বর্ষা শুরু হলেই দেশের বিভিন্ন জেলার গ্রামীণ সড়কের চিত্র পাল্টে যায়। অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোথাও কার্পেটিং উঠে যায়, কোথাও সৃষ্টি হয় বড় বড় খানাখন্দ। অনেক এলাকায় কাদা ও জলাবদ্ধতার কারণে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। এতে কৃষকের উৎপাদিত ধান, সবজি, ফলসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। বাড়ে পরিবহন ব্যয়, ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, রোগী, গর্ভবতী নারী এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতেও চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। গ্রামীণ সড়কগুলো সারা বছর চলাচলের উপযোগী রাখা এবং একই সঙ্গে দরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে দুই হাজার ৮২ কোটি ১২ লাখ টাকার একটি প্রকল্প একনেকের অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত ‘পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্প’ গত ১ মার্চ ২০২৬ অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় পর্যালোচনা শেষে একনেকের অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে। জুলাই ২০২৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত সাড়ে তিন বছর মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮২ কোটি ১২ লাখ টাকা।
প্রকল্পের আওতায় দেশের আট বিভাগের ৬৪ জেলার ৪৯৫টি উপজেলায় মোট ৯১ হাজার ৫৬০ কিলোমিটার পল্লী সড়ক নিয়মিত ও সুশৃঙ্খলভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। লক্ষ্য হচ্ছে— এসব সড়ককে বছরজুড়ে চলাচলের উপযোগী রাখা, যাতে বর্ষা বা অন্য কোনো মৌসুমে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে। এলজিইডির মতে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে সড়কের আয়ুষ্কাল যেমন বাড়বে, তেমনি বড় ধরনের পুনর্নির্মাণের প্রয়োজনও কমে আসবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারি ব্যয়ও সাশ্রয় হবে।
প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এতে পরিবারপ্রধান ৪৫ হাজার ৭৮০ জন দুঃস্থ নারীকে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ কাজে নিয়োজিত করা হবে। প্রকল্পের মাধ্যমে তারা নিয়মিত আয় করার সুযোগ পাবেন। এতে সমসংখ্যক পরিবারের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে বলে আশা করছে পরিকল্পনা কমিশন। বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে তাদের সামাজিক অবস্থানও শক্তিশালী হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ এবং দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি তা দ্রুত বাজারে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে উন্নত গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে কৃষিপণ্য পরিবহনে বিলম্ব, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও বাধাগ্রস্ত হয়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান সড়ক নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
তিন বছর ধরে গতিহীন ১২ উপজেলার উন্নয়ন পরিকল্পনা
নিষ্কাশনের খালে আটকে গেল হাজার কোটি টাকার হিসাব
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির ইতিহাস চার দশকেরও বেশি পুরনো। ১৯৮৩ সালে কানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির (সিডা) সহায়তায় কেয়ার বাংলাদেশের মাধ্যমে সাতটি ইউনিয়নে পরীক্ষামূলকভাবে ‘পল্লী রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচি’ শুরু হয়। পরের বছরই এটি দেশের প্রায় ১ হাজার ৮০০ ইউনিয়নে সম্প্রসারিত হয়। পরবর্তী সময়ে হাওর ও পার্বত্য অঞ্চল ছাড়া প্রায় সব ইউনিয়নে এ কর্মসূচি বিস্তৃত হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে এলজিইডি, কেয়ার বাংলাদেশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং সরকারের যৌথ বা একক অর্থায়নে বিভিন্ন নামে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৯ থেকে ২০২৪ মেয়াদে ‘রুরাল এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড রোড মেইনটেন্যান্স প্রোগ্রাম-৩’ সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হয়।
আগের প্রকল্পগুলোর সাফল্যের কথা উল্লেখ করে পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, নিয়মিত সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের ফলে গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ সহজ হয়েছে এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দরিদ্র নারীদের জীবনমানেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই নতুন এ প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ৯১ হাজার ৫৬০ কিলোমিটার পল্লী সড়ক সারা বছর চলাচলের উপযোগী রাখা সম্ভব হবে। এতে সহজ ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষি ও অকৃষিজাত পণ্য দ্রুত বাজারজাতকরণে সুবিধা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে ৪৫ হাজার ৭৮০ জন দুঃস্থ নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে দারিদ্র্য নিরসন, কৃষি উন্নয়ন, দেশব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে 'লাস্ট মাইল' সংযোগ নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার রয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একনেকের অনুমোদন পাওয়া গেলে চলতি বছরের জুলাই থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করবে এলজিইডি।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে প্রকল্পটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইশতেহারে দারিদ্র্য নিরসন, কৃষি উন্নয়ন এবং দেশব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রতিটি গ্রামে ‘লাস্ট মাইল’ সংযোগ নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার ওপর ভিত্তি করেই প্রকল্পটির কার্যক্রম সাজানো হয়েছে।
আরও পড়ুন
মেয়াদ না বাড়ালে মুখ থুবড়ে পড়বে চার গ্যাস কূপ খনন প্রকল্প
মেঘনার ভাঙন ঠেকাতে নির্মাণ হচ্ছে শহর রক্ষা বাঁধ!
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশের গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান সড়কগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পুনর্নির্মাণে সরকারের অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। এ কারণেই নতুন প্রকল্পে পরিকল্পিত ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।২০২৬ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটি বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। সভায় কয়েকটি শর্ত ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়ে প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, একসময় দেশের গ্রামীণ এলাকায় মাটির রাস্তার আধিক্য থাকলেও এখন পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। অধিকাংশ সড়কই ইতোমধ্যে পাকা করা হয়েছে। ফলে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের প্রচলিত পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কারণ মাটির রাস্তা মেরামতের প্রক্রিয়া যেমন সহজ, পাকা সড়কের ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি কারিগরি ও ব্যয়বহুল। ছোটখাটো মেরামতের কাজ স্থানীয়ভাবে করা সম্ভব হলেও বড় ধরনের সংস্কার বা পাকা সড়কের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দরপত্র আহ্বান ও ঠিকাদারি চুক্তির মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে। রাস্তার ধরন ও অবস্থার ভিত্তিতে কোন পদ্ধতিতে মেরামত হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।
অধ্যাপক এ কে এনামুল হক আরও বলেন, এই ধরনের কর্মসূচির দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, অভাবের মৌসুমে গ্রামীণ মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। দ্বিতীয়ত, দেশের বিস্তৃত সড়ক নেটওয়ার্ককে দীর্ঘমেয়াদে ভালো অবস্থায় ধরে রাখা, যাতে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল থাকে এবং অবকাঠামোর স্থায়িত্ব নিশ্চিত হয়।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারি ক্রয় বিধিমালা-২০২৫ অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। চলতি বছর থেকে এ বিধিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগে এটি সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণ করা হতো না। এখন থেকে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সংস্কারের প্রতিটি ধাপে সরকারি আইন, বিধি ও নীতিমালা অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে।
এএইচ/জেবি




