শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ঢাকা

টিটন হত্যা: তিন সপ্তাহেও তদন্তে অগ্রগতি নেই

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ১৯ মে ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএম

শেয়ার করুন:

টিটন হত্যা: তিন সপ্তাহেও তদন্তে অগ্রগতি নেই

* ডিবি বলছে, তদন্তে অগ্রগতির তথ্য নেই 
* সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে তিন খুনি 
* মৃত্যুর দেড় মাস আগে যা বলেছে তাই মামলায় লিখেছি: বাদী 

 
রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডের তিন সপ্তাহ পার হলেও তদন্তে কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। এরইমধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ভিন্নখাতে নিতে নানা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে। 


বিজ্ঞাপন


সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার দেয়ালে শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল ও তার লোকজন টিটন হত্যায় জড়িত বলে পোস্টারিং সাটানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কিছুই জানে না নিহতের পরিবার ও মামলার বাদী। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, মামলার তদন্ত চলছে, কিন্তু অগ্রগতি নিয়ে প্রকাশ করার মতো তেমন কোনো তথ্যই এখনও নেই।  

রাজধানীর নিউমার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে গত ২৮ এপ্রিল রাতে টিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার টিটনের ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন নিউমার্কেট থানায় একটি মামলা করেন। শুরু থেকে বিষয়টি নিয়ে পুলিশ থেকে বলা হয়েছে, বসিলার পশুর হাটের ইজারা নিয়ে বিরোধ ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কথা।  

টিটন ২০০১ সালে জোট সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় দুই নম্বরে ছিলেন। তিনি মৃত্যুর আগে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর জামিনে বের হন ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট। এরপর থেকে ঢাকাতেই ছিলেন টিটন। তিনি কারাগার থেকে বের হয়ে পরিবারের সঙ্গে মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন এবং তার পুরনো কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন। তিনি বাকি জীবনটা সৎ পথে চলবেন বলেও জানিয়েছিলেন। তাই জনমনে প্রশ্ন উঠেছে কারা কেন তাকে হত্যা করলো? 

এ ঘটনার পর নিহতের ভাই রিপন জানান, বসিলার পশুর হাট নিয়ে পিচ্চি হেলাল, বাদল, রনি ও শাহজাহানের সঙ্গে তার বিরোধ চলছিল। তাদের বিরোধ মিটিয়ে তাকে একটি মিটিংয়ে ডাকা হয়েছিল।


বিজ্ঞাপন


আলোচনায় যাদের নাম:
আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডে কে বা কারা জড়িত তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা চলছে। নিহতের পরিবার যদিও পিচ্চি হেলাল ও তার তিন সহযোগীকে দায়ী করে মামলা করেছে। কিন্তু পুলিশ এখনো তাদের কাউকে আটক বা গ্রেফতার করতে পারেনি।  

image
১২ মে সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, টিটন হত্যায় জড়িতদের ‘ছকের ভেতর’ আনা হয়েছে।  তদন্তের স্বার্থে এখনই আসামিদের অবস্থান প্রকাশ করতে চান না।  ছবি: সংগৃহীত

এ ঘটনায় কারা জড়িত, মোটরসাইকেলে করে এসে গুলি করে পালানো সেই তিন ব্যক্তির পরিচয় কী, তাদের নেপথ্যে কারা জড়িত, কেন টিটনকে হত্যা করা হলো— এসব তথ্য এখন পর্যন্ত বের করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা ডিবি। হত্যাকাণ্ডের প্রথম দিন থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার চালানো হয়েছে এই হত্যাকাণ্ডে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন বা ক্যাপ্টেন ইমন জড়িত। ঘটনার এক দিন পর মামলা হলে নতুন তথ্য আলোচনায় আসে। নতুন করে আসে আরেক সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের নাম। এর বাইরে আর কারও নাম এখনও পর্যন্ত আলোচনায় আসেনি। 

জিগাতলা ও রায়েরবাগ এলাকার বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই হত্যাকাণ্ডে দেশ থেকে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ ও তার লোকজন জড়িত থাকার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেশি। কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছেন, নব্বইয়ের দশকে জোসেফের ভাই টিপুকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে সন্ত্রাসী ক্যাপ্টেন ইমন ও তার শ্যালক নিহত টিটনের বিরুদ্ধে। ভাই হত্যার প্রতিশোধ নিতেই জোসেফ তার লোকজনকে দিয়ে এতদিন পর টিটনকে হত্যা করতে পারেন। যদিও বিষয়টি নিয়ে কথা বলছে না পরিবার। তারা বলছেন, জোসেফ তাদের সন্দেহের তালিকাতেই নেই।

নিহত টিটনের পরিবার জোসেফকে সন্দেহের তালিকায় না রাখলেও রায়েরবাজার, মোহাম্মদপুর ও জিগাতলার সূত্রগুলো বলছে, এক সময় রায়েরবাগ ও জিগাতলা নিয়ন্ত্রণ করতেন ইমন ও টিটন। তাদের বিরুদ্ধে টিপুকে হত্যার অভিযোগ ছিল। জোসেফের সঙ্গে তাদের বিরোধও ছিল। ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যাকাণ্ডে  বিগত ১৭ বছর জেলেই ছিলেন টিটন।   

আরও পড়ুন:

সন্ত্রাসীর হাতে সন্ত্রাসী মরছে, নেপথ্যে আধিপত্যের খেলা

শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন: যশোর থেকে যেভাবে রাজধানীর অপরাধ সাম্রাজ্যে

টিটন হত্যায় নানা সূত্র, পিচ্চি হেলালকে প্রধান আসামি করে মামলা 

অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে ইমন জেল থেকে বের হয়েই দুবাই পালিয়ে যান। অন্যদিকে টিটন দেশেই ছিলেন। কিন্তু টিটন বের হওয়ার পর থেকে তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন। কোনো ঝক্কি ঝামেলাতেও যেতেন না। জেল থেকে বের হওয়ার পর টিটনের পরিবারের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ ছিল না। তার ভাই জানিয়েছে, জেল থেকে বের হওয়ার পর টিটন মাত্র তিন বার যশোরের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেছেন। এই তথ্যই বলে তিনি ঢাকাতে এক প্রকার একলা জীবন শুরু করেছিলেন।

এদিকে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, টিটন হত্যাকাণ্ডে যদিও পিচ্চি হেলাল ও তার সহযোগী বাদলের নাম বারবার আনা হচ্ছে, কিন্তু হেলাল ও তার লোকজন এতে জড়িত নয়। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, হেলালের সঙ্গে টিটনের তেমন কোনো বিষয় নিয়ে বিরোধ নেই। যদিও হেলালের সঙ্গে জিগাতলা এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টিটনের বিরোধ ছিল বলে মামলায় নিহতের ভাই রিপন দাবি করেছেন।

ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি ছিলেন টিটন। তিনি ২০০৪ সালে ঢাকা সেনানিবাস থেকে গ্রেফতার হন। পরে বাবর হত্যাকাণ্ডে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারেই ছিলেন। ২০২৪ সালে জামিনে বের হন টিটন। 

হত্যাকারীরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে: 
রাজধানীর রায়েরবাজার এলাকার একটি সূত্র জানিয়েছে, টিটন হত্যাকাণ্ডে মূলত জোসেফের লোকজন জড়িত। ঘটনার রাতে তিনজন ঘটনাস্থলে মোটরসাইকেলে আসা ছাড়াও তাদের ফলো করার জন্য আশপাশে আরোও ১৫ জনের মতো লোকজন ছিল। 

তাদের টার্গেট ছিল, টিটন হত্যাকাণ্ডটি ঘটানোর পর লোকজন তাদের ধাওয়া বা ধরার জন্য এগিয়ে এলে সেখানে ককটেল ফুটানো হবে। কিন্তু তেমন কিছুই করতে হয়নি। সেখান থেকে তিনজন সরাসরি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে গেছেন। তবে তাদের কোনো পাসপোর্ট ছিল না। তারা টাকার বিনিময়ে সীমান্ত পার করে দেয়- এমন লোকজনের সঙ্গে কনটাক্ট করেছিল। সেই রাতেই তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছে যায়। 

এরপর গভীর রাত পর্যন্ত সীমান্ত অতিক্রম করার জন্য সেই এলাকায় অপেক্ষা করতে থাকেন। পরে সময় সুযোগ বুঝে গভীর রাতে তাদেরকে ভারতের সীমানায় ঢুকিয়ে দেয় দালালের একটি চক্র। তবে সেই সীমান্ত পারাপারে কত টাকা কনটাক্ট হয়েছিল তা জানা যায়নি।   

image
অভিযুক্ত পিচ্চি হেলাল (ফাইল ছবি)

নিহতের পরিবার যা বলছে:
টিটন হত্যার সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ বা পিচ্চি হেলাল কেউ জড়িত নয় বলে মনে করছে তার পরিবার। তার ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা কাউকে সন্দেহ করছি না। জোসেফের সম্পর্কে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। সে মারা যাওয়ার দেড় মাস আগে আমাকে যা যা বলেছে তাই আমি মামলার এজাহারে উল্লেখ করেছি। এর বাইরে কোনো তথ্য নেই। আর আমরা মামলার এজাহারের বাইরে কাউকে সন্দেহও করছি না। কারণ কোনো তথ্যই তো আমাদের কাছে নেই। তবে এই ঘটনার তদন্ত ডিবি করলেও এখন পর্যন্ত পরিবারটির সঙ্গে তারা কোনো ধরনের কথাই বলেনি জানান মামলার বাদী রিপন।  
 
মামলার এজাহারে যা বলা হয়েছে: 
এ ঘটনায় মামলার বাদী নিশ্চিত করে কারো বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ এনে আসামি করেননি। তিনি সন্দেহভাজন চারজনের নাম উল্লেখ করেছেন। বাকি আট-নয়জনের নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাত পরিচয় হিসেবে বলা হয়েছে। ঘটনার রাতে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) এসএন নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, সন্ত্রাসীদের কেউ একজন টিটনকে হত্যা করেছে।

তদন্তকারী সংস্থা যা বলছে:
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা বিয়ষটি তদন্ত করছি। তবে এখন পর্যন্ত বলার মতো কোনো তথ্য নেই। জোসেফ ও তার লোকজনের কোনো সংশ্লিষ্টতা ডিবি পেয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত চলমান। ফলে তদন্তাধীন বিষয়ে এখন কিছু বলা যাবে না। 

পিচ্চি হেলাল যা বলছেন: 
এদিকে এ ঘটনার পর থেকেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল জানিয়েছেন, তিনি ও তার লোকজন কেউই এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন। মূলত তাকে ফাঁসানোর জন্য একটি চক্র এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং নিহতের পরিবারকে ভুল বুঝিয়ে তার নামে মামলা করতে বাধ্য করেছে। এই হত্যাকাণ্ডে সন্ত্রাসী ইমন ও তার লোকজন জড়িত। 

পিচ্চি হেলালের এমন বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে নিহতের পরিবার। চলতি মাসে সংবাদ সম্মেলন করে টিটনের ভাই রিপন জানান, গত ২৮ এপ্রিল রাতে আমার ছোট ভাই টিটনকে হত্যার পর পিচ্চি হেলাল একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে দিয়ে নানা ধরনের মিথ্যাচার করছে। সে আমাদের পারিবারিক কলহের যে দাবি করেছে তা সম্পূর্ণ বানোয়াট। মূলত তদন্ত কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করতেই সে এই অপকৌশল নিয়েছে। 

তাদের ১১ ভাই-বোনের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে জানিয়ে রিপন বলেন, আমার বোন ও ভগ্নিপতি সানজিদুল হাসান ইমনের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। ইমন একজন উচ্চশিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। পিচ্চি হেলাল নিজের অপরাধ ঢাকতে এসব আবোল-তাবোল বলছে। 

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ উল্লেখ করে রিপন জানান, পিচ্চি হেলাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও নিউমার্কেট এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং আসন্ন কোরবানির পশুর হাটের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিটনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। এছাড়া জেলখানায় থাকাকালীনও টিটনের সঙ্গে তার বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। 

রিপন চ্যালেঞ্জ করে বলেন, আমি আমার ফোন ফরেনসিকে দিতে প্রস্তুত। তবে দাবি জানাচ্ছি, পিচ্চি হেলালের ব্যবহৃত সবকটি মোবাইল ফোন জব্দ করে ফরেনসিকে পাঠানো হোক। তাহলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। ভয়ঙ্কর এই খুনি ও চাঁদাবাজ কখনো নিজের অপরাধ স্বীকার করে না। 

পিচ্চি হেলাল চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুরের সাবেক কমিশনার রাজু হত্যাসহ একাধিক মামলা বিচারাধীন। 

এমআইকে/ক.ম 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর