মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

ইসিতে তথ্য ফাঁসের আতঙ্ক!

মো. মেহেদী হাসান হাসিব
প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৬ পিএম

শেয়ার করুন:

ইসিতে তথ্য ফাঁসের আতঙ্ক

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের আবেদন করতে ঢাকায় আসছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নাগরিকরা। কিন্তু আবেদন অনুমোদনের আগেই তাদের ফোন করে কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে টাকা চাওয়া হচ্ছে। এমনকি ফোনের অপর প্রান্ত থেকে নাগরিকের আবেদন ও ব্যক্তিগত তথ্যও জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে এনআইডির সংরক্ষিত তথ্য কীভাবে বাইরে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তথ্য ফাঁসের আশঙ্কার পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনায় নিজেদের ভাবমূর্তি ও সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন নির্বাচন কমিশনের এনআইডি কর্মকর্তারাও।

নির্বাচন ভবনের ৮ম তলা (লেভেল-৭)-এ জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সংশোধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। গত সোমবার (১০ আগস্ট) এ স্থানে সরেজমিনে কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা নির্বাচন ভবনের হেল্প ডেস্কে এনআইডি সংশোধনের আবেদন ও কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর তাদের ফোন করে বলা হয়, টাকা না দিলে তাদের এনআইডি সংশোধন হবে না। আর টাকা চাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করা হয়। তবে অভিযোগ নিয়ে নির্বাচন কমিশনে আসার পর দেখা যায়, তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। যে ফোন নম্বর থেকে তাদের টাকা দেওয়া কিংবা কথা বলার জন্য যোগাযোগ করা হয়েছিল, সেই নম্বর নির্বাচন কমিশনের কারও নয়। এমনকি পরে নম্বরটি বন্ধও পাওয়া গেছে।

গত মাসে রফিকুল ইসলাম তার স্ত্রীর এনআইডি সংশোধনের আবেদন নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়ে গিয়েছিলেন। জমা দেওয়ার সাত দিন পর তার কাছে অপরিচিত একটি মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নামে টাকা চাওয়া হয় এবং তাকে একটি বিকাশ নম্বর দেওয়া হয়। ওই নম্বরে তিনি ৭ হাজার টাকাও দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে এক মাসেও সংশোধন না হলে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেন। তার সামনেই ওই কর্মকর্তার অধীনস্থ সবাইকে ডেকে তাদের মোবাইল যাচাই করা হয় এবং তাদের এনআইডির বিপরীতে কতটি সিম রয়েছে, তাও যাচাই করা হয়। কিন্তু কারও নম্বরের সঙ্গে ওই নম্বরের কোনো সম্পর্ক খুঁজে না পাওয়ায় ভুক্তভোগী বুঝতে পারেন, তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

রফিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি ইসিতে কাগজপত্র জমা দিয়ে গেলাম। তারপর আমার কাছে ফোন করে টাকা চাইল। আমি তো তাহলে ধরে নেবই যে নির্বাচন কমিশন থেকেই আমাকে ফোন করা হয়েছে। কারণ কাগজপত্র জমা দিয়েছি—এটা আমি আমার পরিবারের সদস্য আর নির্বাচন কমিশনের জনবল ছাড়া আর কারও জানার কথা নয়। এ জন্য বিশ্বাস করে টাকাটা দিয়েছি। পরবর্তী সময়ে সংশোধন না হলে ওই মোবাইল নম্বরে বারবার যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া না পেয়ে আজ এখানে এসেছি। এসে জানতে পারলাম, আমি প্রতারণার শিকার হয়েছি। তবে আমার তথ্য প্রতারকেরা কীভাবে জানল, তথ্য ফাঁসই বা কীভাবে হলো—এ বিষয়ে জানতে চাইলে কর্মকর্তারা আমাকে কোনো উত্তর দিতে পারেননি।’

ec

এদিকে ছমিল আহমেদ নামের আরেক ভোটারও একই অভিযোগ নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখানে কাগজ জমা দেওয়ার পর একটি মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করে এনআইডি সংশোধনের নামে টাকা চাওয়া হয়। আমি বিকাশ নম্বর চাইলে তারা একটি বিকাশ নম্বর দেয়। সেই নম্বরসহ আমি এখানে এসে অভিযোগ দিই। পরবর্তী সময়ে জানতে পারি, দুটি নম্বরই নির্বাচন কমিশনের কারও নয়। তবে আমারও প্রশ্ন—আমরা আবেদন এখানে জমা দিয়ে গেলাম, আর আমাদের নম্বরে কল করে টাকা চাওয়া হচ্ছে। তাহলে আমাদের এসব তথ্য প্রতারকেরা কীভাবে পাচ্ছে?’

এমন অভিযোগ নিয়ে এনআইডি অনুবিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিগত কয়েক দিন ধরে এমন অভিযোগ তাদের কাছে আসছে। এতে কর্মকর্তারাও অবাক। আবেদন নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই নাগরিকদের কাছে কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে টাকা চাওয়া হচ্ছে। নাগরিকরাও না বুঝে প্রতারকদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে অর্থ দিচ্ছেন। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েক দিন অপেক্ষা করে কোনো ধরনের বার্তা না পেয়ে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দিচ্ছেন। এতে একদিকে তথ্য ফাঁসের ঘটনায় যেমন আমরা আতঙ্কে আছি, তেমনি ভাবমূর্তি ও সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়ার শঙ্কায়ও আছি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, গত রোববার (৯ আগস্ট) একজন সেবাগ্রহীতা জরুরি প্রয়োজনে নিজের আবেদন নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন। আমাদের এখান থেকে বের হওয়ার পরপরই তার কাছে ফোন করে টাকা চাওয়া হয়। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আবার ভবনে এসে কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানালে প্রতারককে শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে সেবাগ্রহীতাকে দিয়ে ফোন করানো হয় এবং টাকা পাঠানোর কথা বলে বিকাশ নম্বর চাওয়া হয়। প্রতারক বিকাশ নম্বর পাঠালে আমরা প্রতারকের মোবাইল নম্বর ও বিকাশ নম্বর—দুটিই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠিয়ে দিই, পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।

nid

তিনি আরও বলেন, ‘এমন ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় করণীয় ঠিক করতে সব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমরা বৈঠক করেছি। সেখানে সবাইকে আরও সতর্ক হতে এবং নিজেদের অধীনস্থদের ওপর আরও নজরদারি রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সেবাগ্রহীতাদের সচেতন করার জন্যও বলা হয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনআইডি অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন) মো. সাইফুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা নাগরিকদের সচেতন করছি, যাতে এ ধরনের ফোন কলে তারা বিভ্রান্ত না হন। আর এসব প্রতারককে ধরতে আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

জানা যায়, ২০২০ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের ২ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৬ বছর ৭ মাসে এনআইডি সংশোধনের মোট আবেদন জমা পড়েছে ৬৩ লাখ ৭৮ হাজার ৭৩০টি। এসব আবেদনের মধ্যে ৬২ লাখ ৩০ হাজার ৫৯২টি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে, যা মোট আবেদনের প্রায় ৯৮ শতাংশ। এর মধ্যে ৪০ লাখ ৬১ হাজার ১৪৬টি আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন কারণে ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৪৫৪টি আবেদন বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে ১ লাখ ৫০ হাজারের মতো আবেদন বিভিন্ন পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

এমএইচএইচ/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর