জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে। ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দুটি পুনরায় চালু হওয়ায় আমদানি করা এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৪৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। তবে দেশের মোট চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনো অনেক কম। সরকার সেই সংকট কাটাতে নানা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা গ্যাসের মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে আসছে প্রায় ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং পুনঃগ্যাসীকৃত এলএনজি থেকে আসছে ৮২৮ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ মোট সরবরাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন আমদানি করা এলএনজি থেকে আসছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে এবং গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে জাতীয় গ্রিডে আরও বেশি গ্যাস দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সাম্প্রতিক কারিগরি ত্রুটি ও আবহাওয়াজনিত সমস্যার পর এক্সিলারেট এনার্জি ও সামিট গ্রুপ পরিচালিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে আবারও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে।
এর আগে টার্মিনালগুলোতে সমস্যার কারণে এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ১৩-১৪ আগস্ট ২৪ ঘণ্টায় এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছিল প্রায় ৩০০ দশমিক ২ মিলিয়ন ঘনফুটে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে গ্যাসের সংকট তীব্র হয়ে ওঠে।
সবশেষ হিসাবে এলএনজি সরবরাহ বেড়ে ৮২৮ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে সামিটের টার্মিনাল থেকে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং বাকি গ্যাস মহেশখালীতে অবস্থিত এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে যাচ্ছে।
তবে এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ এখনো পুরো সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, টার্মিনালটিকে পূর্ণ সক্ষমতায় নিতে প্রয়োজনীয় কারিগরি কাজ করতে হবে। ফলে আপাতত সরবরাহ বাড়লেও পুরোপুরি স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে আরও সময় লাগতে পারে।
আরও পড়ুন
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ, শিগগির সমাধানের আশ্বাস
গ্যাসের এত সংকট কেন, কী বলছে জ্বালানি বিভাগ
পেট্রোবাংলার আগের কয়েক দিনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৯ আগস্ট সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ ছিল ৭৪৯ মিলিয়ন ঘনফুট। পাঁচ দিন পর ১৩ আগস্ট সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩০০ দশমিক ২ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ পাঁচ দিনের ব্যবধানে এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ কমেছিল প্রায় ৪৪৮ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট বা ৬০ শতাংশ। একই সময়ে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহও ২ হাজার ৩৭৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ১ হাজার ৯৩১ দশমিক ২ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ার ঘাটতি দেশীয় উৎস দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
গ্যাসের মোট সরবরাহ কমে গেলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ বাড়ানোর তথ্য রয়েছে। ৯-১০ আগস্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দৈনিক প্রায় ৬৯৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেয়েছিল। ১৩-১৪ আগস্ট তা বেড়ে ৯৫৩ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়ায়।
তবে এই সরবরাহও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চাহিদার তুলনায় অনেক কম। পেট্রোবাংলার হিসাবে, বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২ হাজার ৫২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সে হিসাবে সর্বশেষ সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চাহিদার ৪০ শতাংশেরও কম গ্যাস পেয়েছে।
সার কারখানাতেও সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। তবে এখানেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও সার খাতের বাইরে থাকা অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহ ব্যাপক কমেছে। ৯-১০ আগস্ট এই খাতে দৈনিক সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৫২০ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট। ১৩-১৪ আগস্ট তা নেমে আসে ৮৫৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। ফলে শিল্প, আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সিএনজি খাতের ওপরও সরবরাহ সংকটের প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়েও দেশীয় গ্যাস ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ থাকে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে সর্বশেষ সরবরাহ ২ হাজার ৪৪৩ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হলেও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি রয়ে গেছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
আরও পড়ুন
বিদ্যুৎ বিলে ‘শক’, লোডশেডিং-গ্যাস সংকটে নাকাল দেশ
আমদানিনির্ভরতা থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে বাংলাদেশ
এদিকে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জনদুর্ভোগের জন্য দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাস সংকট অনেকটাই কেটে যাবে এবং এর ফলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগের সরকার বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ দেনা রেখে গেছে এবং দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্তমানে সরকার নতুন গ্যাসকূপ খননের পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি জানান, দেশে তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংকট মোকাবিলায় চীন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গেও সরকার আলোচনা করছে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভ্রান্তি বা হঠকারী রাজনীতির পরিবর্তে সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে হবে। তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে যদি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের কার্যকর পরিকল্পনা থাকে এবং তা তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য হয়, তাহলে সরকার সেই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে প্রস্তুত।
জেবি




