দেশের গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো টেকসই রাখা এবং একই সঙ্গে দারিদ্র্যপীড়িত নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে বড় একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিডি)। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে সারাদেশের প্রায় ৭০ হাজার ৪৪০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক নিয়মিত ও পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে ৭৯ হাজার ৬৮০ জন অতি দরিদ্র গ্রামীণ নারীকে মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘রুরাল রোড মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট’ শীর্ষক এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট ব্যয়ের প্রায় ৯৪ দশমিক ১৯ শতাংশ সরাসরি নারীদের মজুরি ও আয় সহায়তা হিসেবে ব্যয় হবে। বাকি অর্থ প্রশাসনিক ও অন্যান্য অবকাঠামোগত ব্যয়ে ব্যবহার করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। এটি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত ৪৯৭টি উপজেলায় বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে, যা চূড়ান্ত অনুমোদনের পর কার্যকর হবে।
বিজ্ঞাপন
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও গ্রামীণ প্রতিষ্ঠান বিভাগ আগামী রোববার (১০ মে) প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) বৈঠকে এই প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করবে। বৈঠকে প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো, বাস্তবায়ন পদ্ধতি, অংশগ্রহণকারী নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং আগের প্রকল্পগুলোর সঙ্গে সংযোগ বিশ্লেষণ করা হবে।
সূত্র জানায়, এটি নতুন কোনো উদ্যোগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের একটি ধারাবাহিক উন্নয়ন কর্মসূচির নতুন সংস্করণ। ১৯৭৪ সালে দেশে 'ফুড ফর ওয়ার্ক' কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে এটি বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তিত ও সম্প্রসারিত হয়। ১৯৮৩ সালে কেয়ার বাংলাদেশ 'রুরাল মেইনটেন্যান্স প্রোগ্রাম' চালু করে, যা প্রথমে সাতটি ইউনিয়নে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়। কানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির (সিআইডিএ) সহায়তায় ১৯৮৪ সালে এটি ১ হাজার ৮০০ ইউনিয়নে সম্প্রসারিত হয়। পরে ধাপে ধাপে এটি ৪ হাজারেরও বেশি ইউনিয়নে বিস্তৃত হয়।
১৯৯৫ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত এলজিইডি ও কেয়ার বাংলাদেশ যৌথভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। ২০০৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অর্থায়নে একই প্রকল্প চালু থাকে। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এটি 'রুরাল এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড রোড মেইনটেন্যান্স প্রোগ্রাম' নামে পুনর্গঠিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রের্মপ-২ এবং ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রের্মপ-৩ বাস্তবায়িত হয়। শেষ পর্যায়ে এই প্রকল্প সম্পূর্ণভাবে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত হয়। বর্তমান প্রস্তাবিত প্রকল্পটি সেই ধারাবাহিকতারই একটি নতুন সংস্করণ, যেখানে কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণকে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশই গ্রামীণনির্ভর। কৃষি উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এবং স্থানীয় অর্থনীতির গতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে গ্রামীণ সড়কের ওপর। কিন্তু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক সড়ক বর্ষা মৌসুমে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু সড়ক মেরামতই নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
এক যুগেও আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি, বিদ্যুৎচালিত রেলের স্বপ্ন অধরা
বিদ্যুৎ খাতে ১০ হাজার কোটির প্রকল্পটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে!
প্রস্তাব অনুযায়ী, নিয়োগপ্রাপ্ত ৭৯ হাজার ৬৮০ জন নারীকে মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন ইউনিয়নে কাজ দেওয়া হবে। তারা মূলত সড়ক পরিষ্কার, ছোটখাটো মেরামত, ঝোপঝাড় পরিষ্কার এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণে যুক্ত থাকবেন।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অংশ মজুরি খাতে ব্যয় হবে, যা একদিকে দরিদ্র নারীদের আয় নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে গ্রামীণ অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণেও ভূমিকা রাখবে। তবে প্রকল্পটি নিয়ে কিছু নীতিগত প্রশ্নও উঠেছে। কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পূর্ববর্তী প্রকল্প ‘রের্মপ-৩’ এর সঙ্গে নতুন প্রকল্পের সংযোগ এবং এর যৌক্তিকতা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এছাড়া অংশগ্রহণকারীদের নির্বাচন প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং কাজের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব বা স্থানীয় পর্যায়ের সুপারিশের কারণে উপকারভোগী নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ ওঠে।
নাম না বলার শর্তে একজন পরিকল্পনা কমিশন কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রকল্পের উদ্দেশ্য ভালো হলেও বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনা দুর্বল হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। বিশেষ করে বিশালসংখ্যক নারী শ্রমিককে একসঙ্গে ব্যবস্থাপনা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এলজিইডির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করে জানান, গ্রামীণ সড়ক শুধু নির্মাণ করলেই হয় না, বরং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করলে কয়েক বছরের মধ্যেই তা নষ্ট হয়ে যায়। তাই এই প্রকল্পকে অবকাঠামো সংরক্ষণের একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে গ্রামীণ সড়ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভালো সড়ক থাকলে কৃষকরা সহজে শহরে পণ্য পাঠাতে পারে, যা তাদের আয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
আরও পড়ুন
লাখো যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ২৭৫ কোটি টাকার প্রকল্প
ভর্তুকি ও ঋণ পরিশোধে বরাদ্দ বাজেটের ২৮ শতাংশ!
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি একদিকে দারিদ্র্য কমাবে, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হলে একটি কার্যকর প্রস্থান কৌশল (এক্সিট স্ট্র্যাটেজি) থাকা জরুরি। অনেক সময় প্রকল্প শেষ হলে উপকারভোগীরা আবার বেকার হয়ে পড়েন, যা সামাজিক ঝুঁকি তৈরি করে।
বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত ঢাকা মেইলকে বলেন, বর্তমান সরকার নারীদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি অবশ্যই ইতিবাচক। এ ধরনের কর্মসূচি নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করে, যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে অতীতেও এ ধরনের প্রকল্পে অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি দলের লোকজনের সম্পৃক্ততায় স্বজনপ্রীতি এবং অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে বলে দেখা গেছে। এবার যেন সেই ধরনের অনিয়ম আর না ঘটে। প্রকল্পটি যেন সত্যিকারের উপকারভোগী নারীদের কাছেই পৌঁছায় এবং কোনো ধরনের দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতির সুযোগ না থাকে, সে বিষয়ে সরকারকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।
সীমা দত্ত আরও বলেন, নারীদের জন্য বরাদ্দ অর্থ যেন নারীদের উন্নয়নেই পুরোপুরি ব্যয় হয়, সেটিই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। অতীতে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল, সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও লক্ষ্য রাখতে হবে।
এএইচ/জেবি




