# অটো রিক্সা চালক থেকে মাদক ব্যবসায়ী
# আলমগীরের কাছে মাদক ব্যবসার ১৫ লাখ টাকা পেতেন
# রুবেলের মাদক বিক্রির সহযোগী কামরান ও কোরবান
# স্ত্রী রিসোর্টে আনতে গিয়ে গ্রেফতার
রাজধানীর পল্লবী এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী এম এম রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেল। এক পা পঙ্গু হলেও মাদক ব্যবসা, হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন তিনি। মাঝে মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে তার ভিডিও দেখা যেত।
সম্প্রতি পল্লবীতে মাদক ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেনকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় আবার আলোচনায় আসেন রুবেল। এ ঘটনায় তাকে ও তার চার সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর আগে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। পরে গাজীপুরের একটি রিসোর্টে অবস্থানরত স্ত্রীকে আনতে গিয়ে গ্রেফতার হন রুবেল।
ডিবি সূত্র জানায়, মঙ্গলবার রাতে রুবেলসহ তার সহযোগী পাপ্পুকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের ঢাকায় আনা হয়। অন্য সহযোগীদের পল্লবী এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ডিবি সূত্রের তথ্যের পাশাপাশি ঢাকা মেইলের অনুসন্ধানে রুবেলের অপরাধজগতের আরও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।
রুবেলের বিরুদ্ধে সাত মামলা
ডিবি জানিয়েছে, রুবেলের বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় সাতটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে পল্লবীর চিহ্নিত সন্ত্রাসী রাকিবুল হাসান সানি ওরফে পেপার সানি হত্যা মামলাটিও রয়েছে। গত বছরের জুনে পল্লবীর মোড়াপাড়া ক্যাম্প ও সংলগ্ন এলাকায় পেপার সানিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
নিহতের মা রোজিনা বেগম বাদী হয়ে ১০ জুন পল্লবী থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় এম এম রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেলকে প্রধান আসামি করা হয়। মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে বোমা কাল্লু, স্বপন, জিন্দা ও টানসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে। রুবেল ওই মামলায় গ্রেফতার না হলেও পরে গোপনে আদালত থেকে জামিন নেন বলে ডিবি সূত্র জানিয়েছে।
আলমগীরকে হত্যাচেষ্টার ঘটনা
গত ৭ আগস্ট বিকেলে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ২ নম্বর সড়কের ২৬ নম্বর বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে ইমনের চায়ের দোকানের সামনে আলমগীর হোসেনকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় জ্যোৎস্না নামের ৬৩ বছর বয়সী এক নারীও গুলিবিদ্ধ হন।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই দিন বিকেলে আলমগীর চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন। এ সময় মেরুন রঙের একটি প্রাইভেট কারে (ঢাকা মেট্রো গ-৪৫-৫৮৬১) করে সেখানে যান ল্যাংড়া রুবেল, পাপ্পু ও শহীদুল। তারা আলমগীরকে জোর করে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করেন।
এ সময় আলমগীর ধস্তাধস্তি শুরু করলে রুবেলের হাতে থাকা পিস্তলের বাঁট দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। তখন একটি গুলি বের হয়ে ৬৩ বছর বয়সী পথচারী জ্যোৎস্নার শরীরে লাগে। এরপর আলমগীর দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে তাকে লক্ষ্য করে তিনটি গুলি করা হয়। এজাহারে বলা হয়েছে, গুলি তার মাথা, পেট ও পিঠে লাগে।
পরে স্থানীয় লোকজনের বাধার আশঙ্কায় রুবেল, পাপ্পু ও শহীদুল দ্রুত গাড়িতে করে পালিয়ে যান।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তারা রুবেলকে চিনতে পেরেছিলেন। তিনি এলাকায় পরিচিত এবং বিহারি হিসেবে পরিচিত হওয়ায় তার গাড়ি আটকানোর চেষ্টা করেছিলেন তারা। তবে রুবেলের হাতে পিস্তল থাকায় শেষ পর্যন্ত কেউ বাধা দেননি।
এ ঘটনায় আলমগীরের স্ত্রী রিনা আক্তার বাদী হয়ে ৮ আগস্ট পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলায় রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেল (৩৭), পাপ্পু ওরফে শাকিল আহমেদ ওরফে শাকির আহমেদ ওরফে পাপ্পু (৪১)সহ ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে।
আলমগীরের কাছে ১৫ লাখ টাকা পাওনা দাবি
গ্রেফতারের পর ডিবির কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রুবেল দাবি করেছেন, মাদক ব্যবসায়ী আলমগীরের কাছে তার ১৫ লাখ টাকা পাওনা ছিল। দীর্ঘদিন ধরে আলমগীর ওই টাকা দেওয়ার কথা বলে তাকে ঘোরাচ্ছিলেন। এমনকি ফোন করলেও আলমগীর ফোন ধরতেন না। এ নিয়ে ক্ষোভ থেকেই ৭ আগস্ট তাকে হত্যার চেষ্টা করেন বলে রুবেল দাবি করেছেন।
ডিবির পল্লবী জোনাল টিমের এসএএম ফজল ই খুদা পলাশ ঢাকা মেইলকে বলেন, রুবেল দাবি করেছেন, আলমগীরের কাছে তার ১৫ লাখ টাকা পাওনা ছিল। টাকা চাইলেও তিনি তা পাচ্ছিলেন না। তবে এই দাবি সত্য কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। রুবেলের বিরুদ্ধে পেপার সানি হত্যা মামলাসহ সাতটি মামলা রয়েছে।
আরও পড়ুন: ইসিতে তথ্য ফাঁসের আতঙ্ক!
