পশু বিক্রিতে লাভবান হচ্ছেন খামারি ও প্রান্তিক কৃষক
প্রবাসী আয় ও ঈদ খরচে চাঙা হচ্ছে গ্রামীণ বাজার
কসাই, পরিবহন ও চামড়া খাতে বাড়ছে মৌসুমি কর্মসংস্থান
কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা
কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে সৃষ্টি হয় ব্যাপক আর্থিক চাঞ্চল্য। শহর থেকে গ্রামে মানুষের যাতায়াত, কোরবানির পশু কেনাবেচা, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং মৌসুমি ব্যবসা-বাণিজ্যকে ঘিরে গ্রামবাংলার অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। পশুর হাট, পরিবহন, চামড়া, মসলা, পোশাক, খাবার ও অস্থায়ী কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসবেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে দেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মৌসুম।
বিজ্ঞাপন
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোরবানির ঈদ এখন শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, এটি দেশের সবচেয়ে বড় ‘উৎসব অর্থনীতির’ অন্যতম চালিকাশক্তি।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখন গরু, ছাগল ও ভেড়া লালন-পালন করে কুরবানির উপযোগী করে তুলেছেন খামারি ও প্রান্তিক কৃষকরা। কেউ সারা বছর একটি বা দুটি গরু পালন করেছেন, আবার কেউ গড়ে তুলেছেন ছোট খামার। ঈদ সামনে রেখে এসব পশু বিক্রির অর্থ দিয়েই অনেকে সংসারের বড় খরচ, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা করছেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় ১ কোটি ১ লাখ। এর বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি পশু। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ পশু বেশি রয়েছে। এসব পশুর বড় অংশই এসেছে গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি ও গৃহস্থ পরিবারের কাছ থেকে। ফলে কোরবানির পশু বিক্রির অর্থ সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কোরবানির ঈদের সময় সবচেয়ে বড় বিষয় হলো শহর থেকে গ্রামের দিকে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি। রাজধানীসহ বড় শহরে কর্মরত মানুষ ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পশু কেনা, আত্মীয়স্বজনকে সহায়তা, বাজার-সদাই ও নানা খাতে ব্যয় করেন। এর সঙ্গে যোগ হয় প্রবাসীদের পাঠানো অতিরিক্ত রেমিট্যান্স।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে দেশের বাস, ট্রেন ও লঞ্চে বাড়ছে যাত্রীচাপ। ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত ব্যয় থেকেও বিপুল অর্থ লেনদেন হচ্ছে। আবার বর্তমানে ফলের মৌসুম হওয়ায় অনেকেই গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সময় আত্মীয়স্বজনের জন্য মৌসুমি ফল নিয়ে যাচ্ছেন। এতে স্থানীয় ফল ব্যবসায়ীদের বিক্রিও বাড়ছে।
ঈদ উপলক্ষে নতুন পোশাক, রান্নার উপকরণ, মসলা ও গৃহস্থালি সামগ্রীর বাজারও জমে উঠেছে। বিশেষ করে গরুর মাংস রান্নার জন্য জিরা, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গসহ বিভিন্ন মসলার চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে শুধু মসলার বাজারেই হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়।
সূত্র জানায়, কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার এখন এক লাখ কোটি টাকারও বেশি। কারণ, এখানে শুধু পশুর বাজার নয়, চামড়া, পশুখাদ্য, পরিবহন, মসলা, কসাই ও পোশাক ব্যবসাসহ অসংখ্য খাত জড়িত। গ্রামের মানুষ এখন গবাদিপশুকে এক ধরনের সঞ্চয় হিসেবে দেখছেন। বছরের পর বছর লালন-পালন শেষে ঈদের সময় তা বিক্রি করে ভালো আয় করছেন।
কোরবানির ঈদে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হয় অস্থায়ী শ্রমবাজারে। পশু পরিবহন, হাট ব্যবস্থাপনা, লোডিং-আনলোডিং, কসাইয়ের কাজ ও চামড়া সংগ্রহে লাখো মানুষ অল্প সময়ে বাড়তি আয় করেন। একজন দক্ষ কসাই ঈদের দিন কয়েকটি গরু জবাই করে বড় অঙ্কের পারিশ্রমিক পান। একইভাবে হাটকেন্দ্রিক চায়ের দোকান, খাবারের স্টল, দড়ি ও পশুখাদ্যের ব্যবসাও জমে ওঠে।
চামড়া শিল্পও কোরবানির ঈদের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দেশের মোট কাঁচা চামড়ার বড় অংশ সংগ্রহ হয় এই সময়। শিল্প মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। এ শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোরবানি মূলত একটি ধর্মীয় ইবাদত হলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব এখন দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে এই সময় যে আর্থিক গতি তৈরি হয়, তা অনেক পরিবারের সারা বছরের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে সহায়তা করে।
ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুঈদ রহমান বলেন, কোরবানির ঈদের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে সক্রিয় করে তোলে। শহরভিত্তিক অর্থের বড় অংশ গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে প্রান্তিক মানুষের হাতে নগদ অর্থ আসে এবং স্থানীয় বাজারে কেনাবেচা বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতি দেশের জিডিপিতেও আরও বড় অবদান রাখতে পারে। তবে চামড়ার বাজারে সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি ও অব্যবস্থাপনা বন্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক এম কে মুজেরি বলেন, কোরবানির ঈদে শহরের নগদ অর্থের বড় অংশ গ্রামে চলে যায়। শহরের মানুষ যে পশু কিনছেন, তার অর্থ সরাসরি গ্রামের খামারি ও কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি তৈরি হচ্ছে। ছোট কৃষক ও গৃহস্থ পরিবারগুলোও এই মৌসুমে উল্লেখযোগ্য আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখন আর শুধু পশু কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পরিবহন, খাদ্য, চামড়া, মসলা, কসাই, শ্রমিকসহ বহু খাত এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র তৈরি করেছে।
এমআর/এআরএম




