রোববার, ১৭ মে, ২০২৬, ঢাকা

যাত্রীর পকেট কাটছে ‘অবৈধ ওয়েবিল’, ভাড়ার তালিকা উধাও

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ৩০ জুলাই ২০২২, ০৯:৫৪ পিএম

শেয়ার করুন:

যাত্রীর পকেট কাটছে ‘অবৈধ ওয়েবিল’, ভাড়ার তালিকা উধাও

পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে মিরপুর রুটে চলা বিহঙ্গ পরিবহন দীর্ঘদিন ধরে ‘ওয়েবিলে’ চলছে। শুরুর দিকে ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে চন্দ্রিমা উদ্যান পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হতো ১৫ টাকা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর গত নভেম্বর থেকে এই দূরত্বের ভাড়া ধার্য করা হয় ১৯ টাকা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই ‘অবৈধ ওয়েবিল’ চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে কিছুটা সামনে নিয়ে এই বাসে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা। যা নিয়ে এই রুটে চলাচল করা যাত্রীদের সঙ্গে প্রায়ই বাকবিতণ্ডার ঘটনা ঘটছে।

অথচ ভাড়া বাড়ানোর পর গত ১০ নভেম্বর মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, ঢাকায় কোনো বাস সিটিং ও ওয়েবিলে চলবে না।


বিজ্ঞাপন


ওই সময় সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহর ভাষ্য ছিল, ‘কোনো ধরনের সিটিং সার্ভিস ও ওয়েবিলের মাধ্যমে কোনো বাস চলবে না। আমরা তিন দিন সময় দেব, এরপর কোনো গেটলক ও সিটিং সার্ভিসের বাস চললে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কিন্তু এনায়েত উল্যাহর তিন দিনের সেই আলটিমেটাম ঘোষণাতেই শেষ! প্রথম দুই চার দিন শ্রমিকরা এ নিয়ে কথা বললেও পরে পেটের তাগিদে চুপ হয়ে গেছেন। মালিকরাও সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাজধানীর সব রুটে ওয়েবিলেই গাড়ি চালাতে বাধ্য করছেন।

অন্যদিকে ভাড়ার তালিকা বাসের একাধিক জায়গায় থাকা বাধ্যতামূলক করা হলেও প্রথম দিকে সব বাসেই দেখা যেত। কিন্তু ওয়েবিলের দোহাই দিয়ে শ্রমিকরা সেই তালিকা তুলে ফেলেছে। ফলে প্রকৃত ভাড়া না জানা যাত্রীদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন পরিবহন শ্রমিকরা। কিন্তু এসব দেখার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) অনেকটা চুপ। মাঝেমধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালালেও ওয়েবিলের বিষয়ে খুব বেশি পদক্ষেপ দেখা যায় না।

bus2


বিজ্ঞাপন


এদিকে বাসে তালিকা দৃশ্যমান রাখা ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ডিজিটাল ভাড়ার তালিকা টানানোর নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন একজন আইনজীবী। গত জানুয়ারিতে দেওয়া আদেশে এক মাসের মধ্যে বিআরটিএকে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ জানানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কিছুই জানায়নি সংস্থাটি।

রিটকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু তালেব ঢাকা মেইলকে বলেন, জানুয়ারিতে আদালত আদেশ দিলেও এখনও কোনো কিছু বিআরটিএ জানায়নি। অন্যদিকে ভাড়ার নামে যাত্রীদের পকেট কাটছে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন:  পদ্মা সেতুতে চলা বাসে অতিরিক্ত চাঁদা, অ্যাকশনে যাচ্ছে মালিক সমিতি

সরেজমিন বিআরটিএর অভিযানে দেখা গেছে, গাড়ির লুকিং গ্লাস ভাঙা, রুট পারমিট, অতিরিক্ত আসনের জন্য বেশি জরিমানা করা হয়। কিন্তু ভাড়ার তালিকা না রাখা, ওয়েবিল নাম দিয়ে বাড়তি ভাড়া নিয়ে খুব একটা কাজ করেন না অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। তবে কেউ বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ করলেই কেবল ব্যবস্থা নেয় বিআরটিএ।

সম্প্রতি রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনে একটি অভিযানে দিশারী, বিহঙ্গ, সাভার, খাজাবাবা পরিবহনকে বিভিন্ন অপরাধে জরিমানা করা হয়। এরমধ্যে বিহঙ্গ পরিবহনকে ভাড়ার তালিকা না রাখা ও বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অপরাধে দুই হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়।

এসময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে একজন যাত্রী অভিযোগ করেন, পল্টন মোড় থেকে শাহবাগ যাওয়ার জন্য ২০ টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে জরিমানা করেন ম্যাজিস্ট্রেট ফিরোজা পারভীন।

বাড়তি ভাড়া নেওয়ার কারণ হিসেবে বিহঙ্গ বাসটির কন্ট্রাকটর জামিল হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘প্রেসক্লাবের সামনে চেক হওয়ার পর আগারগাঁও পর্যন্ত নামলেই ২০ টাকা ভাড়া। ওয়েবিলে গাড়ি চলে। আমরা না চাইলেও মালিকরা বাধ্য করে। কিছু করার নেই।’

এই অভিযানে সাভার পরিবহনকে সাভার তালিকা না রাখার জন্যও জরিমানা করা হয়। কমপক্ষে ছয়টি জায়গায় তালিকা টানানোর নির্দেশ দেন ম্যাজিস্ট্রেট।

bus3

সাভার পরিবহনের কন্ডাক্টর রফিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ভাড়ার চার্টে কিলোমিটার ধরে ভাড়া লেখা। বাস তো ওয়েবিলে। মালিকদের সাথে ঝামেলায় গিয়ে তো পারা যাবে না। তাই তালিকা রাখা হয় না। জরিমানা দিলাম এখন থেকে রাখবো।’

ওয়েবিল আসলে কী?

রাজধানীতে চলা বেশিরভাগ বাস একটি নির্ধারিত স্টপেজ থেকে ছাড়ার পর গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছাতে বিভিন্ন পয়েন্টে মালিকদের নিয়োগ করা চেকার থাকেন। তারা ওই পয়েন্ট পর্যন্ত কতজন যাত্রী উঠলেন, কত ভাড়া দিলেন তার হিসাব রাখেন। প্রতিটি স্টপেজে কতজন যাত্রী আছে সেই হিসাবটা যাচাই করে ওই শিটে লিখে দেন চেকার। দিন শেষে এই হিসাব অনুযায়ী বাস মালিকদের প্রতিদিনের ভাড়ার টাকা বুঝিয়ে দেন শ্রমিকরা।

অবশ্য যতবার চেক হয় ততবার কোথাও দশ টাকা, কোথাও আবার ২০ টাকা পর্যন্ত চেকারের হাতে গুজে দিতে হয় কন্ডাক্টরকে। এর বিনিময়ে অবশ্য সংখ্যা কিছুটা কম লিখে দেন চেকাররা।

যদিও বিআরটিএ বলছে, ওয়েবিল বলতে কোনো কিছু নেই। তারপরও দিনের পর দিন চলছে এই অবৈধ নিয়ম।

অভিযোগ আছে, শ্রমিকরা ওয়েবিল বন্ধ চাইলেও মালিকরা এটি চালু রাখতে চান। তাই ঘোষণা দিলেও এ নিয়ে খুব বেশি এটি বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেই মালিক সমিতির।

মালিকরা বলছেন, ওয়েবিল ছাড়া যাত্রীর প্রকৃত সংখ্যা জানা সম্ভব না। অন্যদিকে শ্রমিকরা বলছেন, যাত্রীদের বেশিরভাগ বিআরটিএর নির্ধারিত ভাড়া দেন। কিন্তু যাত্রী হিসেব করে মালিকরা টাকা বুঝে নেন। যে কারণে বাড়তি ভাড়া নিতে হয়।

যদিও বাস মালিক সমিতির নেতা এনায়েত উল্যাহ খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ওয়েবিল বন্ধের জন্য আমরা নির্দেশ দিয়েছি। তারপরও যদি কেউ নেয় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিআরটিএকে বলা আছে।’

ঢাকার বিভিন্ন রুটের তথ্য অনুযায়ী, সদরঘাট থেকে মিরপুর রুটে চলা বিহঙ্গ, তানজিল, ভিক্টর, সাভার পরিবহন ওয়েবিলে চলে। আবার মোহাম্মদপুর থেকে চলা বেশিরভাগ বাস ওয়েবিলে চলে। সাভার থেকে চিটাগং রোড, নারায়ণগঞ্জ রুটের বেশিরভাগ গাড়ি ওয়েবিলে চলে।

ইচ্ছেমত ভাড়া, যাত্রীরা অসহায়

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে ধর্মঘট পালন করে পরিবহন শ্রমিকরা। পরে গত বছরের ৭ নভেম্বর ২৭ শতাংশ বাস ভাড়া বাড়ানো হয়।

দূরপাল্লার বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে আগের থেকে বাড়িয়ে এক টাকা ৮০ পয়সা আ মহানগরীতে দুই টাকা ১৫ পয়সা করা হয়। মিনিবাসের ক্ষেত্রে কিলোমিটারে নির্ধারণ করা হয় দুই টাকা পাঁচ পয়সা। বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসে আট টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ওয়েবিলে চলা বেশিরভাগ গাড়ি সর্বনিম্ন ভাড়া ১৫ টাকা করে নেয়। কিন্তু এসব মানছে না কেউ।

bus4

সাভার থেকে কুড়িল রুটের ‘রইছ পরিবহনে’ শ্যামলী থেকে নতুন বাজার ৩০ টাকা নেওয়া হয়। অথচ এই পর্যন্ত ভাড়া ২৫ টাকা। এই বাসে কুড়িল থেকে শ্যামলী নামলেও ৩০ টাকা, গাবতলী পর্যন্তও একই ভাড়া নেওয়া হয়।

কমলাপুর থেকে আসা রাইদা পরিবহনে বাসের প্রথম চেক মালিবাগের আবুল হোটেল। পরেরটা নর্দায়। প্রত্যেক চেকের মাঝখানের দূরত্বে তারা ভাড়া নেয় ১৫ টাকা। অর্থাৎ আবুল হোটেল থেকে উঠে রামপুরা নামলেও যাত্রীকে ১৫ টাকা দিতে হয়। এই কোম্পনির কোনো বাসে ভাড়ার তালিকাও নেই।

আরও পড়ুন:  গণপরিবহনে নারীদের প্রতিদিনের যুদ্ধ

অন্যদিকে মোহাম্মদপুর থেকে চিটাগাং রোডে চলা সুগন্ধা পরিবহনের বাসের নির্ধারিত ভাড়া ৪৫ টাকা। কিন্তু এই রুটের যাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় ৫০ টাকা।

আবার সাভার থেকে চিটাগাং রুটে চলা ‘নীলাচল’ যেন বাড়তি ভাড়া আদায়ে আরও এগিয়ে। সাইন্সল্যাব থেকে যাত্রী উঠলেই ভাড়া ৩৫ টাকা। অর্থাৎ কেউ যদি সাইন্সল্যাব থেকে উঠে শনির আখড়া অথবা সাইনবোর্ড নামে তারও ভাড়া ৩৫ টাকা। চিটাগাং রোড গেলেও ৩৫ টাকা। এ নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডাও হয়। কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই। নীলাচলে সর্বনিম্ন ভাড়া নেওয়া হয় ১৫ টাকা।

মজার বিষয়, একই রুটে চলা মৌমিতা ও ঠিকানা পরিবহনের বাসে সাইন্সল্যাব থেকে শনির আখড়া অথবা সাইনবোর্ড পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হয় ২০ টাকা।

সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলতে বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদারের সঙ্গে টেলিফোনে একাধিকবার চেষ্টা করলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। সংস্থাটির পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মুহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

বিইউ/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর