- অর্থ বিভাগ অতিরিক্ত বরাদ্দে সম্মতি দিয়েছে
- স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় হবে
- পাঁচটি উন্নয়ন সহায়তা খাতে এই অর্থ দেওয়া হবে
- সিটি করপোরেশনগুলোর উন্নয়ন সহায়তা বাড়ছে
- ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই অতিরিক্ত অর্থ ব্যবহারের সুযোগ মিলবে
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন সহায়তা খাতে অতিরিক্ত ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা চেয়েছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ। এর বিপরীতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অতিরিক্ত ৮৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার সম্মতি দিয়েছে অর্থ বিভাগ। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন সহায়তা খাতে বিদ্যমান ৩ হাজার ২৫৫ কোটি টাকার বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগের গত ১৬ আগস্টের সম্মতিপত্র থেকে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন সহায়তা বাড়ানোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই এই অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে প্রতিটি খাতে ৫০০ কোটি টাকা করে মোট ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত চাওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি খাতে ১৬৯ কোটি টাকা করে মোট ৮৪৫ কোটি টাকা বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, মাঠপর্যায়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সরাসরি জনগণের উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় জনগণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে এসব প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন সহায়তা খাতে অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন। পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০ অর্জনেও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা রয়েছে বলে অর্থ বরাদ্দের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের জন্য ৫০০ কোটি টাকা করে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। বিদ্যমান ৩ হাজার ২৫৫ কোটি টাকার সঙ্গে এই অর্থ যোগ হলে মোট বরাদ্দ ৫ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অর্থ বিভাগ সেই চাহিদার পুরোটা অনুমোদন না করে ৮৪৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত দেওয়ার সম্মতি দিয়েছে।
অর্থ বিভাগের সম্মতি অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা খাতে বিদ্যমান ৯১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার সঙ্গে ১৬৯ কোটি টাকা যোগ হবে। এতে এ খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়াবে ১ হাজার ৮২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। উপজেলা উন্নয়ন সহায়তা খাতে বিদ্যমান ৮০৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার সঙ্গে একই পরিমাণ অর্থ যোগ হয়ে মোট বরাদ্দ হবে ৯৭৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
পৌরসভা উন্নয়ন সহায়তা খাতে আগে বরাদ্দ ছিল ৫০৪ কোটি টাকা। অতিরিক্ত ১৬৯ কোটি টাকা যুক্ত হওয়ায় এ খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়াবে ৬৭৩ কোটি টাকা। জেলা পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা খাতে বিদ্যমান ৫৮৮ কোটি টাকার সঙ্গে ১৬৯ কোটি টাকা যোগ হয়ে বরাদ্দ হবে ৭৫৭ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, সিটি করপোরেশন উন্নয়ন সহায়তা খাতে বিদ্যমান ৪৪১ কোটি টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত ১৬৯ কোটি টাকা যুক্ত হবে। এতে এ খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়াবে ৬১০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ স্থানীয় সরকার বিভাগের চাওয়া ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৮৪৫ কোটি টাকা। হিসাবে দেখা যায়, চাহিদার প্রায় ৩৪ শতাংশ অর্থের সংস্থান করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচটি খাতেই সমান ১৬৯ কোটি টাকা করে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, বাড়তি অর্থ পাওয়া গেলে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের চাহিদা পূরণ, নাগরিক সেবা সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে গতি আসবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়, নির্বাচিত সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ১৮০ দিনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ১২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন সহায়তা খাতে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে অভিমত দিয়েছেন বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব সৈয়দ আশরাফুজ্জামান স্বাক্ষরিত ১৭ আগস্টের চিঠিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের মন্ত্রীর আধা-সরকারি পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচটি উন্নয়ন সহায়তা খাতে বিদ্যমান বরাদ্দের সঙ্গে অতিরিক্ত ৮৪৫ কোটি টাকা দেওয়ার সম্মতি দেওয়া হয়েছে। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০ অর্জনের লক্ষ্যে বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা খাত থেকে এই অর্থের সংস্থান করা হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
আশরাফুজ্জামান জানান, স্থানীয় সরকার বিভাগের পাঁচটি উন্নয়ন সহায়তা খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে বিদ্যমান ৩ হাজার ২৫৫ কোটি টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত ৮৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার জন্য অর্থ বিভাগের সম্মতি রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি খাতে মোট বরাদ্দ ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকায় উন্নীত হবে।

তিনি আরও জানান, ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা খাতে বিদ্যমান ৯১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত ১৬৯ কোটি টাকা যোগ হয়ে মোট বরাদ্দ হবে ১ হাজার ৮২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। উপজেলা উন্নয়ন সহায়তা খাতে ৮০৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার সঙ্গে ১৬৯ কোটি টাকা যোগ হয়ে মোট বরাদ্দ দাঁড়াবে ৯৭৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পৌরসভা উন্নয়ন সহায়তা খাতে বিদ্যমান ৫০৪ কোটি টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত ১৬৯ কোটি টাকা যুক্ত হয়ে মোট বরাদ্দ হবে ৬৭৩ কোটি টাকা। জেলা পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা খাতে ৫৮৮ কোটি টাকার সঙ্গে ১৬৯ কোটি টাকা যোগ হয়ে বরাদ্দ দাঁড়াবে ৭৫৭ কোটি টাকা।
আশরাফুজ্জামান আরও বলেন, সিটি করপোরেশন উন্নয়ন সহায়তা খাতে বিদ্যমান ৪৪১ কোটি টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত ১৬৯ কোটি টাকা যোগ হয়ে মোট বরাদ্দ হবে ৬১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচটি খাতেই সমান ১৬৯ কোটি টাকা করে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের বরাদ্দ বাড়ানো অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে দক্ষ জনবল, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং কার্যকর জবাবদিহিতা প্রয়োজন।
তারা বলছেন, গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবার মান বাড়াতে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদিক হাসান ঢাকা মেইলকে বলেন, বর্তমানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাগুলোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে প্রশাসক বা সরকারি কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে এ সময়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ আড়াই হাজার কোটি টাকা চাইলেও ৮৪৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া অস্বাভাবিক নয়।
ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, বর্তমানে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। পৌরসভাগুলোতেও মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলররা দায়িত্বে নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনেককে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সামনে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন হয়ে নির্বাচিত নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণের পর তারা নিজ নিজ এলাকার প্রয়োজন ও চাহিদা মূল্যায়ন করে উন্নয়ন বরাদ্দের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। সেই বিবেচনায় বর্তমান পরিস্থিতিতে আড়াই হাজার কোটি টাকার পরিবর্তে ৮৪৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত। নির্বাচিত নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের প্রয়োজন ও চাহিদার ভিত্তিতে বরাদ্দ নির্ধারণ করাই বেশি কার্যকর হবে।
এএইচ/এআর




