শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

১৬ জুলাই ২০২৪: আবু সাঈদের রক্তে বদলে যায় আন্দোলনের বাঁক

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০২৬, ১১:১৯ এএম

শেয়ার করুন:

১৬ জুলাই ২০২৪: আবু সাঈদের রক্তে বদলে যায় আন্দোলনের বাঁক
ছবি: সংগৃহীত

১৬ জুলাই ২০২৪ কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও রক্তাক্ত দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এদিন রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

আবু সাঈদের সঙ্গে সেদিন যা ঘটেছিল

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন, ঠিক তখনই সবার মতো কোটাব্যবস্থার বিরোধিতা করতে রাজপথে নামেন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। 

রাজধানীসহ সারাদেশে আন্দোলন যেমন তীব্র হয়ে উঠছিল, তেমনি রংপুরেও আন্দোলনকে বেগবান করে তুলছিলেন আবু সাঈদসহ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন রংপুর-কুড়িগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের পার্ক মোড়ে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষার্থীরা জড়ো হওয়ার আগেই তৎকালীন সরকারদলীয় সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা পুলিশের পাশাপাশি সেখানে অবস্থান নেন।

ধীরে ধীরে পার্ক মোড়ে শিক্ষার্থীরা জড়ো হলে বৈষম্যবিরোধী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে এলাকা। শান্তিপূর্ণ এ আন্দোলন দমাতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ শুরু করে। এর প্রতিবাদে পুলিশের সামনে গিয়ে বুক চিতিয়ে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে পড়েন কালো টি-শার্ট পরা এক যুবক। তিনি আবু সাঈদ।

পুলিশের গুলিকে ভয় না করে সেদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে পুলিশের চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়েছিলেন শহীদ আবু সাঈদ। তাকে লক্ষ্য করে পুলিশের গুলি চালানোর দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। 

হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নিভে যায় তার প্রাণপ্রদীপ। তার মৃত্যু সারাদেশের ছাত্র-জনতাকে জাগ্রত করে তোলে। দেশজুড়ে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ ছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক।

জাতিসংঘ ও অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে আবু সাঈদ হত্যার চিত্র

আবু সাঈদের মৃত্যুকে ঘিরে প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পৃথক প্রতিবেদনে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে। প্রতিবেদন দুটিতে ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষ তথ্য, ক্ষতচিহ্ন ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে তার মৃত্যুর পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক এই অনুসন্ধানগুলোতে আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো এবং তার মৃত্যুর ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) ‘বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন’ শীর্ষক তথ্য-অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ প্রাণঘাতী ধাতব গুলিতে শহীদ হন এবং তিনি ইচ্ছাকৃত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সঠিক ময়নাতদন্ত না হলেও ক্ষতচিহ্ন ও সংশ্লিষ্ট ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে আবু সাঈদকে অন্তত দুটি প্রাণঘাতী ধাতব গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। প্রাপ্ত তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ওএইচসিএইচআরের মূল্যায়ন, তিনি পুলিশের ইচ্ছাকৃত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের ধাওয়ায় শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে আবু সাঈদ দুই হাত মেলে বুক পেতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন রাস্তার বিপরীত পাশ থেকে মাত্র ১৪–১৫ মিটার দূর থেকে অন্তত দুই পুলিশ সদস্য শটগান থেকে সরাসরি তার ওপর গুলি চালান।

আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামিদের সাজা

শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় চলতি বছরের ৯ এপ্রিল প্রকাশ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। রায়ে পুলিশের সাবেক দুই সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড, তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকি ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। এ ছাড়া সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান জীবন, তাজহাট থানার তৎকালীন পরিদর্শক রবিউল ইসলাম নয়ন এবং এসআই বিভূতি ভূষণ রায় মাধবকরকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এ ছাড়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য হাসিবুর রশীদ, সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান ও আসাদুজ্জামান মণ্ডল, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন কমিশনার মনিরুজ্জামান এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি আসামিদের তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

সেদিন শহীদ হওয়া অন্য চারজনের মধ্যে দুজন ছিলেন ঢাকার এবং বাকি দুজন চট্টগ্রামের। ঢাকায় শহীদ হন নিউমার্কেট এলাকার হকার মো. শাহজাহান এবং নীলফামারীর যুবক সবুজ আলী। চট্টগ্রামে শহীদ হন এমইএস কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমদ শান্ত এবং স্থানীয় একটি ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী মোহাম্মদ ফারুক। আহত হন অসংখ্য ছাত্র-জনতা।

সেদিন জেলা জেলায় সংঘর্ষ ও বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে সারাদেশ। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। একদিকে ছিল সমগ্র দেশের ছাত্র-জনতা, অন্যদিকে আওয়ামী সরকার, তাদের সমর্থক গোষ্ঠী ও প্রশাসন।

আবু সাঈদের মৃত্যুর দৃশ্য দেখে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দেয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং আন্দোলন দমাতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে তৎকালীন হাসিনা সরকার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সারাদেশে মোতায়েন করা হয় সব ধরনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

কিন্তু সরকারের এই দমন-পীড়ন আন্দোলনকারীদের থামাতে পারেনি। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় ছাত্র-জনতার সম্মিলিত এক দফা আন্দোলনে। সেই এক দফা ছিল তৎকালীন সরকারের পদত্যাগের দাবি। এই এক দফা বাস্তবায়নে প্রাণ দেন দেড় হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা। গুরুতর আহত হন হাজার হাজার মানুষ।

অবশেষে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতে যান। এরপর থেকে তিনি দিল্লিতে অবস্থান করছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।

এমএইচএইচ/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর