মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

বড় কাটারা ও ছোট কাটারা: অবহেলায় হারাতে বসা চার শতকের ঐতিহ্য

মাহফুজুর রহমান
প্রকাশিত: ২৭ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৯ এএম

শেয়ার করুন:

বড় কাটারা ও ছোট কাটারা: অবহেলায় হারাতে বসা চার শতকের ঐতিহ্য
বড় কাটারা ও ছোট কাটারা

ঢাকার ইতিহাস বলতে গেলে পুরান ঢাকার নাম চলে আসে সবার আগে। আর পুরান ঢাকার ইতিহাস বলতে গেলে বড় কাটারা ও ছোট কাটারার কথা না বললেই নয়। প্রায় চার শতক আগে মুঘল শাসনামলে নির্মিত এই দুটি স্থাপনা একসময় ছিল বাংলার রাজধানী ঢাকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র। 

দেশি-বিদেশি বণিক, পর্যটক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পদচারণায় মুখর ছিল এসব কারাভানসরাই। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় দখল, অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় আজ ইতিহাসের এই অমূল্য সম্পদ হারিয়ে ফেলেছে তার অনেকটাই।

সরেজমিনে বড় কাটারা ও ছোট কাটারা ঘুরে দেখা যায়, সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষিত হলেও স্থাপনাগুলোর অধিকাংশ অংশই আজ জরাজীর্ণ। কোথাও আধুনিক স্থাপনা, কোথাও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে পরিবর্তন, আবার কোথাও ইতিহাসের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া কঠিন।

‘কাটারা’ কী?

‘কাটারা’ বা ‘কাত্রা’ শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। এর অর্থ কারাভানসরাই বা সরাইখানা। মুঘল আমলে দূর-দূরান্ত থেকে আগত ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীদের থাকার জন্য এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হতো। একই সঙ্গে এখানে পণ্য সংরক্ষণ, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং কাফেলার নিরাপদ অবস্থানের ব্যবস্থাও থাকত।

মুঘল রাজধানীর বাণিজ্যকেন্দ্র

১৭শ শতকে ঢাকা ছিল বাংলার সুবাহর রাজধানী। বুড়িগঙ্গা নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। ভারত, পারস্য, আরব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ব্যবসায়ীরা নৌপথে ঢাকায় আসতেন। তাদের আবাসন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্যই নির্মিত হয় বড় কাটারা ও পরে ছোট কাটারা।

বড় কাটারার ইতিহাস

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৬৪৩ থেকে ১৬৪৬ সালের মধ্যে শাহজাহানের পুত্র ও বাংলার সুবাদার শাহ শুজার নির্দেশে মীর আবুল কাসিম বড় কাটারা নির্মাণ করেন। প্রথমে এটি রাজপ্রাসাদ হিসেবে পরিকল্পিত হলেও পরে এটি সাধারণ ভ্রমণকারী ও ব্যবসায়ীদের জন্য সরাইখানা হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে দান করা হয়।

স্থাপনাটির কেন্দ্রজুড়ে ছিল বিশাল খোলা আঙিনা। চারপাশে সারিবদ্ধ কক্ষ, দক্ষিণ পাশে নদীমুখী বিশাল প্রবেশদ্বার, অষ্টভুজ টাওয়ার, খিলান ও মুঘল অলংকরণশৈলী এটিকে সে সময়ের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপনায় পরিণত করেছিল।

ছোট কাটারার ইতিহাস

১৬৬৩-৬৪ সালের দিকে সুবাদার শায়েস্তা খানের আমলে নির্মিত হয় ছোট কাটারা। ধারণা করা হয়, এটি প্রথমে সরকারি কর্মকর্তা ও অভিজাতদের আবাসনের জন্য ব্যবহৃত হলেও পরবর্তী সময়ে এটিও কারাভানসরাই হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নকশাগতভাবে বড় কাটারার সঙ্গে মিল থাকলেও আকারে ছোট হওয়ায় এর নাম হয় ছোট কাটারা।

সংরক্ষণের উদ্যোগ, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন

ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৫৮ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বড় কাটারাকে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করে। একই সময় সংরক্ষণের লক্ষ্যে জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ১৯৮৯ সালে অ্যান্টিকুইটিজ অ্যাক্ট, ১৯৬৮ (Antiquities Act, 1968)-এর অধীনে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বড় কাটারাকে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে আইনি সুরক্ষার আওতায় আনা হয়।

ছোট কাটারাও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদের তালিকাভুক্ত। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দুটি স্থাপনার পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

সরেজমিনে বড় কাটারা

সরেজমিনে দেখা যায়, বড় কাটারার মূল স্থাপনাটি এখনো ভগ্নদশায় রয়েছে। চার শতকের পুরোনো স্থাপত্যের দেয়াল ও কাঠামোতে সময়ের ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট।

১৯৩১ সালে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত আল জামিয়া হোসাইনিয়া আশরাফুল উলুম (বড় কাটারা মাদ্রাসা) বর্তমানে স্থাপনাটির ভেতরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মাদ্রাসার প্রয়োজনে ভবনের কিছু অংশে সংস্কার করা হয়েছে।

দেখা যায়, মূল ভবনে ওঠার প্রধান সিঁড়িটি সংস্কার করা হয়েছে। ভবনের ওপরের অংশে শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং কয়েকটি স্থানে আধুনিক টাইলস বসানো হয়েছে। তবে এসব পরিবর্তন ঐতিহাসিক স্থাপনার সংরক্ষণ বা প্রত্নতাত্ত্বিক পুনরুদ্ধারের অংশ নয়; বরং প্রতিষ্ঠানটির ব্যবহারিক প্রয়োজনেই করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

পুরো এলাকা ঘুরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চলমান সংরক্ষণ বা পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের কোনো দৃশ্যমান আলামত চোখে পড়েনি। মূল স্থাপনাটির অধিকাংশ অংশই এখনো জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

ছোট কাটারায় গিয়ে যে চিত্র মিললো

ছোট কাটারায় গিয়ে ভিন্ন এক বাস্তবতা দেখা যায়। ঐতিহাসিক স্থাপনাটির মূল ভবনের অস্তিত্ব সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালেই চলে গেছে। বাইরে থেকে মূলত ভগ্নদশার ঐতিহাসিক প্রবেশদ্বারটিই দেখা যায়।

প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা বা তথ্যফলকও চোখে পড়েনি। প্রতিবেদক স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললেও তারা ছোট কাটারার ভেতরে প্রবেশের পথ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু জানাতে পারেননি। ফলে স্থাপনাটির অভ্যন্তরীণ অংশ পরিদর্শন করা সম্ভব হয়নি।

এতে বোঝা যায়, ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি শুধু অবহেলিতই নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও অনেকটাই অচেনা হয়ে পড়েছে।

কেন হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিমালিকানা, দীর্ঘদিনের দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবৈধ নির্মাণ এবং কার্যকর সংরক্ষণ পরিকল্পনার অভাবই বড় কাটারা ও ছোট কাটারার বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী। সময়মতো যথাযথ উদ্যোগ না নেওয়ায় মূল স্থাপত্যের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যেই হারিয়ে গেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পুরান ঢাকার যেসব ঐতিহাসিক স্থাপনা এখনো টিকে আছে, সেগুলোর অনেকই অবহেলা, দখল ও অপরিকল্পিত ব্যবহারের কারণে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বড় কাটারা ও ছোট কাটারা তার অন্যতম উদাহরণ।’

তিনি বলেন, ‘ছোট কাটারা ও বড় কাটারার যে অংশটুকু এখনো অবশিষ্ট আছে, সেটিকে জরুরি ভিত্তিতে সংরক্ষণ করতে হবে। শুধু বর্তমান কাঠামো রক্ষা করাই নয়, হেরিটেজ কনজারভেশনের আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসরণ করে প্রয়োজন হলে ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হারিয়ে যাওয়া অংশ পুনর্নির্মাণ (রিক্রিয়েশন বা রিকনস্ট্রাকশন) নিয়েও ভাবতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা মানেই শুধু নতুন নতুন বহুতল ভবন নয়। এই শহরের চারশ বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যই ঢাকার প্রকৃত পরিচয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই ইতিহাসের খুব সামান্য অংশই আমরা সংরক্ষণ করতে পেরেছি। বড় কাটারা ও ছোট কাটারার মতো হাতে গোনা কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা এখনো টিকে আছে। এগুলোকে রক্ষা করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হারিয়ে যাবে।’

আদিল মুহাম্মদ বলেন, ‘এ কারণে বড় কাটারা ও ছোট কাটারার অবশিষ্ট অংশ সংরক্ষণ, প্রয়োজনীয় পুনরুদ্ধার এবং ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে সরকারের সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একসময় এসব স্থাপনার অস্তিত্ব শুধু বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।’

বড় কাটারা ও ছোট কাটারা শুধু দুটি পুরোনো ভবন নয়; এগুলো ঢাকার চার শতকের ইতিহাস, মুঘল স্থাপত্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণার পরও যদি বাস্তবে দৃশ্যমান সংরক্ষণ কার্যক্রম না থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো শুধু বইয়ের পাতাতেই বড় কাটারা ও ছোট কাটারার ইতিহাস পড়বে। ইতিহাসের এই অমূল্য সম্পদকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন অবৈধ দখলমুক্তকরণ, বৈজ্ঞানিক পুনরুদ্ধার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দর্শনার্থীদের জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা।

নচেৎ, একসময় মুঘল বাংলার সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই দুই কাটারা কেবল স্মৃতির অংশ হয়েই থেকে যাবে।

এম/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর