আজ ২৬ জুলাই। ২০২৪ সালের এই দিনের আগের রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন প্রধান সমন্বয়ক– নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারকে তুলে নেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এরপর তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন।
এদিনই ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। এছাড়া সারা দেশে অন্তত ৫৫৫টি মামলা এবং ৬২৬৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এতে জনতার ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে মেট্রোরেল স্টেশন পরিদর্শনে গিয়ে শেখ হাসিনার কান্নার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এর রেশ কাটতে না কাটতে বিটিভি ভবনে গিয়ে আরেক দফা কাঁদেন হাসিনা। সেদিনই দেশজুড়ে স্লোগান ওঠে–‘নাটক কম কর পিও’।
হাসপাতাল থেকে তিন সমন্বয়ককে তুলে নেয় ডিবি
হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন নাহিদ, আসিফ ও বাকের। ২৬ জুলাই বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে একদল লোক হাসপাতালে প্রবেশ করে। এরপর তারা প্রথমে নাহিদ ইসলাম এবং পরবর্তী সময় আসিফ ও বাকেরকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাদের নেওয়া হয় ডিবি অফিসে।
গভীর রাতে ডিবির তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ গণমাধ্যমকে জানান, ‘নিরাপত্তা ও সহিংসতার তথ্য জানার স্বার্থে’ তাদের ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়েছে।
পরদিন তুলে নিয়ে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের হাজির করে লোক দেখানো ব্রিফ করে ডিবি। সেখানে নাহিদের পরণে লুঙ্গি ছিল। নাহিদ সেই অবস্থায় কথা বলছিল। পাশ থেকে একজন ভি চিহ্ন দেখায়। এতেই সন্দেহ বেড়ে যায়। নাহিদ সে সময় নির্যাতনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন দেশবাসীকে। যা এর আগে ১৯ জুলাই মধ্যরাতেও নাহিদকে খিলগাঁও থেকে তুলে নিয়ে নির্মম নির্যাতন শেষে পূর্বাচলে ফেলে যাওয়া হয়।
স্থবির জনজীবন, কারফিউ শিথিল
ছাত্রদের আন্দোলনে সারা দেশ মূলত অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর মাঝে চলছিল সরকারের কারফিউ। কিন্তু কারফিউও মানছিল না আন্দোলনকারীরা। বেশি বিপাকে পড়েছিল সাধারণ জনগণ। আগের দিন রাতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ঘোষণা অনুযায়ী ২৬ জুলাই ঢাকা, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হয়।
এই ৯ ঘণ্টার মধ্যে সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে বের হলেও পুরো ঢাকা ছিল থমথমে। গণপরিবহন চলাচল ছিল অত্যন্ত সীমিত। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে সেনাবাহিনী, র্যাব এবং পুলিশের সাঁজোয়া যান ও ব্যারিকেড দিয়ে তল্লাশি চালাতে দেখা গেছে।
গানে গানে কারফিউ ভাঙার মিছিল
দেশে যখন কারফিউ জারি করে গণগ্রেফতার এবং নির্বিচারে ছাত্র-জনতা হত্যা করছিল আওয়ামী লীগের সরকার তখন প্রতিবাদে মাঠে নামে বিভিন্ন প্রগতীশীল সামাজিক ও সাংষ্কৃতিক সংগঠন। তারা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদ শুরু করে। কারফিউ শিথিলের সুযোগে প্রগতিশীল ছাত্র ও সাংস্কৃতিককর্মীরা সেখানে জড়ো হয়ে ‘কারফিউ ভাঙার গান’ ও প্রতিবাদী গানের মিছিল নিয়ে পল্টন এলাকা প্রদক্ষিণ করেন। তাদের এমন গান বিক্ষুদ্ধ জনতার মনে প্রেরণা জোগায়।
প্রাণঘাতি অস্ত্র ব্যবহারে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ
পুরো জুলাই মাস জুড়েই শেখ হাসিনা সরকারের বিভিন্ন বাহিনী নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যা করছিল। তারা এ সময় প্রাণঘাতি বুলেট ব্যবহার করে। যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের চোখে পড়ে। তারা ২৬ জুলাই এর প্রতিবাদে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন। প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংগঠন দুটি জানায়, বাংলাদেশে বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্রের বেআইনি ব্যবহার হয়েছে।
এমআইকে/এআরএম




