- নিজের সাজানো ১৪৯২ কোটি টাকার প্রকল্পেই নিজে পিডি!
- একনেকের অনুমোদনের ২২ দিন পরই পিডি, জিও হয়নি তখনো
- বর্তমান নিয়ম মানতে গিয়ে প্রকল্পের বাস্তবায়ন করতে দেরি হয়
- আগে পিডি নিয়োগ হলে ডিপিপি প্রণয়নে পক্ষপাতের আশঙ্কা থাকে
একনেকে অনুমোদনের পর প্রকল্পের ডিপিপি পুনর্গঠনের কাজ চলছে। এখনো জারি হয়নি প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদনের সরকারি আদেশ (জিও)। এর মধ্যেই ১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি প্রকল্পে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। একনেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠনের নির্দেশ জারির এক সপ্তাহের মধ্যে পিডি নিয়োগের সভা এবং তার পরদিনই নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
‘বৃহত্তর দিনাজপুর (দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়) জেলা সমন্বিত উন্নয়ন’ প্রকল্পে এই নিয়োগের সরকারি নথির সময়ক্রম ও প্রচলিত বিধান ঘিরে এমন প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, প্রকল্পটির প্রস্তাব প্রণয়ন ও সাজানোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন একজন কর্মকর্তাকেই পরে একই প্রকল্পের পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক করা হয়েছে।
প্রকল্পটি গত ২০২৬ সালের ২২ জুলাই একনেক সভায় অনুমোদন পায়। স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে এলজিইডি বাস্তবায়ন করবে প্রকল্পটি। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত চার বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা। কিন্তু একনেকের অনুমোদনের পরও প্রকল্পের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ হয়নি। একনেকের সিদ্ধান্তে প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল সংশোধন করে ডিপিপি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পরামর্শক, গাড়ি ভাড়া ও রক্ষণাবেক্ষণসহ কয়েকটি ব্যয় যৌক্তিক করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এসব ব্যয় অতি প্রয়োজনীয় না হলে প্রকল্পে না রাখার কথাও বলা হয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব জনবলের সর্বোচ্চ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়।
এরপর ৪ আগস্ট পরিকল্পনা বিভাগের এনইসি-একনেক ও সমন্বয় অনুবিভাগ থেকে একনেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্পের ডিপিপি পুনর্গঠনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে সংশোধিত বাস্তবায়নকাল, একনেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গৃহীত ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র এবং যথাযথ স্বাক্ষরসহ পুনর্গঠিত ডিপিপি পাঠাতে বলা হয়। অর্থাৎ তখনো প্রকল্পটির ডিপিপি পুনর্গঠনের প্রশাসনিক কাজ চলছিল।
এর মাত্র আট দিনের মাথায়, ১২ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ নিয়ে সভা হয়। সভায় বৃহত্তর দিনাজপুর প্রকল্পের পিডি নিয়োগের বিষয়টি আসে। পরদিন ১৩ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনা-১ শাখা থেকে এলজিইডির ঠাকুরগাঁও জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুন বিশ্বাসকে প্রকল্পটির পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়।
অর্থাৎ একদিকে একনেকের নির্দেশে ডিপিপি পুনর্গঠনের কাজ চলছিল, অন্যদিকে পিডি নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। এখানেই মূল প্রশ্ন, ডিপিপি পুনর্গঠন ও প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে কেন পিডি নিয়োগের প্রয়োজন হলো?
নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, ২৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদনের জিও জারি হয়নি। অথচ এর আগেই পিডি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। ফলে বর্তমান সরকারি পরিপত্রের সঙ্গে এই নিয়োগের সময়ের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশিদ ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের সুযোগ নেই। একনেকের অনুমোদন, এরপর একনেক উইং ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক আদেশ জারির পর পিডি নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স অফিসারের কাছে প্রশাসনিক আদেশ জারি হওয়ার আগে পিডি নিয়োগের সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের আগে কাউকে আনুষ্ঠানিক প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে কোনো কোনো সরকারি সংস্থায় প্রকল্প তৈরির সময় থেকেই একজন কর্মকর্তাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত করে রাখার চর্চা রয়েছে।
মামুন আল রশিদ বলেন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর কিংবা এলজিইডির মতো সংস্থায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকল্প তৈরির পর্যায় থেকেই একজন কর্মকর্তাকে সম্ভাব্য প্রকল্প পরিচালক হিসেবে কাজের সঙ্গে যুক্ত রাখা হয়। ভবিষ্যতে তাকেই প্রকল্প পরিচালক করা হবে, এমন ধারণা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে থাকতে পারে। এর একটি সুবিধা হলো ভবিষ্যৎ প্রকল্প পরিচালক শুরু থেকেই প্রকল্প সম্পর্কে ধারণা পান। তবে এর ঝুঁকিও রয়েছে। কোনো কর্মকর্তা আগে থেকেই পিডি হওয়ার সম্ভাবনায় থাকলে প্রকল্পের ডিপিপি তৈরির সময় নিজের সুবিধা বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে ডিপিপি প্রণয়নে পক্ষপাতের আশঙ্কা থাকে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রচলিত পরিপত্র অনুযায়ী একনেকে প্রকল্প অনুমোদনের পর জিও জারি হয়। জিও জারির এক মাসের মধ্যে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের নির্দেশনা রয়েছে। আলোচ্য প্রকল্পে জিও জারির আগেই পিডি নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকলে তা প্রচলিত নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এসএম শাকিল আখতার বলেন, বর্তমান পরিপত্র অনুযায়ী জিও জারির আগে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এই নিয়ম মানতে গিয়ে অনেক প্রকল্পে পিডি নিয়োগ দিতে কয়েক মাস সময় লেগে যায়। এতে প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু করতে দেরি হয়। এ কারণে পরিপত্র সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এর খসড়া তৈরি হয়েছে।
এখানে সময়ের হিসাবটিও গুরুত্বপূর্ণ। ২২ জুলাই একনেকে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ৪ আগস্ট পরিকল্পনা বিভাগ ডিপিপি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেয়। ১২ আগস্ট পিডি নিয়োগ নিয়ে সভা হয়। ১৩ আগস্ট পিডি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। আর ২৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পটির জিও জারি হয়নি। অর্থাৎ একনেকের অনুমোদনের ২২ দিনের মধ্যেই পিডি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হলেও প্রশাসনিক অনুমোদনের জিও তখনো হয়নি।
প্রকল্পটির পিডি নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মোহাম্মদ মামুন বিশ্বাসকে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ৫০ কোটি টাকার বেশি প্রাক্কলিত ব্যয়ের অন্য কোনো প্রকল্পে তিনি দায়িত্বে থাকলে নতুন প্রজ্ঞাপন জারির সঙ্গে সঙ্গে আগের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন বলে গণ্য হবেন। প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি বা আরডিপিপির সংস্থান অনুযায়ী বেতন-ভাতা, যানবাহন, লজিস্টিকসহ অন্যান্য সুবিধা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু যখন পিডি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয়, তখন একনেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াই চলছিল। ফলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা ‘অনুমোদিত ডিপিপি বা আরডিপিপির সংস্থান’ বাস্তবে কোন চূড়ান্ত ডিপিপির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছিল, সেটিও নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে প্রকল্পটির প্রস্তাব প্রণয়নের সঙ্গে পিডির সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মোহাম্মদ মামুন বিশ্বাস প্রকল্পটির প্রস্তাব তৈরি ও সাজানোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তাকেই প্রকল্পের পূর্ণকালীন পিডি করা হয়েছে। এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রকল্প প্রণয়নের সময় তার দায়িত্ব, ডিপিপি তৈরির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার নথি এবং পিডি নিয়োগের সুপারিশের কার্যবিবরণী যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ প্রকল্পের ডিপিপি তৈরির সময় প্রকল্পের কাজের পরিধি, ব্যয়ের খাত, বাস্তবায়ন কৌশল, পরামর্শক নিয়োগ, গাড়ি ভাড়া, রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয় প্রস্তাব করা হয়। আর পিডি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর একই কর্মকর্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এসব সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ফলে একই ব্যক্তির প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দুই পর্যায়ে ভূমিকা থাকলে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠতে পারে।
সাবেক এই সচিব বলেন, কাউকে অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করে রাখা আর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া এক বিষয় নয়। প্রকল্প অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আদেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত ওই কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
প্রকল্পটির আর্থিক আকারও বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে। ১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকার এই প্রকল্পে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলার যোগাযোগ ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় ২১ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক, ১৭১ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক এবং ৮৪২ দশমিক ৫২ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নের কথা রয়েছে। পাশাপাশি ১৬টি সেতু নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ করা হবে।
এত বড় প্রকল্পে পিডিই প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি, ব্যয় ব্যবস্থাপনা, দরপত্র, ঠিকাদারি কাজ, বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং সরকারের কাছে জবাবদিহির ক্ষেত্রে পিডির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নিয়োগের সময় ও প্রক্রিয়ায় কোনো অস্পষ্টতা থাকলে তা পরিষ্কার করা জরুরি।
প্রকল্প পরিচালক ও এলজিইডির ঠাকুরগাঁও জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুন বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বর্তমানে ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে অবস্থান করছেন বলে জানান। এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এএইচ/এএস




