• সিক্রেট গ্রুপে নারী সহকর্মীদের নিয়ে অশালীন চর্চা
• ৭ কর্মকর্তার নাম প্রকাশ্যে
• যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল চান নারী কর্মকর্তারা
• অভিযোগ নিয়ে কঠোর বার্তা চেয়ারম্যানের
দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, সেই প্রতিষ্ঠানেরই কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাবেক এক নারী সহকর্মীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে। একটি ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ওই নারীর শারীরিক গঠন, ব্যক্তিগত ও দাম্পত্য জীবন নিয়ে আপত্তিকর আলোচনা এবং যৌন হয়রানিমূলক রসিকতা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
বিষয়টি সামনে এসেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ফারিয়া আজাদের একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে। পোস্টটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকে এ ধরনের আচরণের নিন্দা জানিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।
ফারিয়া আজাদ বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে দীর্ঘদিন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন। পরে সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে বর্তমানে সুইডেনে টক্সিকোলজি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত আছেন।
ফারিয়া আজাদের অভিযোগ, বিদেশে অবস্থানকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তার বিভিন্ন ছবি ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে সাবেক কর্মস্থলের কয়েকজন সহকর্মী আপত্তিকর আলোচনা করতেন। এ জন্য তারা ‘সংগ্রাম সৈনিকদের সঞ্চয়’ নামে একটি ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও তৈরি করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই গ্রুপে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন। তাদের কেউ কেউ ফারিয়া আজাদকে নিয়ে তার শারীরিক গঠন, ব্যক্তিগত জীবন ও দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন।
ওই কথোপকথনের কিছু স্ক্রিনশট কোনোভাবে ফারিয়া আজাদের হাতে পৌঁছায়। পরে তিনি সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে নিজের ক্ষোভ ও বিস্ময়ের কথা জানান।
ফেসবুক পোস্টে ফারিয়া আজাদ বলেন, চার বছর আগে যে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে এসেছেন, এখানকার সাবেক সহকর্মীদের কেউ তাকে নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করতে পারেন— এটি তার কাছে অবিশ্বাস্য। একই সঙ্গে কর্মস্থলে নারী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা ও সহকর্মীদের বিকৃত মানসিকতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ফারিয়া আজাদের প্রকাশ করা স্ক্রিনশটগুলোতে তার সাবেক কয়েকজন সহকর্মীর কথোপকথন দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। সেখানে তার শারীরিক গঠন, দাম্পত্য জীবন ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে বিভিন্ন আপত্তিকর মন্তব্য রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তারা হলেন— রাজশাহী জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসার চিন্ময় প্রামাণিক, সিলেট জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসার সৈয়দ সারফরাজ হোসেন, জামালপুর জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসার আবু নাসের মোহাম্মদ শফিউল্লাহ, রংপুরের নিরাপদ খাদ্য অফিসার মো. লোকমান হোসেন, মৌলভীবাজার জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসার মো. শাকিব হোসাইন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শাকিল আহম্মেদ।
অভিযোগকারীর দাবি, নাম উল্লেখ করা ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন বর্তমানে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে কর্মরত। অন্যরা চাকরি ছেড়ে বর্তমানে ভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন।
ঘটনার পর ফারিয়া আজাদ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান কর্মকর্তাদের কাছে ই-মেইলে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে তিনি বিষয়টির প্রতিকার এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, তিনি এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
তিনি স্পষ্ট জানান, অভিযোগটি যথাযথভাবে তদন্ত করা হবে এবং তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র ছাড় না দিয়ে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে যাতে কোনো নারী কর্মী এমন হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা হবে।
এদিকে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে ‘উইমেন হ্যারাসমেন্ট প্রিভেনশন সেল’ বা ‘নারী হয়রানি প্রতিরোধ সেল’ গঠনের আবেদন জানিয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে কর্মক্ষেত্রে কোনো নারী কর্মকর্তা বা কর্মচারী হয়রানি, অশালীন আচরণ, অপব্যবহার বা বৈষম্যের শিকার হলে যেন সহজে অভিযোগ জানাতে ও প্রতিকার পেতে পারেন, সে জন্য এ ধরনের সেল গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
আইনজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা জানান, কর্মক্ষেত্রে কোনো নারী সহকর্মীর শারীরিক গঠন বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনলাইন গ্রুপে কুরুচিপূর্ণ আলোচনা সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন। উচ্চ আদালতের রিট পিটিশন নং ৫৯৩৯/২০০৮-এর নির্দেশনা অনুযায়ীও কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি এ ধরনের সাইবার ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউই কথা বলতে রাজি হননি।
বিইউ/এএস




