বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ঢাকা

‘বিগত দিনে জনকল্যাণে নেওয়া পরিকল্পনাগুলো ব্যর্থ হয়েছিল’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪ মে ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম

শেয়ার করুন:

Planning-adviser-dhakamail
কথা বলছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। ছবি: ঢাকা মেইল

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, অতীতের সরকারগুলোর নেওয়া অধিকাংশ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ত এবং পরিকল্পনা গ্রহণের পরদিন থেকেই সেগুলো মৃত দলিলে পরিণত হতো। কারণ পরিকল্পনায় যেসব লক্ষ্য, কৌশল ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হতো, বাস্তবায়নের পর্যায়ে সেগুলোর প্রতিফলন খুব কমই দেখা যেত। প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ এবং জবাবদিহিতার মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি থাকায় পরিকল্পনাগুলো জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হতো।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাজধানীর এনইসি সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) আয়োজিত অর্থনৈতিক কৌশলপত্র প্রণয়ন সংক্রান্ত অ্যাডভাইজরি কমিটির দ্বিতীয় সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফকালে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন কাঠামো, নীতিগত সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।


বিজ্ঞাপন


মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন যে অতীতের পরিকল্পনাগুলো গ্রহণের পর থেকেই কার্যত প্রাণহীন হয়ে যেত। পরিকল্পনায় যে কৌশল, লক্ষ্য ও অঙ্গীকার নির্ধারণ করা হতো, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে তার ধারাবাহিকতা থাকত না। ফলে পরিকল্পনা একটি জীবন্ত নীতি দলিল হওয়ার পরিবর্তে প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকত এবং জনগণও এর বাস্তব সুফল পেত না।

তিনি বলেন, অতীতে প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন, বাস্তবতা কিংবা জনস্বার্থের পরিবর্তে অনেক সময় স্বজনতোষী পৃষ্ঠপোষকতা, রাজনৈতিক বিবেচনা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পেয়েছে। এর ফলে প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, সময় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব ফলাফল অর্জিত হয়নি। দেশের ইতিহাসে কিছু প্রকল্পে ব্যয়ের রেকর্ড তৈরি হলেও বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এসব প্রকল্প পর্যালোচনা করে নতুনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের সঙ্গে সরকারি পদক্ষেপের একটি সামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা আরও বলেন, অতীতের পরিকল্পনা পদ্ধতিতে কাঠামোগত অনেক গলদ ছিল, যা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের মাধ্যমে বারবার সামনে এসেছে। অনেক প্রকল্পে বাস্তবায়নের হার ছিল খুবই নিম্নমুখী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি, কোনো কোনো প্রকল্পে একাধিকবার সময় ও ব্যয় সংশোধন করতে হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে একনেকে অনুমোদনের পরও দীর্ঘ সময় প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। এসব দুর্বলতা পরিকল্পনা ব্যবস্থাকে অকার্যকর ও জনবিচ্ছিন্ন করে তুলেছিল।


বিজ্ঞাপন


তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি বাস্তবভিত্তিক, কার্যকর এবং ফলাফলমুখী পরিকল্পনা দলিল তৈরি করতে চায়, যা শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে। এই পরিকল্পনায় কোন প্রকল্প কী ভিত্তিতে নির্বাচন হবে, কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, কোন সূচকের ভিত্তিতে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে এবং জনগণের কাছে কীভাবে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে-সব বিষয় সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তিতুমীর জানান, নতুন অর্থনৈতিক কৌশলপত্রে বড় ধরনের চারটি সংস্কারমূলক অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে। প্রথমত প্রকল্প নির্বাচন ও প্রোগ্রামিং পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে, যাতে জনস্বার্থ, বাস্তব প্রয়োজন এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত সার্বক্ষণিক পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে বছরের শেষ সময়ে হঠাৎ ব্যয় বৃদ্ধির সংস্কৃতি বা জুন সিনড্রোম বন্ধ করা যায়। তৃতীয়ত তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণের জন্য সরকারি তথ্য উন্মুক্ত করা হবে। চতুর্থত পুরো পরিকল্পনা প্রক্রিয়াকে জনবান্ধব, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হবে।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, জনগণের করের টাকায় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তাই জনগণের অধিকার আছে জানতে তাদের অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে। সরকার সেই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চায় এবং তথ্য গোপনের যে সংস্কৃতি অতীতে ছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে একটি উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং নীতিনির্ধারকরা তথ্য বিশ্লেষণ করে বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নের সুযোগ পাবেন।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আরও বলেন, নতুন অর্থনৈতিক কৌশলপত্রের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে খাতভিত্তিক কৌশল, নির্দিষ্ট সূচক, সংস্কার কাঠামো, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং জনকল্যাণকে সমন্বিতভাবে সামনে রাখা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনকে শুধু অনুমোদনের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং একটি কার্যকর, সক্ষম এবং দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের পরিকল্পনা ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।

সভায় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক উপদেষ্টা, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্ব উপস্থিত ছিলেন- পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এবং সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর।

এএইচ/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর