রোববার, ১০ মে, ২০২৬, ঢাকা

এডিপিতে বিএনপির ইশতেহারের ‘প্রতিফলন দেখছেন না’ নীতিনির্ধারকরা

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ১০ মে ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম

শেয়ার করুন:

এডিপিতে বিএনপির ইশতেহারের ‘প্রতিফলন দেখছেন না’ নীতিনির্ধারকরা
ছবি: ঢাকা মেইল।

ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) যথাযথভাবে নেই বলে মনে করছেন সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা। প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার এই উন্নয়ন বাজেটকে নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এডিপি হিসেবে দেখা হলেও পরিকল্পনা প্রণয়নের ধারায় বড় কোনো পরিবর্তন না থাকায় কিছুটা অসন্তোষ তৈরি হয়েছে নীতিনির্ধারণী মহলে।

বিশেষ করে বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির পাঁচটি মূল স্তম্ভ-অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সংস্কারের সঙ্গে খাতভিত্তিক বরাদ্দের সরাসরি কোনো সম্পর্ক বা ব্যাখ্যা প্রাথমিক খসড়ায় পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ কারণে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে পুরো এডিপিকে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের আলোকে পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


গত শনিবার রাজধানীর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সভায় প্রধান উপদেষ্টার অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকিসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং পরিকল্পনা কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার একপর্যায়ে ড. তিতুমীর বলেন, এডিপির বরাদ্দ বাড়ানো হলেও পরিকল্পনা তৈরির ধরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি এবং উপস্থাপিত নথিতে কোথাও উল্লেখ নেই যে প্রস্তাবিত প্রকল্প বা খাতভিত্তিক বরাদ্দ কীভাবে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সভা সূত্র জানায়, ড. তিতুমীরের পর্যবেক্ষণের পর উপস্থিত নীতিনির্ধারকরা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন এবং পুরো এডিপিকে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের পাঁচটি মূল স্তম্ভের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে ১৬ মে পৃথক একটি বিশেষ বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই বৈঠকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক বরাদ্দ, নতুন প্রকল্প নির্বাচন, চলমান প্রকল্পের অগ্রাধিকার এবং বাস্তবায়নযোগ্যতা নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে।


বিজ্ঞাপন


সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রথম বড় উন্নয়ন কর্মসূচি হিসেবে এই এডিপিকে শুধু আর্থিক বরাদ্দের দলিল হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় নতুন সরকার। সে কারণেই চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদনের আগেই পুরো পরিকল্পনাটি পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্তকে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

সভায় উপস্থাপিত প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এডিপির মোট আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব উৎস থেকে আসবে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।

বর্তমানে চলমান অর্থবছরে সরকার ২ লাখ কোটি টাকার সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, যার মধ্যে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা দেশীয় উৎস থেকে এবং ৭২ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক সহায়তা থেকে আসছে। সে হিসাবে আগামী অর্থবছরে দেশীয় উৎসের বরাদ্দ প্রায় ৪৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং বৈদেশিক অর্থায়ন প্রায় ৫২ দশমিক ৭৭ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবনায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে, স্বায়ত্তশাসিত সরকারি সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত ৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা যুক্ত হলে মোট এডিপির আকার দাঁড়াবে ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। খাতভিত্তিক বরাদ্দের মধ্যে পরিবহন খাত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এ খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৫০ হাজার ৯৩ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে শিক্ষা খাত, যেখানে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে ৩৫ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ৩২ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে।

প্রস্তাবিত এডিপিতে মোট ১ হাজার ১২১টি উন্নয়ন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির ১ হাজার ৩৩৩টি প্রকল্পের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর মধ্যে ৮৯২টি বিনিয়োগ প্রকল্প, ১৮টি সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প এবং ৯৮টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প রয়েছে। পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো নিজস্ব অর্থায়নে আরও ৩৬টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। চলতি অর্থবছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবায়ন না হওয়া ২৬টি প্রকল্প আগামী অর্থবছরে স্থানান্তর করা হবে।

অন্যদিকে আগামী অর্থবছরে মোট ২২৩টি প্রকল্প শেষ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৭১টি বিনিয়োগ প্রকল্প। প্রকল্প সংখ্যা কমিয়ে বাস্তবায়নযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, শুধু সংখ্যা কমানোই যথেষ্ট নয়’ গুণগত পরিবর্তনও জরুরি।

সভায় প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়া, ব্যয় বৃদ্ধি, দক্ষ প্রকল্প পরিচালকের অভাব এবং প্রশাসনিক জটিলতাকে উন্নয়ন বাস্তবায়নের বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেন নীতিনির্ধারকরা। বিশেষ করে প্রশিক্ষিত প্রকল্প পরিচালকের সংকট দূর করতে একটি দক্ষ প্রকল্প পরিচালক পুল গঠনের প্রস্তাব উঠে আসে, যেখানে আধুনিক উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কাঠামো, প্রকল্প তদারকি এবং ফলাফলভিত্তিক পরিকল্পনা বিষয়ে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটিয়ে কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি করা গেলে নতুন এডিপি শুধু ব্যয়ের তালিকা হয়ে থাকবে না, বরং দেশের উন্নয়নের বাস্তব রূপরেখায় পরিণত হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কঠোর সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি বাজেট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি।’ অতীতে প্রকল্প পরিচালনায় যে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, অনেক উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশ ভ্রমণ, আসবাবপত্র ক্রয় কিংবা ভবন নির্মাণের মতো অনুষঙ্গ যুক্ত করা হয়, যেখানে প্রায়ই অনিয়ম ও অপচয়ের ঘটনা ঘটে। এ ধরনের ভুল ও অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্ক ও জবাবদিহিমূলক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক এই মহাপরিচালক আরো বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি না করা গেলে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই দেশের উন্নয়নের স্বার্থে দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

এএইচ/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর