বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ঢাকা

‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া রাষ্ট্র সংস্কার অসম্ভব’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া রাষ্ট্র সংস্কার অসম্ভব’
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র পুনর্গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সংলাপ। ছবি: ঢাকা মেইল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পর রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র পুনর্গঠনের প্রশ্নে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং সংস্কারের বিষয়টি।

বুধবার (২৯ জুলাই) জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জ্বল হোসেন মানিক মিয়া হলে কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র পুনর্গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা।

বক্তারা বলছেন, গণমাধ্যমের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা না করলে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। একই সঙ্গে তারা মত দেন, প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে গণমাধ্যমকে কেবল তথ্য পরিবেশক নয়, বরং সত্য অনুসন্ধানী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন- ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মাহমুদুন্নবী। আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন, বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা, জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় মুখপাত্র ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন, মিডিয়া সাপোর্ট নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক ও সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সদস্য জিমি আমির এবং চ্যানেল ২৪-এর অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর মাকসুদ-উন-নবী।

সংলাপে বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্র সংস্কারের নতুন প্রত্যাশা তৈরি করলেও সেই প্রত্যাশার বাস্তব প্রতিফলন এখনও দৃশ্যমান নয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মূল প্রবন্ধে ড. মাহমুদুন্নবী বলেন, গণমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে জরুরি। এজন্য শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নয়, সাংবাদিকদের মানসিকতা ও পেশাগত চর্চাতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। তিনি বলেন, ব্যক্তি হিসেবে রাজনৈতিক মত বা পছন্দ থাকতে পারে, কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন বলেন, অনেকেই জুলাইয়ের ঘটনাকে বিপ্লব বললেও প্রকৃত বিপ্লব তখনই হয়, যখন রাষ্ট্রের কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আসে। মানুষের আত্মত্যাগ সত্ত্বেও সেই পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, করপোরেট মালিকানা ও নিরাপত্তা সংস্থার প্রভাবের কারণে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে। অনেক মালিক গণমাধ্যমকে জনস্বার্থের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং নিজেদের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা বলেন, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এই সময়ে সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে রয়েছে গণমাধ্যম। রাষ্ট্র, নাগরিক ও গণমাধ্যমের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি না হলে গণতান্ত্রিক সংস্কারও টেকসই হবে না।

তিনি বলেন, এখনও অনেক সাংবাদিক অনিশ্চিত চাকরি ও অপ্রতুল বেতনে কাজ করছেন। মালিকপক্ষের অযৌক্তিক চাপ থেকে মুক্ত থেকে কাজ করতে সাংবাদিকদের আইনি সুরক্ষা ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মাহমুদা হাবিবা বলেন, ২০১৮ সালে তিনি নিখোঁজ হওয়ার পরও অনেক গণমাধ্যম ভয়ের কারণে ঘটনাটি প্রকাশ করতে পারেনি। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় অনেক সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি তাদের প্রতি সম্মান জানান।

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় মুখপাত্র ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে জুলাই সনদ তৈরি হয়েছিল এবং জনগণও তা সমর্থন করেছিল। কিন্তু এই সনদ বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা বা অযথা বিলম্ব তৈরি হলে তা শুধু রাজনৈতিক সংকটই নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলবে।

তিনি অভিযোগ করেন, সংস্কারের নামে নতুন করে আলোচনা শুরু করে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। অথচ জনগণ জানতে চায়, জুলাই সনদ কবে বাস্তবায়িত হবে এবং নির্বাচন কবে হবে। সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ছাড়া অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিনের সংস্কার বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানান তিনি।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য জিমি আমির বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রদের হাতে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না, তারা কেবল আত্মরক্ষার চেষ্টা করছিল। কিন্তু অধিকাংশ গণমাধ্যম ঘটনাকে 'ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ' হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

তিনি দাবি করেন, পরে কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, সব সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদকদের হাতে থাকে না। এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে ছাত্রদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ করা হলেও তিনি রাজি হননি। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, 'পুলিশের বিপক্ষে যাওয়া যাবে না।'

জিমি আমির আরও অভিযোগ করেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নে তথ্য মন্ত্রণালয় আপত্তি জানিয়েছে। এমনকি কমিশনের জনমত জরিপের তথ্যও ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

চ্যানেল ২৪-এর অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর মাকসুদ-উন-নবী বলেন, এই মুহূর্তে গণমাধ্যমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে ওয়াচডগ বা নজরদারির ভূমিকা পালন করা। তিনি বলেন, কোনো রাজনীতিবিদ বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে বললেন, আরেকজন বললেন হচ্ছে না—সাংবাদিকের দায়িত্ব শুধু দুই পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরা নয়; জানালা খুলে দেখে আসা সত্যিই বৃষ্টি হচ্ছে কি না। সত্য যাচাই করাই সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব।

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক বিভাজন নয়, তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বয়ান গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংলাপে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নীতিনির্ধারক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও পেশাগত মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে।

এমএইচ/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর