শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

জাহাজ ভাঙা শিল্পে কেন বারবার দুর্ঘটনা?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম

শেয়ার করুন:

জাহাজ ভাঙা শিল্পে কেন বারবার দুর্ঘটনা?
জাহাজ ভাঙা শিল্পের নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে নতুন প্রশ্ন। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে আবারও বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনার পর ঘটনাটি তদন্তে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি থাকা সত্ত্বেও জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ডে বারবার কেন দুর্ঘটনা ঘটছে?

শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান শনিবার (১৫ আগস্ট) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাস্থলের জাহাজে স্বাভাবিকের তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড পাওয়া গেছে। তাঁর ভাষ্য, যে ইয়ার্ডে দুর্ঘটনা ঘটেছে সেটি কমপ্লায়েন্স বা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত হওয়ার কথা। তারপরও দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারও অবহেলা পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

স্থানীয় সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় জাহাজের একটি ট্যাংক কাটার কাজ চলছিল। জাহাজটিতে আগে এলএনজি বহন করা হতো। জাহাজে সিলিন্ডারের পাশাপাশি একটি ট্যাংকও ছিল। সেটি কাটার সময় সেখান থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন

ইউরোপের বিষাক্ত জাহাজের ভাগাড় চট্টগ্রাম উপকূল

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেছেন, জাহাজ কাটার আগে গ্যাসমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে পাইপ বা ট্যাংকে জমে থাকা গ্যাসে শ্রমিকরা আক্রান্ত হতে পারেন। অর্থাৎ দুর্ঘটনার প্রাথমিক যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে জাহাজ কাটার আগে ভেতরে জমে থাকা বিপজ্জনক গ্যাস সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা হয়েছিল কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মতে, জাহাজের কাঠামো অত্যন্ত জটিল হওয়ায় এটি ভাঙার কাজও জটিল ও বিপজ্জনক। একটি পুরোনো জাহাজের ভেতরে একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক, গ্যাস, তেল, ভারী ধাতু ও অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থ থাকতে পারে।

আইএলওর তথ্য অনুযায়ী, জাহাজ ভাঙার সময় অ্যাসবেস্টস, পারদ, সিসা, আইসোসায়ানেট ও সালফিউরিক অ্যাসিডের মতো বিষাক্ত ও ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থের সংস্পর্শে আসতে পারেন শ্রমিকরা। এসব পদার্থ শুধু শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে না, মাটি ও উপকূলীয় পানিও দূষিত করতে পারে।

একটি মাঝারি আকারের জাহাজে ৭ টন পর্যন্ত অ্যাসবেস্টস থাকতে পারে বলেও আইএলও জানিয়েছে। জাহাজের রং, কোটিং ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতে থাকা ভারী ধাতুও শ্রমিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত বা ভাঙা মোট জাহাজের প্রায় ৮০ শতাংশ বাংলাদেশ, ভারত ও তুরস্কে হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জাহাজ ভাঙা হয়েছে ভারতে। সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় এলাকায় গড়ে ওঠা শিপব্রেকিং শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও শ্রমিক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে।

Jahaj2

এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফরমের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ডগুলোতে এক হাজারের বেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৩ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফরমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২০ সাল থেকে আনুমানিক ২০ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক দেশের সমুদ্র সৈকতে ৫২০টির বেশি জাহাজ ভেঙেছেন।

আরও পড়ুন 

অতিমাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইডের কারণে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু

তবে জাহাজ ভাঙা শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মালিকপক্ষ পুরোনো অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়। বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন চৌধুরীর দাবি, আগের তুলনায় এখন শিল্পটির নিরাপত্তাব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে। তিনি বলেন, পরিবেশ, ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরকসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের সার্টিফিকেট পাওয়ার পরই একটি পুরোনো জাহাজ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়। জাহাজের আগের মালিকদেরও বিক্রির আগে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সার্টিফিকেট নিতে হয়। তার দাবি, জাহাজের আগের মালিকের দায়িত্ব থাকে সেটিকে পরিষ্কার ও নিরাপদ করে নতুন মালিকের কাছে হস্তান্তর করা। এরপর ইয়ার্ডে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কাজ শুরু হয়।

তাহলে নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকার পরও দুর্ঘটনা কেন? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মহসিন চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি জাহাজ ভাঙার আগে কোথায় গ্যাস বা বিপজ্জনক পদার্থ রয়েছে, জাহাজটি সম্পূর্ণ পরিষ্কার কি না, কোথায় কীভাবে কাজ হবে এবং শ্রমিকরা কীভাবে সেখানে প্রবেশ ও বের হবেন—এসব বিষয় পরীক্ষা করে নির্ধারণ করার কথা।

কিন্তু সীতাকুণ্ডের সর্বশেষ দুর্ঘটনা সেই প্রক্রিয়ার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একজন শ্রমিক ঘটনার পর অভিযোগ করেছেন, দুর্ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও গাড়ির ব্যবস্থা ছিল না। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।

Jahaj3

আর শিল্প সচিব জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলের জাহাজে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড পাওয়া গেছে। ফলে জাহাজটি যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না, গ্যাস শনাক্তকরণ ও শ্রমিকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার কথা।

সর্বশেষ দুর্ঘটনার জাহাজটি আগে এলএনজি বহন করত। ফলে জাহাজটির ট্যাংক, পাইপলাইন ও বিভিন্ন অংশে বিপজ্জনক গ্যাস বা রাসায়নিক অবশিষ্ট থাকার ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেশি।

মহসিন চৌধুরীর দাবি, প্রায় দেড় বছর আগে জাহাজটি আনা হয়েছিল এবং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ চলছিল। দুর্ঘটনাস্থলের ইয়ার্ডটিও ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হিসেবে সার্টিফায়েড বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন

চট্টগ্রামে ৯ শ্রমিক মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টায়ও হয়নি মামলা, তিন তদন্ত কমিটি গঠন

তবে সার্টিফিকেট থাকা এবং বাস্তবে প্রতিটি নিরাপত্তা ধাপ ঠিকভাবে অনুসরণ করা—দুটি বিষয় এক নয়। তাই সর্বশেষ দুর্ঘটনায় কাগজে-কলমে থাকা নিরাপত্তাব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর ছিল, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করার জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক হংকং কনভেনশন অনুসরণ করছে বলে জানিয়েছেন বিএসবিআরএর সভাপতি। বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জুনে ‘হংকং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অব শিপস’-এ যোগ দেয়। এই ব্যবস্থায় বিপজ্জনক পদার্থের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি কমানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সার্টিফিকেশন থাকার পরও যদি শ্রমিকরা বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, তাহলে নিয়মের বাস্তব প্রয়োগ কতটা হচ্ছে—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে শিল্প মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উভয় কমিটিই কাজ শুরু করেছে।

জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর