দুপুরের আকাশজুড়ে ঝুম বৃষ্টি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) জাদুঘরের ভেতর বিদ্যুৎ না থাকায় চারদিকে অন্ধকার। সেই অন্ধকারে মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে কাঁচের ভেতরে সংরক্ষিত একটি রক্তমাখা শার্ট–প্যান্টের দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলেন এক ব্যক্তি। কিছুক্ষণ পর কাঁচের ওপর হাত রেখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি।
তিনি শহীদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার বাবা রতন চন্দ্র তরুয়া।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে গত বুধবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আমন্ত্রণে ক্যাম্পাসে এসেছিলেন রতন চন্দ্র। পরদিন বৃহস্পতিবার বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি যান বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে। সেখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে তার ছেলে হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার রক্তমাখা শার্ট ও প্যান্ট- যে পোশাক পরে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন হৃদয়।
কাঁচের ভেতরে রাখা পোশাকটির দিকে দীর্ঘক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে থাকেন রতন চন্দ্র। এরপর কাঁপা হাতে কাঁচ স্পর্শ করেন। যেন কাঁচের ওপাশেই দাঁড়িয়ে আছে তার একমাত্র ছেলে। মুহূর্তেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। উপস্থিত অনেকের চোখও ভিজে ওঠে সেই দৃশ্যে।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে রতন চন্দ্র বলেন, ‘মানুষের বাসায় কাজ করে সেই টাকা দিয়ে এই শার্টটাই ওর মা ওরে কিনে দিছিল। ওই শার্ট পইরাই ও শহীদ হয়ে গেছে।’
কথা বলতে বলতেই তিনি বারবার থেমে যাচ্ছিলেন। বলেন, ‘আমি কাঠমিস্ত্রীর কাজ করতাম। ওর মা মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করত। আমরা সাধারণ পরিবার। ভাড়া বাসায় থাকি। ওর একটাই স্বপ্ন ছিল, পড়ালেখা করে কিছু করবে।’
রতন চন্দ্র জানান, হৃদয় ছিল তার একমাত্র ছেলে। ছেলেকে হারানোর পর মেয়ে, জামাতা ও নাতনিকে নিজের কাছে এনে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু শূন্যতা কাটেনি।
ছেলে হত্যার বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। আমার বাড়িও অনেক দূরে। এখানকার কাউকে চিনি না। তাই আমি নিজে মামলা করিনি। একজন বাদী হয়ে ২৬৫ জনকে আসামি করে মামলা করেছে। কিন্তু তারা সেই মামলা নিয়ে রাজনীতি করছে, ব্যবসা করছে। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই। যারা এই হত্যা মামলা নিয়ে ব্যবসা করছে, তাদেরও বিচার চাই।’
আরও পড়ুন:
হৃদয় চন্দ্র তরুয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায়। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হৃদয় ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন। পরে ২৩ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রক্তমাখা সেই শার্ট–প্যান্ট এখন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক নিদর্শন। কিন্তু একজন বাবার কাছে সেটিই সন্তানের শেষ স্মৃতি, শেষ স্পর্শের প্রতীক। তাই জাদুঘরের নীরবতার মধ্যে রক্তমাখা পোশাকের সামনে দাঁড়িয়ে তার কান্না যেন শুধু একজন বাবার নয়, হারিয়ে যাওয়া এক প্রজন্মের স্বপ্নের জন্যও।
সূত্র: বাসস
এমআই




