শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

দিল্লিকে কঠিন শর্ত: সম্পর্কের ‘রিসেট’ চায় ঢাকা!

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০৮ পিএম

শেয়ার করুন:

দিল্লিকে ঢাকার কঠিন শর্ত: সম্পর্কের 'রিসেট' চায় ঢাকা!

দ্বিপাক্ষিক সফরে ভারতের প্রস্তাব এবং আগ্রহ সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর আপাতত স্থগিত। তার একটা বড় কারণ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া কয়েকটি শর্ত।

ভারত যখন সফর আয়োজনের চেষ্টা করছে তখন হঠাৎ এসব শর্ত অনেকটা 'বিস্ময়' হয়েই আসে ভারতের কাছে।

দেশটি অবশ্য প্রথম বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো ব্রিকস সম্মলনে আগামী সেপ্টেম্বরে। বাংলাদেশ সেটাতে রাজি হয়নি। ঢাকা বরং আগ্রহী ছিলো দ্বিপক্ষীয় সফরে।

তবে ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অনাগ্রহ জানার পর ভারত তড়িৎ পদক্ষেপ নেয় দ্রুত একটি দ্বিপক্ষীয় সফর আয়োজনের এবং সেটা চলতি অগাস্ট মাসেই।

তবে এর মধ্যেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায় ভারতের দিল্লিতে একটি প্রেস ব্রিফিংকে ঘিরে। যেখানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিষয়টি বাংলাদেশকে ক্ষুব্ধ করে। এর কড়া প্রতিক্রিয়া দেয় ঢাকা। যেটাকে অনেকেই বলেছেন 'নজীরবিহীন'।

বাংলাদেশের এই 'নজীরবিহীন' ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার দিন কয়েক পর গত ১০ অগাস্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী।

trk

পরদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদির সঙ্গে 'ওয়ান টু ওয়ান' বৈঠকে বাংলাদেশের মনোভাব তুলে ধরেন দিনেশ ত্রিবেদী। পরে ফিরে আসেন দিল্লীর নির্দেশনা নিয়ে।

তখন নতুন করে আবারো গতি পায় বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সফরের বিষয়টি। দুই দেশের গণমাধ্যমগুলোতে এমনকি সফরের সম্ভাব্য তারিখও দেওয়া হচ্ছিলো।

ঠিক তখনই গত রোববার ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং। যেখানে ভারত সফরের আগে 'সহায়ক পরিবেশের' তৈরির কথা বলা হয়। দেয়া হয় নানা শর্ত।

ঢাকায় গত রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে ব্রিফিং করে সেখানে কথা বলেন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম।

লিখিত বক্তব্যে ঢাকার পক্ষ থেকে দিল্লী সফরের আগে যে সহায়ক পরিবেশের কথা তিনি জানান, সেখানে কয়েকটি শর্তের কথা বলা হয়।

১. 'দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের' দ্রুত ফেরত পাঠানো

২. শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বাংলাদেশে হস্তান্তর

এই দুই শর্তের কথা ভারতকে পাঠানো হয়েছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশ ভারতের 'জবাবের অপেক্ষায় আছে।'

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে আগের মতোই তাদের অবস্থানের কথা জানিয়েছে যে, বাংলাদেশের অনুরোধের বিষয়টি তাদের 'পর্যালোচনায়' রয়েছে। যার সারকথা হচ্ছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ সহসাই হচ্ছে না। অর্থাৎ ভারত তার আগের অবস্থানেই আছে।

ভারতের এমন অবস্থান অবশ্য একেবারে অস্বাভাবিক নয়। কারণ ভারত শর্তে রাজি হয়ে শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে চাইবে তেমনটা কেউ ধারণা করেননি। 

ভারত অতীতে অনেক রাজনৈতিক নেতাকে তাদের দেশে আশ্রয় দিয়েছে, যাদের জোর করে ফেরত পাঠানো হয়নি। দালাই লামার মতো অনেকে তো সেদেশে বহুদিন ধরে অবস্থান করছেন।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। দলের প্রধান শেখ হাসিনাও পালিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে।

পরবর্তীকালে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম। সবমিলিয়ে বাংলাদেশে দলটি কোণঠাসা অবস্থায় থাকলেও গত ৫ অগাস্ট ভারতের দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে দলটি আবারো বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। আর সেটা ঘটছে ভারত থেকে।

বাংলাদেশের বিএনপি সরকার এটাকে হুমকি হিসেবেই দেখে। একইসঙ্গে শেখ হাসিনার প্রেস ব্রিফিং বা এ ধরনের তৎপরতার পেছনে ভারত সরকারের সমর্থন আছে কিনা সেটা নিয়েও উদ্বেগ আছে ঢাকার। যদিও এর সঙ্গে ভারত সরকারের কোন যোগসূত্র নাকচ করেছে দিল্লি।

বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং সরকারের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বক্তব্যে এটা স্পষ্ট, আওয়ামী লীগকে নিয়ে ভারতের ভূমিকায় এক ধরনের অবিশ্বাস আছে দেশটির ভেতরে।

গত ৮ অগাস্ট খোদ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে দিল্লিকে 'হাসিনা কার্ড' খেলার বিষয়ে সতর্ক করে বক্তব্য রাখেন।

