দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে বাস্তবভিত্তিক ও ভবিষ্যৎমুখী করার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, অতীতের মতো বাস্তবতা বিবর্জিত ও সংখ্যাভিত্তিক বয়াননির্ভর পরিকল্পনা নয়, বরং বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে নতুন অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন করা হবে। সেই সঙ্গে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কৌশল ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা হবে।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) আগারগাঁওয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে গঠিত অ্যাডভাইজরি কমিটির প্রথম সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
বিজ্ঞাপন
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকার অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় তিনটি মৌলিক পরিবর্তন আনতে চায়। অতীতে প্রণীত পরিকল্পনা ও পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তবতার বিস্তর অমিল ছিল, যা এখন মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে, যা বাস্তবায়নযোগ্য এবং জনগণের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে সবার প্রয়োজন ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সমন্বয় ঘটিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণই হবে সরকারের অগ্রাধিকার।
খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় কৌশলগত পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় খাদ্যের পাশাপাশি জ্বালানি খাতেও কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। নিজস্ব গ্যাসসহ অন্যান্য জ্বালানি সম্পদের উত্তোলন বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে প্রধান লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক কৌশল তখনই কার্যকর হয়, যখন তা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু অতীতে দেশের অনেক পরিকল্পনাই ছিল জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন, বাস্তবতা বিবর্জিত এবং কেবল কিছু সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জনগণের দেওয়া দায়িত্ব এবং নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো এখন জাতীয় এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবায়নযোগ্য কর্মকৌশলে রূপান্তর করা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের পথ নির্ধারণই এখন প্রধান কাজ।
শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে শিল্প খাতে নতুন করে ভাবতে হবে। শিল্পের বহুমুখীকরণ, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য অনুযায়ী শিল্প উৎপাদন নিম্নমুখী, যা উদ্বেগজনক।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, এই দুই খাতে বৈষম্যের পাশাপাশি গুণগত মানের ঘাটতি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে রিডিং দক্ষতা ও সামগ্রিক পারফরম্যান্সের অবনতি একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। সব মিলিয়ে একটি ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি এবং বৈরী আন্তর্জাতিক পরিবেশের মধ্যে দেশকে এগিয়ে নিতে হচ্ছে।
সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সমাজের অধিকাংশ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার কার্ড চালু করা হয়েছে, যা জনগণের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হবে।
কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দেশ এখন একটি প্যারাডাইম শিফটের দিকে এগোচ্ছে, যার লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা। তবে প্রবৃদ্ধির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। অতীতে প্রবৃদ্ধির যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা অনেকাংশেই কর্মসংস্থানবিহীন ছিল এবং এর তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যুব, নারী ও বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্ব বেড়েছে। অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। কোভিড-পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাজারে একাধিক কেলেঙ্কারির কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাজার এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। একটি নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত থাকবে। নির্দিষ্ট সময়ে জ্বালানি সরবরাহের তথ্য জনগণের কাছে উন্মুক্ত থাকলে সরকারের কার্যকারিতা সহজেই মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
এএইচ/জেবি




