কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামে ঈদুল আজহা মানেই শুধু পশু কোরবানি নয়, আনন্দ ভাগাভাগিরও এক বিরল আয়োজন। গ্রামের কেউ কোরবানি দিতে পারুক বা না–পারুক, ঈদের দিনে যেন কোনো ঘর মাংসহীন না থাকে—এমন এক সামাজিক রেওয়াজ চলে আসছে প্রায় আট দশক ধরে।
স্থানীয়ভাবে বুনা নামে পরিচিত এই এলাকার রামকৃষ্ণপুর গ্রামে ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখনো টিকে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। গ্রামের বিত্তবান ও নিম্নবিত্ত সবাই মিলে গড়ে তুলেছেন এক অনন্য সামাজিক বন্ধন।
বিজ্ঞাপন
এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গ্রামের সম্মিলিত উদ্যোগে কোরবানি দিতে না পারা ১১০টি পরিবারের ঘরে পৌঁছেছে ঈদের মাংস। শুধু মাংস নয়, পৌঁছেছে উৎসবের অংশ হওয়ার অনুভূতিও।
রামকৃষ্ণপুর সমাজের নিয়ম বেশ সুশৃঙ্খল। গ্রামে যারা কোরবানি দেন, তাঁরা গরু বা খাসি—যে পশুই কোরবানি করুন না কেন, পশুর পেছনের ডান পাশের পুরো রান সমাজের জন্য জমা দেন। স্থানীয় ভাষায় এটি পরিচিত ‘মাল্লতের মাংস’ বা ‘সমাজের মাংস’ নামে।
শুধু মাংস জমা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। মাংস কাটাকাটি, প্রসেসিং ও আনুষঙ্গিক খরচের জন্য প্রতিটি কোরবানিদাতা পরিবার থেকে অতিরিক্ত ১০০ টাকা করে নেওয়া হয়।
ঈদের কয়েক দিন আগেই শুরু হয় প্রস্তুতি। সমাজের পক্ষ থেকে তৈরি করা হয় একটি তালিকা—কারা কোরবানি দিচ্ছেন, আর কারা দিচ্ছেন না। যারা কোরবানি দিতে পারেন না, তাঁদের নাম আগেভাগেই অন্তর্ভুক্ত করা হয় মাংস পাওয়ার তালিকায়।
বিজ্ঞাপন
তবে এখানেই এই আয়োজনের বিশেষত্ব। যাঁরা মাংস নেন, তাঁরাও পুরো প্রক্রিয়ার অংশ থাকেন। মাংস কাটাকাটি ও প্রসেসিংয়ের কাজে তাঁরা সরাসরি অংশ নেন। এ কাজের জন্য সমাজের পক্ষ থেকে তাঁদের পারিশ্রমিকও দেওয়া হয়। ফলে এটি দান নেওয়ার অনুভূতি নয়, বরং সবার অংশগ্রহণে এক যৌথ উৎসবে পরিণত হয়।
ঈদের দিন সকাল থেকেই রামকৃষ্ণপুর গ্রামে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। দুপুরের মধ্যেই শেষ হয় মাংস কাটার কাজ।
এবার সমাজে জমা পড়েছে রেকর্ডসংখ্যক ৪৩টি গরুর পুরো রান। সব মাংস একত্র করে পরে সেগুলো সমানভাবে ভাগ করা হয়। তালিকাভুক্ত ১১০টি পরিবারের প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছে প্রায় সাত কেজি করে মাংস। এর মধ্যে সাড়ে পাঁচ কেজির মতো ছিল হাড়ছাড়া মাংস, বাকিটা হাড় ও চর্বি।
দুপুর দেড়টার মধ্যেই শেষ হয় পুরো বণ্টন কার্যক্রম। এরপর সবাই ফিরে যান নিজ নিজ ঘরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে জ্বলে ওঠে ঈদের রান্নার চুলা।
প্রায় ৮০ বছরের পুরোনো এই রেওয়াজ এখন শুধু একটি সামাজিক নিয়ম নয়, রামকৃষ্ণপুরে এটি হয়ে উঠেছে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও গ্রামীণ ঐক্যের প্রতীক।
চারপাশে যখন ক্রমেই বাড়ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, তখন ছোট্ট এই গ্রামের মানুষ দেখিয়ে দিচ্ছেন—ত্যাগের উৎসব শুধু ব্যক্তিগত আয়োজন নয়, চাইলে সেটি সবার আনন্দে রূপ দেওয়া যায়।
বিইউ/এআর