তিনি বলেন, "আমরা আপনাদের (ভারতের) সঙ্গে সম্পর্ক রাখব। তার মানে এই নয় যে আপনারা হাসিনা কার্ড খেলবেন। আবার বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও চাইবেন। এই দুটো বিষয় একেবারেই বিপরীতমুখী।"

ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের এই যে সংশয়, দ্বিপাক্ষিক সফরের আগে সেটাই বাংলাদেশের সামনে এখন বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফলে বাংলাদেশ আগে এটারই সুরাহা করতে চায় অর্থাৎ খেলার আগে কোন নিয়মে খেলা হবে সেটা ঠিক করতে চায় ঢাকা।

সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীর বলেন, যেহেতু উনি (শেখ হাসিনা) ব্যক্তি হিসেবে একজন। কিন্তু তার পাশাপাশি উনার সংগঠন আছে। উনার সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আছে। এই সবগুলো বিষয় একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত। যেহেতু আমরা সেই সম্পর্ক থেকে সরে এসে সম্পর্কের একটা পুনর্বিন্যাস করতে চাচ্ছি, সেটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে এখন শেখ হাসিনা একটা বড় ইস্যু। তিনি বলেন, "ভারত-বাংলাদেশ রিলেশনশিপের মধ্যে শেখ হাসিনার উপস্থিতি, তার দলের সংশ্লিষ্টতা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস -সবগুলো বিষয়ই এখানে জড়িয়ে আছে।"

তবে এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশের বিবৃতিতে আরো কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। যেমন- অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়, সার্বভৌম সমতা স্থাপন এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া।

সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীরের মতে, এটা বলতে পারেন এক ধরনের পুনর্বিন্যাস করছি আমরা বা রিসেট করতে হচ্ছে রিলেশনটাকে। কারণ বাংলাদেশ এখন বলছে 'বাংলাদেশ ফার্স্ট'। তার অর্থ হচ্ছে, আমি কোন বিশেষ রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকতে চাই না। এরকম চিন্তা-ভাবনা থেকে আমরা একটা নতুন বাস্তবতার দিকে সামনে যেতে চাচ্ছি।" 

"ভারতের দিক থেকে এ ব্যাপারে হয়তো তারাও চিন্তা-ভাবনা করছে। কিন্তু চিন্তা-ভাবনা করলেই তো হবে না। এটাকে বাস্তব একটা জায়গায় আনবার জন্য দুই পক্ষের আলাপ-আলোচনা দরকার। এর জন্য আবার যথেষ্ট প্রস্তুতি দরকার," যোগ করেন হুমায়ুন কবীর।

এটা স্পষ্ট, বাংলাদেশ এই মুহূর্তে ভারতের সঙ্গে হঠাৎ করে একটা শীর্ষ বৈঠকের চেয়ে বরং সম্পর্কের ভিত্তি পুনর্বিন্যাস করাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। যেখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং সেটা নিয়ে বাংলাদেশের বিএনপি সরকারের এক ধরনের অবিশ্বাসও দৃশ্যমান।

কিন্তু এর ফলে সফর অনিশ্চিত হয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই জটিলতার দিকে যাচ্ছে কিনা সেই প্রশ্নও উঠছে। তবে সম্পর্কে যে এখনই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে কিংবা সেখান থেকে ফিরে আসার পথ নেই বিশ্লেষকরা আবার তেমনটাও মনে করছেন না।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, আমি সবসময় মনে করি যে, এখানে যে রাজনীতিটা আছে, সেটা সেভাবেই ডিল করা উচিত। হ্যাঁ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিবেচনায় থাকবে, কিন্তু সেটাই সব নয়। 

ভারতকে রাজনীতির ভাষা দিয়েই বোঝানোর দরকার যে, দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে কারণ ভারত এখানে বিশেষ দলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছে। জনগণের সঙ্গে নয়। এটাই ভারতকে বোঝাতে হবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এর জন্য শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক আটকে যাবে। কথা হবে না, আলোচনা হবে না।

অন্যদিকে ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তও মনে করেন, কথা বলা থামালে সেটায় কোন পক্ষের লাভ হবে না।

তিনি বলেন, এটা কি হতে পারে যে, ভারত আর বাংলাদেশ কথা বলবেই না। এটা তো হতে পারে না। তারেক রহমান ভারতে আসলে ইনডিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যে আলাপটা হতো, সেটা তো আর কোন কমিউনিকেশনের বিকল্প হতে পারে না। 

সামনা-সমানি দেখাটা তো একটা ডিফরেন্ট মিনিং রাখে। সেটা না হলে কীভাবে সম্পর্ক এগোবে বলুন। সুতরাং এখানে দু'পক্ষের অনেক বক্তব্য আছে। সামনা-সামনি বসলেই এগুলোর সমাধান সম্ভব।

বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে শুরু করতে হলেও শীর্ষ নেতাদের সরাসরি সংলাপ দরকার। সেটা হলে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার পথও বের হবে।

কিন্তু একবার সফর অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর এই সফর ঘিরে ঢাকার যেসব শর্ত এবং সম্পর্ক পূনর্বিন্যাসের আকাঙ্ক্ষা, তার সুরাহা কীভাবে হয় তার উপরই নির্ভর করছে অনেক কিছু।

-এমএমএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর