বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক পুশ ইনের চেষ্টা করছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। এসব চেষ্টা ঠেকাতে সীমান্তে টহল ও নজরদারি জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। অনেক এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারাও বিজিবিকে সহায়তা করছেন।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএসএফ ২ হাজার ৩৪৪ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করে। এরপর গত ৭ মে পর্যন্ত আর কোনো পুশ ইনের ঘটনা ঘটেনি। তবে ৮ মে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার মুরইছড়া সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠায় বিএসএফ। এরপর আবার শুরু হয় পুশ ইন ও পুশ ইনের চেষ্টার ঘটনা।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার সীমান্ত পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। এ ছাড়া ত্রিপুরার সঙ্গে ৮৫৬ কিলোমিটার, মেঘালয়ের সঙ্গে ৪৪৩ কিলোমিটার, মিজোরামের সঙ্গে ৩১৮ কিলোমিটার এবং আসামের সঙ্গে ২৬৩ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে।
সীমান্ত হত্যা ও পুশ ইন
পুশ ইনের পাশাপাশি সীমান্তে হত্যার অভিযোগও রয়েছে বিএসএফের বিরুদ্ধে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান। ২০২৪ সালে নিহত হন ৩০ জন এবং ২০২৩ সালে ৩১ জন।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্টদের মতে, এক মাস আগে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর পুশ ইনের তৎপরতা বেড়েছে। গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জয় পেয়ে ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ ও ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ শনাক্ত করে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘোষণা দেন। এ জন্য হোল্ডিং সেন্টার তৈরির কথাও বলা হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ওই সময় আসাম ও ত্রিপুরা সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা বেশি দেখা গেলেও পশ্চিমবঙ্গে তুলনামূলক কম ছিল। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
২৪ ঘণ্টায় ১০টি পুশ ইনের চেষ্টা ব্যর্থ
দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় বিএসএফের অন্তত ১০টি পুশ ইনের চেষ্টা প্রতিহত করার কথা বৃহস্পতিবার জানিয়েছে বিজিবি। একই সঙ্গে সম্ভাব্য পুশ ইন ঠেকাতে সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহের যাদবপুর সীমান্ত দিয়ে চার থেকে পাঁচজনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবির টহল দলের বাধার মুখে তাঁরা ফিরে যান। একই জেলার সামন্তা সীমান্তে বিএসএফ একটি প্রিজন ভ্যানে করে ৩০ থেকে ৩৫ জনকে এনে সীমান্তের গেট খুলে বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করে। বিজিবি ও স্থানীয় লোকজনের প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ তাঁদের সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্ত, জয়পুরহাটের কয়া ও বাসুদেবপুর সীমান্ত, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, সিলেট ও নেত্রকোনার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকাতেও একই ধরনের তৎপরতার তথ্য পাওয়া গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিজিবির সতর্ক অবস্থান ও গোয়েন্দা নজরদারির কারণে পুশ ইনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
পঞ্চগড়ের রওশনপুর সীমান্তে একজনকে পুশ ইন করা হলেও স্থানীয় লোকজন তাকে আটক করে বিজিবিকে খবর দেন। পরে তাঁকে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়। সিলেটের উৎমাছড়া সীমান্তে স্থানীয় বাসিন্দারা দুই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করেন। যাচাই-বাছাই শেষে তাঁদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয় এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়।
ঝুঁকিপূর্ণ ৭০টি স্থান চিহ্নিত
বিজিবি ও সীমান্ত সূত্র জানিয়েছে, পুশ ইনের উদ্দেশ্যে সীমান্তের ওপারে বিভিন্ন এলাকায় লোকজন জড়ো করছে বিএসএফ। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সীমান্তের প্রায় ৭০টি সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে।
বর্তমানে যশোরের খোশালপুর বিওপির ইছামতী নদীসংলগ্ন এলাকা, যাদবপুর-রঘুনাথপুর ও বেনাপোল সীমান্তকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া জয়পুরহাটের কয়া ও বাসুদেবপুর, সাতক্ষীরা ও নওগাঁর কয়েকটি সীমান্ত এলাকা এবং দুর্গম ও জনবসতিহীন কিছু সীমান্তপথেও পুশ ইনের আশঙ্কা রয়েছে।
মৌলভীবাজারের বাগিছড়া ও চম্পাছড়া, হবিগঞ্জের রেমা, ফেনীর মতুয়া, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, লালমনিরহাটের বুড়িমারী, খাগড়াছড়ির তাইন্দং, কুড়িগ্রামের বড়াইবাড়ী এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরসহ আরও কয়েকটি সীমান্ত এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দিল্লির বৈঠকে গুরুত্ব পাবে পুশ ইন
আগামী ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে সীমান্ত হত্যা ও পুশ ইনের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছে বিজিবি।
বিজিবি সদর দপ্তরের উপপরিচালক কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম বলেন, ‘এবারের সম্মেলনে আমরা পুশ ইন এবং সীমান্ত হত্যাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনা করব। পুশ ইন এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতেই হবে।’
ক.ম/




