কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে চলমান রাস্তা নির্মাণ অবিলম্বে বন্ধসহ সাত দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। সংগঠনটির অভিযোগ, পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) আইন লঙ্ঘন এবং হাইকোর্টের নির্দেশনা অমান্য করে সৈকতের বালিয়াড়িতে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাজধানীর ধানমন্ডিতে জয়িতা ফাউন্ডেশনের জয়িতা টাওয়ারের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধন থেকে এসব দাবি জানানো হয়।
বাপার সহসভাপতি জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবিরের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য দেন বাপা কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য ও নগরবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব, বাপা কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি এম জাফর আলম দিদার, সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ করিম এবং বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সভাপতি আসাদুজ্জামান খানসহ অন্যরা। এ সময় বাপার কেন্দ্রীয় কমিটি ও বিভিন্ন শাখার নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জাকির হোসেন বলেন, কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ। সাময়িক উন্নয়নের নামে এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা হলে এর ক্ষতি অপূরণীয় হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবৈধ দখল, স্থাপনা নির্মাণ ও বালিয়াড়ি ধ্বংসের কারণে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা করে উন্নয়নের নামে সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে রাস্তা নির্মাণ জনগণের কাছে ভালো বার্তা দিচ্ছে না।
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতির ওপর হস্তক্ষেপের পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। বালির ওপর রাস্তা নির্মাণ একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রকল্প; এর পেছনে বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে।

বাপা কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি এম জাফর আলম দিদার বলেন, সমুদ্রের বালিয়াড়ি শুধু সৈকতের সৌন্দর্যের অংশ নয়; ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও শক্তিশালী ঢেউয়ের বিরুদ্ধে এটি উপকূলের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। একই সঙ্গে বালিয়াড়ি সামুদ্রিক কাঁকড়া, কচ্ছপসহ বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।
তিনি আরও বলেন, নির্বিচারে বালিয়াড়ি কেটে রাস্তা বা স্থাপনা নির্মাণ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে উপকূলীয় ভাঙন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং পর্যটন পরিবেশের অবনতি ঘটতে পারে। তাই সৈকতের বালিয়াড়ি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, সুগন্ধা বিচ পয়েন্টের বালিয়াড়ির ওপর রাস্তা নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় আমরা চরমভাবে উদ্বিগ্ন। পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে কথা বলায় বাপাকে নিয়ে নানা মন্তব্য করা হলেও সংগঠনটি পরিবেশ ও জনস্বার্থে তার অবস্থান থেকে সরে যাবে না। অবিলম্বে রাস্তা নির্মাণের কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে।
করিম উল্লাহ করিম বলেন, হাইকোর্টের রায়কে উপেক্ষা করে সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে রাস্তা নির্মাণ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়ি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশবিধ্বংসী রাস্তা নির্মাণ বন্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সভাপতি আসাদুজ্জামান খান প্রশ্ন তুলে বলেন, কার স্বার্থে বালিয়াড়িতে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে, তা জনগণ জানতে চায়। সাধারণত শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের মালামাল পরিবহনের জন্য রাস্তা নির্মাণ করা হয়। কিন্তু বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে কী ধরনের মালামাল পরিবহন করা হবে— সেই প্রশ্নেরও জবাব দিতে হবে।
মানববন্ধন থেকে বাপার পক্ষ থেকে সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— সুগন্ধা বিচসহ সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে চলমান রাস্তা নির্মাণ অবিলম্বে বন্ধ করা, হাইকোর্টের মামলা নম্বর ২২৬/২০১১-এর রায় ও নির্দেশনা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন এবং ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ স্থাপনা ও দখল উচ্ছেদ করা।
এ ছাড়া বালিয়াড়িতে কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) ও বিশেষজ্ঞ মতামত বাধ্যতামূলক করা, বালিয়াড়ি, সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজননক্ষেত্র ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ এবং পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
একই সঙ্গে কক্সবাজারে অবৈধভাবে টিলা ও পাহাড় কাটা বন্ধেরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এএইচ/এফএ




