মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ঢাকা

২৮ জুলাই: সমন্বয়কদের বাধ্য করে আন্দোলন প্রত্যাহারের ভিডিও বার্তা

ঢাকা মেইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২৬, ১১:৫১ এএম

শেয়ার করুন:

২৮ জুলাই: সমন্বয়কদের বাধ্য করে আন্দোলন প্রত্যাহারের ভিডিও বার্তা
সমন্বয়কদের জিম্মি করে জোরপূর্বক সব ধরনের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে একটি ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

২০২৪ সালের ২৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে রেখে সব ধরনের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে একটি ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়। ভিডিওতে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করতে দেখা যায়। তবে এ ঘোষণার পরপরই দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, সমন্বয়কদের জিম্মি করে জোরপূর্বক ওই বক্তব্য আদায় করা হয়েছে।

২৮ জুলাই ভোরে পাঁচ সমন্বয়কের পর আরেক সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুমকেও ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের নিরাপত্তার স্বার্থেই গোয়েন্দা হেফাজতে রাখা হয়েছে। রাতে ডিবি কার্যালয় থেকেই ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়, যেখানে নাহিদ ইসলাম সব ধরনের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

পরে আন্দোলনের সমন্বয়কেরা জানান, ডিবি হেফাজতে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার বলেন, ‘হাত আর চোখ বেঁধে নিয়ে গিয়ে ঝুলিয়ে মারধর করা হয়। আমাকে প্রায় চার ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। কখনও নিচে নামিয়ে আবার মারধর করা হয়।’

আরেক সাবেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘ডিবি অফিস থেকে চাপ দিয়ে ভিডিও বার্তা বের করা হয়েছিল। আমরা জানতাম না, সেই ভিডিও মিডিয়ায় প্রচার করা হবে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল যেকোনোভাবে আন্দোলন স্থগিত করা।’

ভিডিও বার্তা প্রচারের পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এক বিবৃতিতে তা প্রত্যাখ্যান করেন। 

বিবৃতিতে বলা হয়, অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডিবি কার্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের ছয় সমন্বয়কের কাছ থেকে জোরপূর্বক যে বিবৃতি আদায় করা হয়েছে, দেশের ছাত্রসমাজ তা প্রত্যাখ্যান করছে।

ডিবি হেফাজতে ছয় সমন্বয়ক থাকায় আন্দোলনের নেতৃত্ব নেন অন্য সমন্বয়কেরা। সমন্বয়ক আব্দুল কাদের সেদিন সব অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ করে ঢাকার আটটি স্থানে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠনের নেতারাও জানান, সমন্বয়কদের ঘোষণার পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল তাদের।

ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্ত আগেই ছিল, সমন্বয়কদের মধ্য থেকে ১০০ জনকে গ্রেফতার করা হলেও পরবর্তী স্তরের নেতৃত্ব প্রস্তুত থাকবে। আন্দোলন তখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। কেউ আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দিলেও সেটি আর থামবে না—এটা আমরা জানতাম।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খান বলেন, ‘তখন আমাদের আর পেছনে ফেরার সুযোগ ছিল না। কারণ হাসিনা যদি কোনোভাবে টিকে যেতেন, তাহলে আমাদের মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত ছিল।’

এদিন আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় ১৪৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য দেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

একই দিনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের ৩৪টি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাদের মধ্যে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন ও মা মনোয়ারা বেগমও ছিলেন। নিহতদের প্রত্যেক পরিবারের জন্য সঞ্চয়পত্র ও নগদ অর্থসহায়তা ঘোষণা করা হয়।

এরপর শেখ হাসিনা রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল এবং রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক বিএসএমইউ) আন্দোলনে আহতদের দেখতে যান।

তবে একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত ছিল। ১৬ থেকে ২৮ জুলাই—এই ১২ দিনে ঢাকাসহ ১৮ জেলায় অন্তত ২৫৩ শিক্ষার্থীকে গ্রেফতারের তথ্য পাওয়া যায়। আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষ, হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ের করা বিভিন্ন মামলায় তাদের গ্রেফতার করা হয়।

পরবর্তীতে ৫ আগস্ট ক্ষমতার পরিবর্তনের দিন ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ডিবি কার্যালয়ের বাইরে দেয়ালে লিখে দেন—‘হারুনের ভাতের হোটেল’।

এমআই

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর