিটি গঠন বা সক্রিয় করে দ্রুত যোগাযোগ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
৮. কেন্দ্রীয়ভাবে আইনশৃঙ্খলা মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এ কার্যক্রমে আইডিইএ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করবেন।
৯. আগামী বছরের ৬ জুনের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের সব নির্বাচন সম্পন্নের প্রস্তুতি নিতে হবে। গত ১৭ সেপ্টেম্বরের সভায় পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ইসির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
১০. স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সম্ভাব্য সহিংসতা, বলপ্রয়োগ ও বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিতে হবে।
১১. ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণে পেছন থেকে হিসাব করে সমন্বিত প্রস্তাব তৈরি করতে হবে। এতে ন্যূনতম ৪৫ দিনের প্রস্তুতিকাল, নির্বাচনি ধাপ, প্রতিটি ধাপের মধ্যে অন্তত ১৫ দিনের ব্যবধান এবং আইনগত, প্রশাসনিক, পাবলিক পরীক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ দিবস বিবেচনায় নিতে হবে।
১২. স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও প্রস্তুতিমূলক তথ্য সংগ্রহ করে পরবর্তী আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় উপস্থাপন করতে হবে।
১৩. ১৭ সেপ্টেম্বরের সভায় আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হওয়ায় ২১ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সভা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জানা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরের আগে ২৮৯টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ হাজার ৯৮১টি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১০টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মামলা, সীমানা-জটিলতাসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে ১০৮টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হয়নি। দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ ৪ হাজার ৫৮০টি। এর মধ্যে চলতি বছরেই ৩ হাজার ৯৮১টি নির্বাচন উপযোগী হবে। বাকিগুলো ২০২৭ ও ২০২৮ সালের দিকে নির্বাচন উপযোগী হবে।
এদিকে ইউনিয়ন পরিষদের জন্য ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করা হয়েছে স্থায়ী ৪৫ হাজার ৯৭২টি, অস্থায়ী ৪২৫টি, মোট ৪৬ হাজার ৩৯৭টি। এতে স্থায়ী ভোটকক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ১৫৯টি, অস্থায়ী ১৩ হাজার ৫৮০টি, মোট ২ লাখ ১৫ হাজার ৭৩৯টি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ৩১ আগস্ট চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তালিকা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দেশে ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার ৬৬৫, নারী ৬ কোটি ৩২ লাখ ৬৫ হাজার ৭১১ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৬৭ জন।
এমএইচএইচ/এআর




