- হত্যায় জড়িত ছিল চারজন
- দুজন গ্রেফতার হলেও বাকিরা পলাতক
- বাদলের স্ত্রীকে দিয়ে ছিনতাইয়ের নাটক সাজানো হয়
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় আলামিন (২২) নামে এক যুবককে ছিনতাইয়ের অভিযোগ তুলে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে সাজানো নাটক বলে দাবি করেছেন তার স্বজনেরা। তাদের দাবি, মাদক বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় আলামিনকে ছিনতাইকারী হিসেবে উপস্থাপন করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের একজনের স্ত্রীকে ব্যবহার করে ছিনতাইয়ের নাটক সাজানো হয়েছিল বলেও তাদের অভিযোগ।
তবে পুলিশের ভাষ্য, গ্রেফতার দুজন দাবি করেছেন, আলামিন এক নারীর কানের দুল ছিনতাই করেছিলেন। পুলিশ এখনো ওই নারীকে খুঁজে পায়নি। মাদকসংক্রান্ত কোনো বিষয় এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।
পরিবারের সদস্য ও তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নিহত আলামিনের বাবা একজন দিনমজুর। ভাঙারি মালামাল কিনে দোকানে দোকানে বিক্রি করতেন তার বাবা। তা দিয়েই চলত তাদের সংসার। পাশাপাশি হত্যার শিকার ছোট ছেলে আলামিনও বিভিন্ন দোকানে দৈনিক হাজিরায় কাজ করতেন। তা দিয়েই চলছিল তাদের সংসার।
ছয় ভাই-বোনের মধ্যে আলামিন ছিলেন সবার ছোট। তাকে নিয়ে বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল। ছেলের বিয়ের বয়স হয়েছিল। ফলে বাবা চিন্তা করতেন, তার আয়-উপার্জন বাড়িয়ে তাকে বিয়ে দেবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাবার পূরণ হলো না। তার আগেই তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় দিল ঘাতকরা। আলামিনের পরিবার থাকেন ধোলাইখালে। আর তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে ধোলাইপাড় এলাকায়।
জমি ও ব্যবসার দ্বন্দ্বে শাকিল ও শাহীন ক্ষিপ্ত ছিল বলে দাবি তার বাবার
হত্যার শিকার আলামিনের বাবা সুরুজ হাওলাদার ঢাকা মেইলকে বলেন, ছেলেটা আমার কাজকর্ম করেই খাইতো। কারও সঙ্গে কখনো লাগাঝগড়া করতো না। তার মৃত্যুর দিন আমরা মর্গে গেলাম। সেখানে এলাকার অনেকে গিয়েছিল। তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, তার কাছ থেকে কেউ টাকা-পয়সা পায় কি না। কেউ জানালো না। পরে যেসব দোকানে কাজ করতো, সেখানে খোঁজ নিলাম। তারাও বলল, মারা যাওয়ার আগের দিনও সে দোকানে কাজ করেছে। কিন্তু ঘটনার দিন তাকে কোথা থেকে শাকিল ও শাহীন নিয়ে গেল, তা আমরা বলতে পারি না।

তিনি আরও বলেন, আমরা একসময় মিরপুরে থাকতাম। কিন্তু বিয়ের পর আমরা শাশুড়ির বাড়িতে এসে উঠি। কিন্তু যে জায়গায় থাকতাম, সেটা সরকারি জায়গা। এই জায়গা নিয়ে শাহীন ও শাকিল তার ওপর একটু ক্ষিপ্ত ছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই তারা তাকে মারতে পারে বলে ধারণা তার।
তবে মাদক বিক্রি করতে না চাওয়ায় তাকে মেরে ফেলা হয়েছে—এমন কথা শোনা যাচ্ছে জানালে তিনি বলেন, যে কথাটা বলছে, ঠিক বলছে। লাইনটি বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন আলামিনের বাবা।
তার বাবা দাবি করেন, ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে শাকিল, শাহীন, রাব্বী ও বাদল পেটায়। পাশে লোকজন থাকলেও কেউ তাদের বাধা দেয়নি। এ কাজে পাশে থাকা বাসার দারোয়ানও এই পেটানোর ঘটনায় অংশ নিয়েছিল। শাহীন ও শাকিল আলামিনের আত্মীয় বলে জানান তিনি।
যেভাবে ছিনতাইয়ের নাটক সাজানো হয়
পরিবারের স্বজনরা জানান, ঘটনার দিন আলামিন প্রতিদিনের মতোই কাজে বের হন। কিন্তু তাকে রাস্তায় একা পেয়ে তারা ছিনতাইকারী বলে ধরে ফেলে। এ সময় বাদলের স্ত্রীর কানের দুল ছিনতাই করেছে বলে অভিযোগ তুলে তারা তাকে রশি দিয়ে বেঁধে বেধড়ক পেটায়। সেই পিটুনিতে অসুস্থ হয়ে পড়লে একটি অটোরিকশায় তুলে দেয় তারা। পরে তাকে ঢামেকে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
আলামিনের বাবা সুরুজ হাওলাদার বলেন, ওরে তো বাদলের বৌরে দিয়া নাটক সাজায় মারা হইছে। সেই মাইয়ারে অহন পাওয়া যাইতাছে না।
পুলিশ যা বলছে
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, তাদের কাছে প্রাথমিকভাবে গ্রেফতারকৃত শাহীন ও শাকিল দাবি করেছে যে, আলামিন এক নারীর কানের দুল ছিনতাই করেছিল। কিন্তু সেই নারীকে খুঁজে পাচ্ছে না তারা।

এ বিষয়ে ওয়ারী থানার এসআই ও তদন্ত কর্মকর্তা রিয়াজ রহমান বলেন, আমরা দুজনকে গ্রেফতার করেছি। বাকিদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। আমরা শুনেছি, আসামিরা দাবি করছে আলামিন এক নারীর কানের দুল ছিনতাই করেছিল। বাকিরা পলাতক। তাদের খোঁজা হচ্ছে।
মাদক-সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এখনো এমন বিষয় পাইনি। তবে সব বিষয়কে মাথায় রেখে তদন্ত করা হচ্ছে।
জানা গেছে, সোমবার বিকেলে যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে আহত অবস্থায় এক যুবককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
সেদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই যুবককে নিয়ে আসা অটোরিকশাচালক ইসরাফিল জানিয়েছিলেন, যাত্রাবাড়ী বাসস্টেশন এলাকায় এক নারীর কানের দুল ছিনিয়ে নেওয়ার সময় ওই যুবক হাতেনাতে ধরা পড়েছিলেন। পরে ওই নারী তাকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে চলে যান। এরপর উপস্থিত লোকজন তাকে পিটুনি দেন। পরে সেখানকার লোকজন অটোরিকশায় তুলে দিয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। এরপর এক নিরাপত্তাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে কিছুক্ষণ চিকিৎসাধীন থাকার পর বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে আলামিনের মৃত্যু হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ফ্লাইওভারের পিলারের নিচে এক যুবককে রশি দিয়ে কোমর ও হাত বেঁধে একজন সবুজ পাইপ দিয়ে বেধড়ক পেটাচ্ছে। আর আশপাশে থাকা লোকজন তা দেখছে। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করছে না।

পুলিশের কাছে দেওয়া দুই আসামি দাবি করেছে, আলামিন ছিনতাই করেছিল। সে কারণে তারা তাকে পিটিয়েছিল। কিন্তু তাদের এমন ভাষ্য যাচাই করছে পুলিশ।
থানায় দৌড়াবেন, সেই খরচের টাকাও নেই পরিবারের
নিহত আলামিনের বাবা সুরুজ হাওলাদার বলছিলেন, ছেলেটা আমার শক্তি ছিল। সে মারা যাওয়ার পর এখন আমরা খেয়ে না খেয়ে আছি। মামলা করছি, কিন্তু দৌড়াদৌড়ি করব, সেই টাকাও নাই। শুনছি, দুজন আসামি ধরছে। রাব্বি আর বাদলরে এখনো ধরতে পারেনি। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।
আলামিনের মা রহিমা বেগম বলেন, আমার ছেলের কোনো দোষ আছিলো না। তারে ডাইকা নিয়্যা মাইরা ফালাইলো। কী হইছে, আমরা কিছুই জানবার পারি নাই। ছিনতাইয়ের অপবাদ দিয়া পোলাটারে পিটাইলো।
এমআইকে/এআর




