পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির দ্বিতীয় দিনে রাজধানী ঢাকার সড়কগুলোতে ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে যানবাহনের চলাচল। ঈদের দিন শহর প্রায় ফাঁকা হয়ে গেলেও পরদিন জরুরি প্রয়োজন, কর্মস্থলের দায়িত্ব কিংবা ব্যক্তিগত কাজে অনেকেই ঘর থেকে বের হতে শুরু করেছেন।
ফলে সড়কে বাস, সিএনজি, রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির উপস্থিতি কিছুটা বেড়েছে। তবে সেই তুলনায় যাত্রীর সংখ্যা এখনও অনেক কম।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, পরিবহনগুলো নিয়মিত চলাচল করলেও অধিকাংশ বাসের আসন ফাঁকা থাকছে। যাত্রী সংকটের কারণে পরিবহন শ্রমিক ও মালিকরা প্রত্যাশিত আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
শনিবার (৩৯ মে) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ ও গাবতলী এলাকার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, ঈদের আগের ব্যস্ততার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির বিস্তর পার্থক্য।
সড়কে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু যাত্রী না থাকায় অনেক বাসকে নির্ধারিত স্টপেজে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। কোনো কোনো বাসে চালক ও সহকারীরা যাত্রী ওঠানোর জন্য বারবার ডাকাডাকি করলেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া মিলছিল না। বেশিরভাগ বাসেই অর্ধেকের বেশি আসন খালি ছিল।
মিরপুর-১০ গোলচত্বর এলাকায় দেখা যায়, একের পর এক বাস এসে দাঁড়াচ্ছে, আবার যাত্রী না পেয়ে কিছুক্ষণ পর ধীরগতিতে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হচ্ছে। সাধারণ দিনে যেখানে বাসে ওঠার জন্য যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে এখন উল্টো চিত্র। বাস আছে, কিন্তু যাত্রী নেই। একই অবস্থা দেখা গেছে ফার্মগেট ও শাহবাগ এলাকায়ও। সড়কে যানবাহন চললেও যাত্রীদের উপস্থিতি ছিল সীমিত।
বিজ্ঞাপন

যাত্রীরা বলছেন, ঈদের ছুটি এখনও চলমান থাকায় অধিকাংশ মানুষ রাজধানীর বাইরে অবস্থান করছেন। অনেক পরিবার ঈদের আগে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে এবং আগামী কয়েকদিন পর ঢাকায় ফিরবে। ফলে নগরীর জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনে।
মিরপুর এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদের আগে একই রুটে চলাচল করতে গেলে বাসে উঠতেই কষ্ট হতো। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে যেতে হতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। আজ বাসে উঠে দেখেছি অনেক আসন খালি। যাত্রী কম থাকায় যাতায়াত অনেক স্বস্তিদায়ক হয়েছে।
শাহবাগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নাসরিন আক্তার বলেন, ঈদের ছুটির কারণে ঢাকায় মানুষের উপস্থিতি অনেক কমে গেছে। আজ কাজে বের হয়ে দেখলাম রাস্তায় যানজট নেই বললেই চলে। বাসও সহজে পাওয়া যাচ্ছে। যাত্রী কম থাকায় দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।
ফার্মগেট এলাকায় বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন আব্দুল কাদের। তিনি বলেন, প্রতিবছরই ঈদের সময় ঢাকায় এমন চিত্র দেখা যায়। তবে এবার শহর আরও বেশি ফাঁকা মনে হচ্ছে। বাসে কোনো ভিড় নেই, রাস্তায়ও মানুষের চাপ কম। যারা ঢাকায় অবস্থান করছেন, তারাই মূলত চলাচল করছেন।
অন্যদিকে যাত্রী কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে পরিবহন শ্রমিকদের ওপর। প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল চালক ও সহকারীরা বলছেন, সড়কে গাড়ি চললেও আয় অনেক কমে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি ট্রিপ সম্পন্ন করেও স্বাভাবিক দিনের অর্ধেক ভাড়াও উঠছে না।
বাস চালকরা বলছেন, যানজটমুক্ত সড়কে গাড়ি চালাতে স্বস্তি থাকলেও যাত্রী না থাকায় সেই স্বস্তি অর্থনৈতিকভাবে কোনো সুফল বয়ে আনছে না। বরং আয় কমে যাওয়ায় তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ী রুটে চলাচলকারী বাসচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, ঈদের আগে যাত্রী সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। তখন প্রতিটি ট্রিপেই বাস ভর্তি যাত্রী থাকত। এখন উল্টো অবস্থা। অনেক সময় বাসের অর্ধেক আসনও পূরণ হয় না। জ্বালানি খরচ, দৈনিক জমা ও অন্যান্য ব্যয় ঠিকই আছে, কিন্তু সেই অনুপাতে আয় হচ্ছে না।
গাবতলী এলাকায় বাসচালক আব্দুস সাত্তার বলেন, এখন রাস্তায় কোনো বড় যানজট নেই। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই একাধিক ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু যাত্রী না থাকলে সেই ট্রিপের কোনো অর্থ থাকে না। অনেক সময় স্টপেজে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না।
মালিবাগ রুটে চলাচলকারী বাসচালক জাকির হোসেন বলেন, সকালে কিছুটা যাত্রী পাওয়া গেলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যা কমে যায়। দুপুরের পর অনেক বাস প্রায় খালি অবস্থায় চলাচল করছে। ছুটি শেষ হওয়ার আগে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হবে বলে মনে হচ্ছে না।

পরিবহন সহকারীরাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, যাত্রী কম থাকায় প্রতিদিনের আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকি করেও যাত্রী তোলা সম্ভব হচ্ছে না।
মিরপুর-ফার্মগেট রুটের বাসের সহকারী সোহেল মিয়া বলেন, সাধারণ দিনে স্টপেজে বাস থামালেই যাত্রী উঠে যায়। কিন্তু এখন যাত্রী খুঁজে বের করতে হচ্ছে। বারবার ডাকাডাকি করেও পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
মতিঝিলগামী একটি বাসের সহকারী রবিউল ইসলাম বলেন, আমাদের আয়ের একটি অংশ নির্ভর করে যাত্রীর সংখ্যার ওপর। এখন যাত্রী কম থাকায় সারাদিন কাজ করেও আগের মতো আয় হচ্ছে না। ছুটি শেষ হলে হয়তো আবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের ছুটির দ্বিতীয় দিনে রাজধানীর সড়কে যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও যাত্রী সংকট এখনও কাটেনি। নগরীর বড় একটি অংশ ঢাকার বাইরে থাকায় গণপরিবহনে সেই চাপ তৈরি হয়নি, যা সাধারণ সময়ে দেখা যায়। ফলে সড়কে যানবাহন ফিরলেও যাত্রীরা এখনও পুরোপুরি ফেরেননি।
এএইচ/এআরএম




