- অর্থের ১৩ শতাংশও পাচ্ছিলেন না সুবিধাভোগীরা
- ৩০০ সুবিধাভোগীর বিপরীতে ৫০০ পরামর্শক
- সুবিধাভোগীদের চেয়ে প্রশাসনিক ব্যয়েই বেশি গুরুত্ব
- ব্যয় কাঠামো নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন
- সুবিধাভোগী বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ
- পরামর্শক সেবার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা চেয়েছে কমিশন
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরে আশ্রয় নেওয়া দরিদ্র ও ভাসমান মানুষের জীবনমান উন্নয়নের কথা বলে প্রায় ৬১ কোটি ৩০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছিল সমাজসেবা অধিদফতর। কিন্তু প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করে পরিকল্পনা কমিশন দেখতে পায়, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মোট অর্থের মাত্র ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। বিপরীতে পরামর্শক নিয়োগ, ব্যবস্থাপনা ব্যয়, অফিস পরিচালনা, বিদেশ সফর, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য প্রশাসনিক খাতে ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে ৫৩ কোটির বেশি। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রকল্পটি অনুমোদন না দিয়ে সংশোধনের জন্য ফেরত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেডের শতভাগ অনুদানে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছর নয় মাস মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব ছিল।
প্রস্তাব অনুযায়ী খুলনা সিটি করপোরেশন, সাতক্ষীরা পৌরসভা, রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও সিরাজগঞ্জ পৌরসভা এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত ও প্রান্তিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহায়তা এবং জীবিকা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল।
তবে প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো পর্যালোচনায় পরিকল্পনা কমিশন দেখতে পায়, মোট বাজেটের মধ্যে মাত্র আট কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা সরাসরি সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ মোট প্রকল্প ব্যয়ের মাত্র ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ ব্যয় হওয়ার কথা ছিল প্রকৃত উপকারভোগীদের জন্য। এই অর্থ দিয়ে ২৭০ জন নারী, ৩০ জন প্রতিবন্ধীসহ মোট ৩০০ জনকে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। পাশাপাশি শিশুযত্ন, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং নারীবান্ধব ও প্রতিবন্ধীবান্ধব সামাজিক সেবার মাধ্যমে আরও প্রায় দেড় হাজার মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে প্রকল্পের বাকি ৫৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয় বিভিন্ন প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা খাতে। এর মধ্যে শুধু দেশি-বিদেশি ৪৭৩ জন পরামর্শক নিয়োগের জন্য ব্যয় ধরা হয় ২৯ কোটি ৬২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা, যা পুরো প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৪৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এছাড়া ব্যবস্থাপনা চার্জ হিসেবে রাখা হয় ১০ কোটি সাত লাখ ৬৫ হাজার টাকা, অফিস ভাড়ার জন্য তিন কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং দেশি-বিদেশি ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় চার কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
প্রকল্পে বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণের জন্য সাড়ে তিন কোটি টাকার বেশি বরাদ্দের প্রস্তাবও কমিশনের নজরে আসে। সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের নীতিমালা এবং বিদেশ সফরে কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
গত ৫ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত পিইসি সভায় প্রকল্পটির বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় কমিশনের কর্মকর্তারা পরামর্শক নিয়োগ, বিদেশ ভ্রমণ, অফিস ভাড়া, ব্যবস্থাপনা ব্যয় এবং অন্যান্য প্রশাসনিক খাতে অস্বাভাবিক বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু সমাজসেবা অধিদফতর ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারায় প্রকল্পটি অনুমোদন না দিয়ে সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানো হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এটি অনুদানের প্রকল্প হলেও মোট অর্থের ৮০ শতাংশের বেশি বাস্তবায়নকারী সংস্থা জিআইজেডের বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল। ফলে দেশের প্রকৃত সুবিধাভোগীরা খুব সামান্যই উপকৃত হতেন। পরামর্শক, বিদেশ সফর ও প্রশাসনিক ব্যয়ের অস্বাভাবিক প্রস্তাব থাকায় কমিশন প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়নি।
কমিশনের আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেক সময় বিদেশ সফরের সুযোগ দেখিয়ে এ ধরনের প্রকল্প সহজে অনুমোদনের চেষ্টা করা হয়। কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিদেশ সফরের সুযোগ দেওয়া গেলেই প্রকল্প এগিয়ে যায়, কিন্তু দরিদ্র মানুষের নামে নেওয়া প্রকল্পের বড় অংশের অর্থ প্রশাসনিক ব্যয়েই শেষ হয়ে যায়।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা আরও জানান, প্রকল্প প্রস্তাবে সুবিধাভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা অনুসরণের বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদের একটি অংশ ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হওয়ায় বাস্তবায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তবে এসব সমালোচনার দায় নিতে রাজি নয় সমাজসেবা অধিদফতর। সংস্থাটির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, এটি মূলত একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে জিআইজেডের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে এবং প্রকল্পের কাঠামোও মূলত দাতা সংস্থাই প্রস্তুত করেছে। অনুদানের প্রকল্প হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই দাতা সংস্থার নির্ধারিত শর্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।
>> আরও পড়ুন
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত, দরিদ্র, নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবিকা উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে ৬১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি খুলনা সিটি করপোরেশন, সাতক্ষীরা পৌরসভা, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এবং সিরাজগঞ্জ পৌরসভা এলাকায় বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় ২৭০ জন নারী ও ৩০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ মোট ৩০০ জনকে ক্ষুদ্র ব্যবসা, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও সমবায়ভিত্তিক আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি শিশু যত্ন, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, নারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব সামাজিক সেবা এবং লিঙ্গ-সংবেদনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে আরও এক হাজার ৫০০ জনের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে প্রকল্পটির উদ্দেশ্য যতটা মানবিক, ব্যয় কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ঠিক ততটাই। প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ৬১ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে শুধু পরামর্শকদের সম্মানী বাবদ। অর্থাৎ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৯ শতাংশই চলে যাবে পরামর্শকদের পেছনে। প্রকল্পে প্রায় পৌনে ৫০০ জন পরামর্শক কাজ করবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সরাসরি ক্ষুদ্র ব্যবসা ও জীবিকা উন্নয়ন কার্যক্রমে যুক্ত হবেন মাত্র ৩০০ জন সুবিধাভোগী। অর্থাৎ প্রকল্পে সুবিধাভোগীর সংখ্যার তুলনায় পরামর্শকের সংখ্যা আরও বেশি। একটি সীমিত পরিসরের সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে এত বিপুলসংখ্যক পরামর্শক নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র জানায়, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৩৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। অফিস ভবন ভাড়ার জন্য রাখা হয়েছে ৩ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা। বিদেশ ভ্রমণের জন্য ১ কোটি ৭২ লাখ ৪০ হাজার টাকা, বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের জন্য ১ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ, টেলিফোন, ইন্টারনেট, নিরাপত্তা সেবা, যানবাহন ভাড়া, জ্বালানি, প্রকাশনা, প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যয়, ডাক ও যোগাযোগ, অফিস সরঞ্জাম এবং অন্যান্য প্রশাসনিক খাতেও পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রকল্পে শুধু অফিস ভাড়া বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের জন্য আরও অন্তত ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ৩ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের জন্য আরও প্রায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
>> আরও পড়ুন
সব মিলিয়ে পরামর্শক, প্রশাসনিক ব্যয়, অফিস পরিচালনা, দেশি-বিদেশি ভ্রমণ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় বাদ দিলে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য সরাসরি বরাদ্দ থাকবে মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৬১ কোটি টাকার প্রকল্পে যাদের জীবনমান উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, তাদের ভাগে যাচ্ছে মোট অর্থের ১৩ শতাংশেরও কম।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন, দক্ষতা উন্নয়ন, জীবিকা সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু ব্যয় কাঠামোতে দেখা যাচ্ছে, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তুলনায় প্রশাসনিক ব্যয়ের অংশ অনেক বেশি। ফলে প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগ প্রকল্পটি পর্যালোচনা করে একাধিক পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, যৌক্তিকতা, বাস্তবায়ন এলাকা এবং প্রস্তাবিত কার্যক্রম নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় বিস্তারিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকল্পের প্রস্তাবিত মেয়াদের একটি অংশ ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হওয়ায় বাস্তবায়নকাল পুনর্বিন্যাসের বিষয়টিও বিবেচনা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া প্রকল্পের অর্থায়ন, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, জনবল অনুমোদন, যানবাহন ভাড়ার অনুমতি, বৈদেশিক মুদ্রার হালনাগাদ বিনিময় হার এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মতামতও সভায় পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সুবিধাভোগীদের ক্ষুদ্র ব্যবসা, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও জীবিকা উন্নয়ন কার্যক্রমে বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ৩২ কোটি ৬১ লাখ ৭৪ হাজার টাকার সেবা ক্রয়ের প্রতিটি প্যাকেজের পৃথক হিসাব ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা উপস্থাপনের নির্দেশনা দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। পাশাপাশি পরামর্শক সেবা, দেশি-বিদেশি ভ্রমণ, বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ, সেমিনার, জ্বালানি ব্যয় এবং টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম খাতে ব্যয়ের যৌক্তিকতাও ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে। বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণে কোন সংস্থা থেকে কতজন কর্মকর্তা অংশ নেবেন, তাদের দায়িত্ব কী হবে এবং প্রকল্পে তার বাস্তব উপযোগিতা কী, সেটিও স্পষ্ট করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন:
ক্রয় পরিকল্পনা নিয়েও একাধিক প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের মতে, বিভিন্ন প্যাকেজের একক, পরিমাণ, ক্রয়পদ্ধতি এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের বিষয়গুলো পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা এবং আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ অনুযায়ী সংশোধন ও হালনাগাদ করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কীভাবে নির্বাচন করা হবে, সে বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ পদ্ধতি উপস্থাপন করতেও বলা হয়েছে।
এদিকে প্রকল্পটি নিয়ে অনুষ্ঠেয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভাকে ঘিরে সংশ্লিষ্টদের নজর রয়েছে। সভায় ব্যয় কাঠামোতে কোনো পরিবর্তনের সুপারিশ আসে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ দরিদ্র ও বাস্তুচ্যুত মানুষের উন্নয়নের নামে নেওয়া একটি প্রকল্পে যদি প্রকৃত সুবিধাভোগীদের ভাগে মোট অর্থের মাত্র ১৩ শতাংশ যায়, আর প্রায় অর্ধেক অর্থই পরামর্শক ব্যয়ে চলে যায়, তাহলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য, অগ্রাধিকার এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে কিছু প্রশাসনিক ব্যয় থাকবেই। কিন্তু সেই ব্যয় কখনোই এমন পর্যায়ে যেতে পারে না, যেখানে প্রকল্পের মূল লক্ষ্যই আড়ালে পড়ে যায়। বিশেষ করে দরিদ্র ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য নেওয়া প্রকল্পে অর্থের বড় অংশ তাদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় হওয়াই প্রত্যাশিত। সেখানে যদি অধিকাংশ অর্থ পরামর্শক, ভ্রমণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়, তাহলে প্রকল্পের সামাজিক প্রভাব অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাতে এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। অত্যাবশ্যক না হলে বিদেশ সফরের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে একটি সীমিত পরিসরের সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের জন্য আলাদা করে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক সূত্র জানায়, প্রকল্পটির ব্যয় কাঠামো নিয়ে কমিশনের ভেতরেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে পরামর্শক নিয়োগ, প্রশাসনিক ব্যয়, বিদেশ সফর এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দের অনুপাত নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব বিষয় পর্যালোচনার জন্য আগামী ৫ জুলাই প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে প্রকল্পটির বিভিন্ন খাতের ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশিদ বলেন, সুবিধাভোগীদের নামে নেওয়া প্রকল্পের অর্থ যদি শেষ পর্যন্ত পরামর্শক, বিদেশ ভ্রমণ ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ে চলে যায়, তাহলে জনগণের কাছে এমন প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। মানুষ মনে করবে, তাদের নামে প্রকল্প নেওয়া হলেও প্রকৃত সুবিধা পাচ্ছে অন্য কেউ। আপনি কাগজে-কলমে আমাকে ১০ টাকা দেওয়ার কথা বলবেন, অথচ বাস্তবে আমি যদি তিন টাকাও না পাই, তাহলে সেই প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। জনগণ তখন বলবে, এমন অনুদান আমাদের দরকার নেই।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের প্রকল্প অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের আরও গভীরভাবে ব্যয় কাঠামো পর্যালোচনা করা উচিত। প্রকৃত সুবিধাভোগীরা কতটুকু উপকৃত হবেন, সেটিই হওয়া উচিত প্রকল্প মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড। প্রশাসনিক ব্যয় ও পরামর্শক ব্যয় যেন কখনোই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে না যায়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে প্রশাসনিক ব্যয়ের একটি সীমা থাকা উচিত। গাড়ি, যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ কিংবা ভ্রমণের মতো ব্যয় পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব না হলেও এগুলো যতটা না করলেই নয় ঠিক ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ রাখা দরকার। প্রকল্পের মূল অর্থের বড় অংশ যেন প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায়, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।
এএইচ/এএস