অটোচালক থেকে মাদক ব্যবসায়ী
রুবেল একসময় সুস্থ ছিলেন। ২০১০ সাল থেকে তিনি অটো চালানো শুরু করেন। তবে অটো চালানোর আড়ালে তিনি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ২০১৫-১৬ সালের দিকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পুলিশের খাতায় তার নাম ওঠে।
পরে তাকে গ্রেফতারে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানের সময় দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ তার পায়ে গুলি করে। এরপর থেকেই এক পা পঙ্গু হয়ে যায় তার। তবে পঙ্গুত্বের কারণে চলাফেরায় সমস্যা হলেও মাদক ব্যবসা ছাড়েননি তিনি।
ডিবি ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষকে হত্যারও চেষ্টা করেছেন রুবেল। তার বিরুদ্ধে থাকা সাতটি মামলার মধ্যে একটি হত্যা এবং বাকিগুলো হত্যাচেষ্টার মামলা বলে জানিয়েছে ডিবি। এসব মামলার বাদী ও ভুক্তভোগীদের মধ্যে কেউ চিহ্নিত সন্ত্রাসী, আবার কেউ মাদক ব্যবসায়ী।
কামরান-কোরবানের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা
রুবেলের মাদক ব্যবসা পরিচালনায় কামরান ও কোরবান নামে দুই ভাইয়ের ভূমিকা ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। কামরানকে পল্লবী এলাকার দায়িত্ব এবং কোরবানকে মিরপুর-১১-এর এভিনিউ ফাইভ এলাকার দায়িত্ব দিয়েছিলেন রুবেল। কামরান পল্লবীর পাশাপাশি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রুবেলের মাদক সরবরাহ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে কামরান ও কোরবান এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েননি।
এ বিষয়ে ডিবির পল্লবী জোনাল টিমের এসএএম ফজল ই খুদা পলাশ বলেন, তারা এখনো কামরান ও কোরবানের নাম পাননি। রুবেলের সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত থাকতে পারেন। তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
স্ত্রীকে রিসোর্ট থেকে আনতে গিয়ে গ্রেফতার
ডিবি সূত্র জানায়, আলমগীরকে হত্যাচেষ্টার পর ভারতে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সীমান্ত এলাকায় গিয়েছিলেন রুবেল। সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি জানতে পারেন, তার ফুপা শ্বশুরকে ডিবি আটক করেছে। এরপর কুমিল্লার সীমান্ত এলাকা থেকে দ্রুত গাজীপুরে চলে আসেন তিনি।
গাজীপুরের একটি রিসোর্টে তার স্ত্রী অবস্থান করছিলেন। স্ত্রীকে নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল রুবেলের। তাকে ধরতেই ফুপা শ্বশুরের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে ডিবি।
পরে ডিবির সদস্যরা কৌশলে ওই রিসোর্টে অবস্থান নেন। সীমান্ত এলাকা থেকে রুবেল রিসোর্টে পৌঁছামাত্র তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার সহযোগী পাপ্পুকেও গ্রেফতার করা হয়।
এআরএম/এমআইকে




