শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ঢাকা

লাশ ভেবে ভ্যানে তোলা হয়েছিল রাব্বীকে

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৩ এএম

শেয়ার করুন:

লাশ ভেবে ভ্যানে তোলা হয়েছিল রাব্বীকে
মহিউদ্দিন রাব্বী

# খুব কাছ থেকে তিন রাউন্ড গুলি করা হয়
# গুলি ঢুকে মেরুদণ্ডের দুটি হাড় ভেঙে যায়
# শরীর থেকে বের হয় ৭.৬২ বুলেট
# যাত্রাবাড়ী থানার তরুণ পুলিশদের গুলি বেশি হিংস্র ছিল
# নির্বিচারে গুলিতে পড়ে ছিল ১০-১২ জনের লাশ

সময়টা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের দুপুর। ঘড়ির কাটায় তখন আড়াইটা পেরিয়ে। শনিরআখড়ার রাস্তায় তখন কয়েক হাজার মানুষ। এরই মাঝে এক ঝাঁক মিছিল আসে সাইনবোর্ড এলাকা থেকে। তারা যাত্রাবাড়ী থানার দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে। থানার সামনে যেতেই বেরিয়ে আসে পুলিশ। 

থানা ভবন ও পাশের টেলিফোন ভবন ছাড়াও সরাসরি থানা চত্বর থেকে বেরিয়ে এসে গুলি করা শুরু করে পুলিশ সদস্যরা। তারা ছিলেন প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন। অন্যদিকে হাজার হাজার মানুষ তখন থানার সামনের রাস্তায়। ঠিক ফ্লাইওভারের পিলারের আশপাশে। এ সময় বের হয়েই কিছু বুঝে ওঠার আগেই বেপরোয়া গুলি চালাতে শুরু করে পুলিশ। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন অর্ধ শতাধিক মানুষ। 

তার মধ্যে সেখানেই নিহত হন অন্তত ১০-১২ জন। পুলিশের সেই গুলির সময় মেরুদণ্ডে গুলি লেগে নিথর হয়ে পড়েছিলেন মহিউদ্দিন রাব্বী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলে জনতা তাকে মৃত ভেবে অন্য লাশের সঙ্গে একটি ভ্যানে তোলে। কিন্তু জীবিত ছিলেন রাব্বী। তিনি শব্দ করে বসেন। তখন বুঝতে পেরে তাকে দ্রুত ভ্যান থেকে নামিয়ে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেদিন তাকে হাসপাতালে যথা সময়ে নেওয়া না হলে তিনিও শহীদের তালিকায় নাম লেখাতেন। 

এরপর থেকে রাব্বী আর সুস্থ জীবনে ফিরতে পারেননি। তার ডান চোখ চিরতরে অন্ধ হয়ে গেছে। মেরুদণ্ডের দুটি হাড় ভেঙে যাওয়ায় তিনি এখনে আধা ঘণ্টাও কোথাও বসে বা থাকতে পারেন না। এক চোখে কোনও মতে চলাফেরা করেন। দাঁত দুটো ভাঙা। পেটে ৩২ ইঞ্চির সেলাই। পিঠে গুলি বের করার ও মলমূত্রের নল ঢোকানোর সেই চিহ্ন আজও দগদগে। দুই হাতে পেটে, মুখে কপালে ছররা গুলির চিহ্ন। মহিউদ্দিনের ডান চোখে লাগা গুলিটা এখন মস্তিষ্কের ভেতরে। তাকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়েছিল কিন্তু লাভ হয়নি৷ তার চোখ রক্ষা হয়নি। ফলে এক চোখেই এখন পৃথিবী দেখেন তিনি।

কয়েক মাস পর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে পুুলিশের বেপেরোয়াভাবে গুলি চালিয়ে নির্মমভাবে আন্দোলনকারীদের হত্যার লোকহর্ষক দৃশ্য। সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দেখলে এখনো গা শিউরে ওঠে।      

যাত্রাবাড়ী থানার সামনে সেদিন যা ঘটেছিল

রাব্বী বলছিলেন, সেই সময় যাত্রাবাড়ী পুলিশ প্রথম গুলিটাই আমাকে করে বসে। আমি ছিলাম থানার সামনে ফ্লাইওভারের পশ্চিম পিলারের পেছনে। গুলি করতে করতে বেরিয়ে আসছিল পুলিশ সদস্যরা। আমরা তো খালি হাতে। পিলারের পেছনে লুকানোর চেষ্টায় ছিলাম। এক পর্যায়ে যে যার মতো পালিয়ে গেল। কিন্তু আমরা পিলারের পেছনে অন্তত ১০০ জন ছিলাম। যদিও সেখানে দাঁড়ানো সম্ভব মাত্র ৪-৫ জন। পুলিশ বের হয়েই যে গুলিটা প্রথম চালালো সেটা আমার পেছন দিক দিয়ে ঢুকে মেরুদণ্ডের হাড়ে আঘাত করলো। মুহূর্তেই মাটিতে পড়ে গেলাম। আমার আশপাশে যারা গুলি খেয়েছিল সবাই স্পট ডেথ। আমি শুধুমাত্র জীবিত ছিলাম। বাকিরা যে যার মতো করে পালিয়েছে। 

এরপর যা হলো তার আরও ভয়ানক বলছিলেন রাব্বী। তার শরীর থেকে বের হওয়া রক্তে ভিজে যাচ্ছিলো সড়ক। তখন তিনি বারবার দোয়া দরুদ পড়ছিলেন। হঠাৎ মনে হলো তার মায়ের কথা। দ্রুত পকেট থেকে মোবাইল বের করে মাকে কল করে বলেন, আম্মু আমি গুলি খেয়েছি। যাত্রাবাড়ী থানার সামনে পড়ি আছি। এই কথা বলার সময় সামনে থাকা একজন পোশাক ছাড়া পুলিশ সদস্য তার হাতে থাকা ফোনটা লাথি মেরে ফেলে দেয়। 

এরপর তার হাতে বুট দিয়ে মাড়াতে থাকে। অসহ্য ব্যথা সহ্য করে তিনি বারবার আল্লাহ আল্লাহ করছিলেন। কিছুক্ষণ পর পাশে থাকা একজন পুলিশ সদস্য তাকে দুই রাউন্ড গুলি করে বসে। বারবার গুলি না করার অনুরোধ করলেও শোনেন নি সেই পুলিশ সদস্য।  

কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। সাধারণ জনগণ দ্রুত ছুটে আসেন থানার সামনে। গুলি খেয়ে পড়ে থাকা নিথর মৃতদেহগুলো তারা উদ্ধার শুরু করেন। প্রথমেই তাকে মৃত ভেবে একটি ভ্যানে তোলেন তারা। এরপর তার ওপর দেওয়া হয় কয়েকটি মৃতদেহ। কিন্তু তখন তিনি খানিকটা শব্দ করে ওঠেন। এতেই তারা বুঝতে পারেন, রাব্বী জীবিত। দ্রুত তারা তাকে সেই ভ্যানে কিছুদূর নিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

মা মানা করলেও শোনেননি মহিউদ্দিন

সেদিন সকাল ১১ টায় বের হন মহিউদ্দিন। যাওয়ার সময় তার মা তাকে বারবার বলছিলেন, বাবা আমি খারাপ স্বপ্ন দেখছি তুই বাইরে যাইস না। কিন্তু মায়ের কথায় কর্ণপাত করেননি মহিউদ্দিন। মাকে ফাঁকি দিয়েই বেরিয়ে পড়েন আন্দোলনে। এরপর বিকেলে যখন ‍গুলি খাওয়ার পর আহত অবস্থায় প্রথম মাকে ফোন করে তার খবরটি দেন। সেই খবর শুনে মা তখন দিশেহারা। পরে সন্ধ্যার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাব্বীর খোঁজ পান স্বজনরা। 

রাব্বী বলেন, আম্মু আমারে কইলো-বাবা খারাপ স্বপ্ন দেখছি তুমি বাসা থাইকা বের হইস না। তখন আম্মুকে বললাম, তু্মি খালি উল্টাপাল্টা স্বপ্ন দেখো। ওই সময় আমার এক বন্ধু ফোন করে। পরে আম্মুরে না বইলা বের হইয়া আসছি। 

উম্মাদের মতো গুলি চালায় পুলিশ কন্সটেবলরা

রাব্বী বলছিলেন, তখন পুলিশের অফিসাররা ততো ক্ষীপ্ত ছিলেন। কিন্তু উঠতি তরুণ পুলিশ কন্সটেবলরা বেপরোয়াভাবে গুলি চালায়। তারা একেকজনকে দুই থেকে তিনটি করে গুলি চালিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। তাকে শেষে যে পুলিশ সদস্য দুই রাউন্ড গুলি চালিয়েছে সেও একজন তরুণ ছিল। লম্বা, হালকা পাতলা চেহারার। তারা সেদিন বৃষ্টির মতো গুলি করেছিল।

রাব্বী ভাষায়, থানার সামনে আসা সবাইকে তারা মেরে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রায় ১৫ জনের মৃত্যু হয়। বাকিরা ভাগ্যক্রমে সেদিন বেঁচে যায়। থানার সামনে সেদিন যারা অল্প বয়সী পুলিশ সদস্য ছিল তারাই বেশি বিধ্বংসী ছিল। 

তিনি বলেন, থানার ভেতর থেকে পুলিশ সদস্যরা বের হয়েই পিলারের চারপাশে থাকা মানুষের উপর গুলি চালায়। শুধু তাই নয় মৃত্যু নিশ্চিত করতে মিনিমাম তিনটা করে গুলি করে। আমার মৃত্যুও নিশ্চিত করার জন্য দুই রাউন্ড গুলি করেছে। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাই।   

লাশ ভেবে তোলা হয় ভ্যানে

মহিউদ্দিন বলেন, ভেবেছিলাম কোনোও বন্ধু এসে টেনে তুলবে। কিন্তু তখন কেউ ছিল না। ঠিক ১৫-২০ মিনিট পর ছাত্র-জনতারা ছুটে এসে তাকে লাশ ভেবে একটি ভ্যানে তোলে। প্রথমে তাকে সরানো হয় এরপর তার ওপর দেওয়া হয় আরো একজনের লাশ। এবার মহিউদ্দিন চিৎকার দিয়ে ওঠেন। পরে তারা তাকে ভ্যান থেকে নামিয়ে নেয়৷ 

মহিউদ্দিন বলছিলেন, আমারে তারা লাশ ভেবে ভ্যানে তুলছিল। কিন্তু যখন চিৎকার দিছি তখন তারা বলে উঠছিল এই পোলাডা তো জীবিত আছে। 

হাসপাতালে আরেক অধ্যায়

অপারেশনের ছয়দিন পর জ্ঞান ফেরে রাব্বীর। ততক্ষণে তার এক চোখ অন্ধ। এরপর তার পুরো শরীর প্যারালাইজড হয়ে যায়। 

Untitled-1

রাব্বী আরও বলেন, পায়ে এত পেইন ছিল যে ব্যথানাশক এক রাতে তিনটা দিলেও ব্যথা কমতো না। ১২ দিন আইসিইউতে থাকার পর সিএমএইচে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে মেরুদণ্ড ভেদ করে পিঠের একটা জায়গায় আটকে থাকা গুলিটি বের করে। সেটা ৭.৬২ গুলি ছিল। হাসপাতালে দীর্ঘ সময় শুয়ে থাকার কারণে নিতম্বে বড় একটা ঘা হয়ে যায়। সেই ঘায়ে প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়েছিল।

সেনাপ্রধানের নির্দেশেও উন্নত চিকিৎসা হয়নি

মহিউদ্দিন যখন সিএমএইচে চিকিৎসাধীন ছিলেন প্রতি শনিবার সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান সেখানে আহতদের দেখতে আসতেন। সেই ওয়ার্ডে ঢোকার মুখেই মহিউদ্দিনের বেডটি ছিল। ফলে প্রতিদিন তার কাছেই সর্বপ্রথম আসতেন সেনাপ্রধান। তিনি আসলে তাকে উদ্দেশ্য করে বলতেন তাকেসহ সবাইকে যেন উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়।  

মহিউদ্দিন বলেন, সেনাপ্রধান প্রতি শনিবার আসতেন এবং খোঁজ খবর নিতেন। সেনাপ্রধানের সঙ্গে ওই সময়গুলোতে বড় বড় কর্মকর্তারা আসতো। তখন সেনাপ্রধানকে বলছিলাম যে, আমাদের চিকিৎসাটা যাতে চায়না বা সিঙ্গাপুরের কোথাও করা হয়। আপনি একটু এ ব্যাপারে সহায়তা করেন। তখন তিনি বলতেন, বিষয়টা দেখবেন। কিন্তু পরে এর কোনো ফিডব্যাক পাইনি। 

মহিউদ্দিনের শরীরে চারটা সার্জারি রয়েছে। এছাড়া পুরো শরীরে আছে প্রায় শতাধিক সেলাই। ছয় মাস অতিবাহিত হওয়ার পর চোখের চিকিৎসা জন্য সিঙ্গাপুর নেওয়া হয় তাকে। ততদিনে তার চোখে দেখার আশা ক্ষীণ হয়ে যায়। 

তিনি বলেন, আমরা সেই হাসপাতালে আসা জামায়াত ও বিএনপির অনেক লোককে ধরেছি যে আমাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠান। কিন্তু কেউ গুরুত্ব দেয়নি। ফলে আমরা চোখগুলো হারিয়েছি। আমরা যখন সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য গেলাম তখন তারা চোখ দেখে বললো, ওই সময় আসলে চোখগুলো ভালো হতো। এখন আর সম্ভব নয়। 

কাগজপত্র সব প্রস্তুত হলেও যাওয়া হয়নি ইতালি

মহিউদ্দিন রাব্বীর স্বজনরা ইতালিতে থাকেন। সেই সুবাদে তারও যাওয়ার কথা ছিল। এজন্য তিনি এক ব্যক্তিকে ১৪ লাখ টাকা দিয়ে সব কাগজপত্র প্রস্তুত করেন। কিন্তু আর যাওয়া হয়নি তার। ঘটনার দিন সকালে তার মা তাকে বলেছিলেন, বাবারে বাইরে যাস না। তোর ইতালি যাওয়ার সব কাগজপত্র তো রেডি। তুই বাসায় থাক। কিন্তু মায়ের কথা না শুনেই তিনি বাসা থেকে বের হন। ইতালি যাওয়ার জন্য যে টাকা-পয়সা দিয়েছিলেন সেই টাকাও এখনো তুলতে পারেননি তিনি। ফলে অনিশ্চিত জীবনের পথে হাঁটছেন মহিউদ্দিন। 

মহিউদ্দিন বলছিলেন, আমার ইতালি যাওয়ার কথা থাকলেও আর হলো না। যে লোককে যাওয়ার জন্য ১৪ লাখ টাকা দিয়েছিলাম সেই টাকাও এখন তিনি আর দিচ্ছেন না। সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছি।

এমআইকে/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর