শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬, ঢাকা

‘গাজীপুর–ঢাকা করিডোরে বিআরটি চালুর মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়বে’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৮ মে ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম

শেয়ার করুন:

BRT Corridoor
“গণপরিবহননির্ভর নগর: ঢাকা–গাজীপুর বিআরটির ভবিষ্যৎ” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। ছবি: ঢাকা মেইল

ঢাকা–গাজীপুর করিডোরে গণপরিবহনভিত্তিক বিআরটি ব্যবস্থা দ্রুত চালু করা গেলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও নগর অঞ্চলে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন নগর ও পরিবহন পরিকল্পনাবিদরা।

তাদের মতে, এই করিডোর শুধু একটি যোগাযোগ অবকাঠামো নয়; বরং সমন্বিত নগর উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ শক্তিশালীকরণ, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিকেন্দ্রীকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। বিআরটি চালু হলে যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় শ্রমশক্তির চলাচল বৃদ্ধি পাবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।


বিজ্ঞাপন


সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর প্ল্যানার্স টাওয়ারে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) কনফারেন্স হলে “গণপরিবহননির্ভর নগর: ঢাকা–গাজীপুর বিআরটির ভবিষ্যৎ” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। সংবাদ সম্মেলনে তারা জানান, দীর্ঘসূত্রতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। তবে এটি বাতিল না করে দ্রুত কার্যকর করাই এখন সময়ের দাবি।

বক্তারা বলেন, বিআরটি চালু হলে ঢাকা–গাজীপুর করিডোরে যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, যাতায়াতের সময় হ্রাস পাবে, জ্বালানি ব্যয় কমবে এবং পরিবেশ দূষণ ও কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে আসবে। একই সঙ্গে গাজীপুর, টঙ্গী, উত্তরা ও আশপাশের এলাকায় শিল্প ও আবাসন খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। গাজীপুরের মতো দ্রুত বর্ধনশীল শিল্পনগরীতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলেও তারা মত দেন।

বিআইপির সহসভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, দক্ষ পেশাজীবীদের যথাযথ অংশগ্রহণ ছাড়া বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দীর্ঘদিন অকার্যকর হয়ে থাকে। তিনি বলেন, প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত এবং নিরপেক্ষ আলোচনা প্রয়োজন।


বিজ্ঞাপন


তিনি আরও বলেন, নগর পরিকল্পনা, পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে পরিকল্পনাবিদদের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে বিআইপি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিকল্পনাবিদদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মো. মোসলেহ উদ্দীন হাসান। তিনি বলেন, বিআরটি কেবল একটি গণপরিবহন ব্যবস্থা নয়; বরং এটি নগর ও অঞ্চল পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। তার মতে, এই ব্যবস্থা চালু হলে ভূমি ব্যবহার, নগর কাঠামো, অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং সামাজিক সংযোগে কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে।

তিনি জানান, ২০১২ সালে শুরু হওয়া ঢাকা–গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প ২০১৬ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। তবে প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থ ব্যবহার করেই একটি প্রাথমিক পর্যায়ের বিআরটি সেবা চালু করা সম্ভব বলে তিনি মত দেন। এতে দ্রুত করিডোরটির কার্যকারিতা দৃশ্যমান হবে এবং জনগণ উপকৃত হবে।

তিনি আরও জানান, গাজীপুর–ঢাকা করিডোরে প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষের যাতায়াত ঘটে, যা দেশের শিল্প উৎপাদন, শ্রমবাজার ও জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এই করিডোরকে কেন্দ্র করে বিআরটি চালু করা গেলে এটি একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক করিডোরে পরিণত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বিআইপি নেতারা বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। তাই বিআরটি পরিচালনাকারী কোম্পানিকে শক্তিশালী করা, দক্ষ নগর ও পরিবহন পরিকল্পনাবিদ নিয়োগ দেওয়া এবং পরিচালনা পর্ষদে পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

বিআইপির সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, গণপরিবহনভিত্তিক উন্নয়ন ছাড়া টেকসই নগর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত যানবাহনের নির্ভরতা কমিয়ে গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের কার্যকারিতা ও বাস্তব অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়নের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন সংগঠনের সভাপতি প্রকৌশলী মো. শামসুল হক বলেন, এই করিডোরে দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার অভাবে জনগণ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। প্রকল্পের প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হলেও তা চালু না হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক।

বিআইপি সদস্য পরিকল্পনাবিদ মো. মুনতাসির মামুন বলেন, মেট্রোরেলের তুলনায় অনেক কম ব্যয়ে বিআরটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব, যা অধিকসংখ্যক মানুষকে পরিবহন সুবিধার আওতায় আনতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমানে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা চাহিদার তুলনায় অনেক দুর্বল, যার ফলে নগর পরিবহন খাত ক্রমেই সংকটের দিকে যাচ্ছে।

বক্তারা আরও বলেন, বিআরটি চালু হলে শুধু যাতায়াত ব্যবস্থা নয়, পুরো নগর অর্থনীতি ও আঞ্চলিক উন্নয়ন কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। গাজীপুর–ঢাকা করিডোর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, যা ভবিষ্যৎ উন্নয়নের একটি শক্ত ভিত্তি হবে।

এএইচ/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর