মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬, ঢাকা

জমে উঠেছে সারুলিয়া হাট, ছোট–মাঝারি গরুতেই আগ্রহ বেশি

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ২৬ মে ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম

শেয়ার করুন:

জমে উঠেছে সারুলিয়া হাট, ছোট–মাঝারি গরুতেই আগ্রহ বেশি
ছবি: ঢাকা মেইল

রাজধানীর দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ও স্থায়ী পশুর হাট ডেমরা সারুলিয়ায় জমে উঠেছে কোরবানির পশুর বেচাকেনা। রাজধানীর দুই স্থায়ী হাটের একটি এই ডেমরা সারুলিয়া হাট। কোরবানির সময় ছাড়াও সারা বছর এখানে গরু-ছাগলের বেচাকেনা হয়।

পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র একদিন বাকি। এ সময়ে হাটজুড়ে চলছে পশু দেখাদেখি, দরদাম ও কেনাকাটার ব্যস্ততা। তবে এবার বড় গরুর তুলনায় মাঝারি ও ছোট আকারের গরুর প্রতিই ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে।
 
ঈদকে সামনে রেখে এবারও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার পশু এসেছে এই হাটে। সিরাজগঞ্জ, পাবনা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাদারীপুর, নাটোর, কুমিল্লা ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা গরু, মহিষ ও ছাগলে ভরে উঠেছে পুরো বাজার।


বিজ্ঞাপন


সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান সড়ক থেকে কিছুটা ভেতরে হলেও হাটজুড়ে মানুষের ভিড় চোখে পড়ার মতো। কেউ পরিবার নিয়ে পশু দেখতে এসেছেন, কেউ আবার দরদাম করে পছন্দের গরু কিনে নিচ্ছেন। অনেকেই মোবাইলে ছবি ও ভিডিও করছেন। হাটের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত শুধু পশু আর মানুষের কোলাহল।

বিশেষ করে ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে থাকা মাঝারি আকারের গরুগুলোর সামনে ক্রেতাদের ভিড় বেশি দেখা গেছে। বড় গরু দেখতে মানুষ ভিড় করলেও দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই শেষ পর্যন্ত সরে যাচ্ছেন। অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি গরুর ক্ষেত্রে দরদাম মিললেই দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

কুরবানির গরু কিনতে আসা আসলাম মিয়া বলেন,  গতকাল হাট দেখে গেছি। আজকে আবার আসছি কেনার জন্য। গত বছরের তুলনায় দাম খুব একটা বাড়েনি। তবে হাটভেদে কিছুটা পার্থক্য আছে। আমি দেড় লাখ টাকার মধ্যে গরু খুঁজতেছি। একটা গরুর দাম ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বলছে।

তিনি বলেন, বড় গরু এখন অনেকের নাগালের বাইরে। পরিবার আর বাজেট হিসেব করে মানুষ মাঝারি গরুই বেশি কিনছে। আমরাও ভালো মানের একটা মাঝারি গরু নিলেই সন্তুষ্ট।


বিজ্ঞাপন


1

কাঁচপুর থেকে পরিবার নিয়ে হাটে আসা আরেক ক্রেতা শামসুল হক বলেন, অনেক গরু দেখেছি। বিক্রেতারা দাম একটু বেশি চাইছেন। তবে দরদাম করলে কিছুটা কমে। শেষ পর্যন্ত চার মণ ওজনের একটা গরু ১ লাখ ৫৮ হাজার টাকায় কিনেছি।

তিনি বলেন, হাটে গরুর অভাব নেই। কিন্তু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আগের মতো নেই। তাই অনেকে হিসেব করে কিনছেন।

সিরাজগঞ্জ থেকে আসা গরু ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, এতদিন মানুষ শুধু দেখে গেছে, এখন আস্তে আস্তে কেনাবেচা শুরু হচ্ছে। সরকারি ছুটি শুরু হলে আরও বাড়বে। তবে খরচ অনেক বেড়ে গেছে।

তিনি বলেন, একটা গরু লালন-পালনে বছরে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। আমার এই গরুর বয়স তিন বছর। শুধু খাবারেই প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তিন লাখ টাকা দাম চাচ্ছি। তবে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা লাভ হলেই ছেড়ে দেব।

হাটের আরেক ব্যবসায়ী শাহজাহান ব্যাপারি বলেন, শনিবার রাতে ১৮টি গরু নিয়ে এসেছি। এখন পর্যন্ত তিনটা বিক্রি হয়েছে। মানুষ অনেক আসছে, দেখছে, দরদাম করছে। আশা করছি শেষ দুই দিনে বিক্রি অনেক বাড়বে।

কুষ্টিয়া থেকে আসা ব্যবসায়ী ইব্রাহিম ব্যাপারি বলেন, ঢাকার মানুষ সাধারণত শেষ সময় গরু কেনে। অনেকে জায়গার সমস্যার কারণে আগে কিনতে চান না। তাই ঈদের আগের দুই দিনই সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয়।

হাটে বড় আকৃতির গরু ও মহিষও রয়েছে। এসব পশু ঘিরে দর্শনার্থীদের আগ্রহও কম নয়। কেউ কেউ শুধু বড় গরু দেখতে এসে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিচ্ছেন। তবে বিক্রেতারা বলছেন, উচ্চ দামের কারণে এসব পশুর প্রকৃত ক্রেতা কম।

সিরাজগঞ্জ থেকে ২৫টি গরু নিয়ে আসা ব্যবসায়ী রাকিবুল ইসলাম বলেন, মাঝারি গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তিন লাখ টাকার নিচের গরু দ্রুত বিক্রি হচ্ছে। মানুষ এখন বাজেট বুঝে কিনছে।

হাটে ঘুরতে আসা অনেক ক্রেতাই বলছেন, এবার কোরবানির বাজারে বড় গরুর চেয়ে মাঝারি গরুই বেশি বাস্তবসম্মত। উচ্চ মূল্য, সংসারের ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মানুষ তুলনামূলক কম দামের গরুর দিকেই ঝুঁকছেন।

তবে বিক্রেতাদের প্রত্যাশা, ঈদের বাকি দিনগুলোতে কেনাবেচা আরও বাড়বে। বিশেষ করে শেষ দুই দিন হাটে সবচেয়ে বেশি চাপ থাকবে বলে ধারণা তাদের। এখন পর্যন্ত মানুষের উপস্থিতি বাড়লেও প্রকৃত বিক্রি পুরোপুরি জমে ওঠেনি। তারপরও ক্রেতা-বিক্রেতা সবার আশা, শেষ সময়ে ডেমরা সারুলিয়া স্থায়ী পশুর হাটে জমে উঠবে কোরবানির পশুর আসল বেচাকেনা।

হাটের ইজারাদারা জানান, এবার হাটে পশুর কোনো সংকট নেই। পর্যাপ্ত পশু উঠেছে। আমরা ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছি। জাল টাকা শনাক্তে বিশেষ বুথ রাখা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সার্বক্ষণিক টহলে রয়েছে। 

2

হাট কতৃপক্ষ আরও জানায়, বৃষ্টি ও গরমের কথা বিবেচনায় রেখে পশুর জন্য অতিরিক্ত ত্রিপল, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যাতে কাদা বা জলাবদ্ধতায় ক্রেতা-বিক্রেতারা সমস্যায় না পড়েন।

হাটে দায়িত্ব পালনরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, জাল টাকা প্রতিরোধ, চুরি-ছিনতাই ঠেকানো এবং অবৈধ দালালদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ নজরদারি চলছে। সাদা পোশাকেও সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

এদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানিয়েছেন, দেশীয় খামারিদের সুরক্ষায় সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে, যাতে অবৈধভাবে ভারতীয় গরু প্রবেশ করতে না পারে।

তিনি বলেন, দেশে এবারের কোরবানির জন্য প্রায় এক কোটি ২৩ লাখ গবাদিপশু প্রস্তুত রয়েছে। সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় এক কোটি এক লাখ। ফলে প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। বাইরে থেকে পশু আমদানির প্রয়োজন নেই।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, কোরবানির পশুর হাটে পশুর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে মেডিকেল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। অসুস্থ পশুর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা, জ্বর পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তা ও চিকিৎসকরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।

এমআর/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর