দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে মোবাইল অপারেটরগুলোর আধিপত্য, উচ্চমূল্যের ইন্টারনেট প্যাকেজ, অস্বচ্ছ বিলিং ও গ্রাহক হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির নেতারা অভিযোগ করেছেন, দেশে মোবাইল অপারেটরগুলো এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে অনেক ক্ষেত্রে তারা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের চেয়েও প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে।
রোববার (১৭ মে) রাজধানীতে বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত র্যালি ও আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে একটি র্যালি বের হয়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে গিয়ে শেষ হয়। পরে ক্যাবের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা।
বিজ্ঞাপন
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, আমি যখন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক ছিলাম, তখন গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকটি মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে অপারেটরগুলো উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করে অধিদফতরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
তিনি আরো বলেন, গ্রাহকদের কেনা ডাটা প্যাকেজ থেকে যেভাবে অর্থ কেটে নেওয়া হয়, তা নজিরবিহীন। ডিজিটাল প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করলেও একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশে যখন নাগরিকদের ওপর নজরদারির সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তখন অনলাইন জুয়া বা প্রতারণামূলক কার্যক্রম কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না, সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ।
সফিকুজ্জামান বলেন, মোবাইল সেবার ওপর জনগণ থেকে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট আদায় করা হলেও সেই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সাবেক পরিচালক খালিদ আবু নাছের বলেন, দেশের টেলিকম খাতে প্রতিযোগিতা আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। একটি বড় বেসরকারি মোবাইল অপারেটরকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার কারণে বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অপারেটরসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার ক্ষেত্রে ঝুঁকিতে পড়ছে।
বিজ্ঞাপন

তিনি আরো বলেন, সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নাগরিক অধিকার ও তথ্যপ্রবাহের জন্য হুমকি। এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে নাগরিক সংগঠন ও গ্রাহকদের আইনি উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, মোবাইল অপারেটরগুলোর বিভিন্ন প্যাকেজের নামে বাজারে এক ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। উচ্চহারে ভ্যাট আদায়ের ফলে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা ও নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় সরকারকে আরো দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানাই।
বাসদের সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, বাংলাদেশে প্রযুক্তি খাতে উন্নয়নের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষ প্রযুক্তিবান্ধব জনশক্তি তৈরি করে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গেলে দেশ আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়াচ্ছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমান বিশ্বে টেলিযোগাযোগ আর বিলাসিতা নয়, এটি এখন মানুষের ‘ডিজিটাল লাইফলাইন’ বা জীবনরেখা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সেবা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল সংযোগ এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
তিনি আরো বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় দুর্বল নেটওয়ার্ক, ধীরগতির ইন্টারনেট, উচ্চমূল্যের ডাটা প্যাকেজ, অস্বচ্ছ বিলিং, অভিযোগ নিষ্পত্তির দুর্বল ব্যবস্থা এবং দুর্যোগের সময় নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ার মতো সমস্যাগুলো গ্রাহকদের চরম ভোগান্তিতে ফেলছে।
মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত সেবা পাওয়া গ্রাহকের অধিকার। তাই স্বচ্ছ বিলিং ব্যবস্থা, সহজবোধ্য প্যাকেজ, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং গ্রাহকের ডাটা প্রাইভেসি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগ সহনশীল নেটওয়ার্ক অবকাঠামো গড়ে তোলা, ফাইবার অপটিক সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ডিজিটাল সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানাই।
সভায় আরো বক্তব্য দেন জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরামের ভাইস প্রেসিডেন্ট সামিউল ইসলাম, বাংলাদেশ মোবাইল ফোন রিচার্জ ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমনুল ইসলাম বুলু, সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাহিদা বেগম এবং কেন্দ্রীয় সদস্য মাহফুজসহ অন্যরা।
এমআর/এফএ




