ঢাকা মহানগরের ফুটপাত হকারমুক্ত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে শুরু হওয়া হকার পুনর্বাসন কার্যক্রম ধীরগতিতে এগোচ্ছে। প্রস্তাবিত নীতিমালার আওতায় গুলিস্তান ও মিরপুর এলাকার হকারদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়ার কাজ চললেও তালিকার বড় অংশ এখনো আইডির বাইরে রয়ে গেছে। পাশাপাশি তালিকা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ, অনেক হকারের অনাগ্রহ এবং পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন-সব মিলিয়ে পুনর্বাসন উদ্যোগটি শুরুতেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
হকারদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে এক সপ্তাহ ধরে ডিজিটাল পরিচয়পত্র দিচ্ছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। অথচ এখনো গুলিস্তান ও মিরপুরেই আটকে আছে সংস্থা দুটি।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, পুলিশের করা গুলিস্তান ও মিরপুরের ১৩৯৫ জন হকারের তালিকা ধরে নিবন্ধনের মাধ্যমে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৩৯১ জনকে ছবিসহ আইডি কার্ড হস্তান্তর করা হয়েছে। অর্থাৎ, তালিকার ৩০ শতাংশেরও কম হকার পরিচয়পত্র পেয়েছেন। আর তালিকার ৭০ শতাংশের বেশি হকার এখনো আইডি কার্ড পাননি।
হকার ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে তালিকা হয়েছে তাতেও অনেক হকার বাদ পড়েছেন। এখন বাদ পড়া হকাররা অন্তর্ভুক্ত হলে সে তালিকা আরও অনেক দীর্ঘ হবে। সেক্ষেত্রে নিবন্ধন ও আইডি কার্ড হস্তান্তর এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন। সেই সঙ্গে পুরো ঢাকা শহরের কয়েক লাখ হকারকে পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় আনাও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।
তাছাড়া যারা কার্ড পেয়েছেন তাদের অনেকেই আগের জায়গাতেই তথা ফুটপাত দখলে নিজেদের ব্যবসা চালাচ্ছেন। তালিকার বাইরে থাকা অনেকেই নিবন্ধনের আওতায় আসতে অনীহার কথা জানিয়েছেন। ফলে বিকল্প স্থানে হকার পুনর্বাসনে পথচারীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও সড়কের যানজট নিরসন সহসায় সমাধান হবে কিনা সে আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
তবে সিটি করপোরেশন বলছে, তারা ফুটপাতের ভোগান্তি থেকে পথচারীদের রেহাই দিতে হকার পুনর্বাসনে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন। শুরুতে যেহেতু গুলিস্তানসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকার কাজ করা হচ্ছে সে কারণে ‘ভালোভাবে’ যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে কিছুটা সময় লাগছে। তবে পরবর্তিতে অন্য এলাকাগুলোর কার্যক্রম দ্রুত গতিতে এগোবে।
বিজ্ঞাপন
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি মো. সিরাজুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘যতদ্রুত সম্ভব হকার পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্পন্ন হলে ফুটপাতে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে নগরবাসীর স্বস্তি ফিরবে।’
এদিকে, প্রকৃত হকারদের অগোচরে রেখে ‘লুকোচুরির’ পুনর্বাসন কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগ তুলেছেন হকার নেতারা। তাদের অভিযোগ, হকার পুনর্বাসনের নামে নতুন বন্দোবস্ত করছে সরকার। তালিকায় কার্যত সরকারপন্থী লোকজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। ফলে নতুন উদ্যোগ কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াৎ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘হকার সমস্যা একদিনে সৃষ্টি হয়নি, তাই এর সমাধানও একদিনে সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, ‘একটি সমন্বিত, মানবিক ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। অন্যথায় উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের এই চক্র চলতেই থাকবে, এবং এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণি-হকাররা।’
হকার নেতা মুর্শিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরাও পুনর্বাসন চাই। তবে সেটা সঠিকভাবে করতে হবে। এবং সবপক্ষকে নিয়ে করতে হবে। তবে এই কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাবে থাকলে পুরো বিষয়টি ভেস্তে যাওয়ার সম্ভবই বেশি।’
জীবিকা নির্বাহে কয়েক যুগ ধরে গুলিস্তান, নিউমার্কেট ও ফার্মগেটসহ রাজধানীতে ব্যবসা করে আসছেন হকাররা। নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত- সস্তা কেনাকাটায় কমবেশি সবারই আস্থা এই ফুটপাতের হকাররা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হকারদের দখল উৎসব পথচারীদের ভোগান্তির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন সময় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কোনো কাজ হয়নি। মূলত পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণের ব্যর্থতায় এমন পরিস্থিতি দাঁড় করিয়েছে বলে আসছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
সম্প্রতি টানা কয়েকদিনের সাঁড়াশি অভিযানে রাজধানীর রাস্তা ও ফুটপাত থেকে হকারদের সরিয়ে দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। ডিএমপির ট্রাফিক জোনগুলোর পৃথক অভিযানে শহরের ফুটপাতের পরিস্থিতি পুরো পাল্টে যায়, তাতে স্বস্তিও ফিরে জনজীবনে। এতে নগরবাসীদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়ালেও বেশিদিন তা টেকেনি। অভিযান শিথিল হতেই গুলিস্তানসহ শহরের সব এলাকায় আবারো নেমে পড়েন হকাররা। ফলে এখন পুনর্বাসনেই জোর দিচ্ছে সিটি করপোরেশন।
আরও পড়ুন: পুলিশি কড়াকড়ি ‘শিথিলের’ অপেক্ষায় হকাররা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া শহরের হকার সমস্যা সমাধান করা কোনোভাবে সম্ভব নয়। পুনর্বাসনের আগে উচ্ছেদ হলে আবারো কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসবেন তারা। তাই হকারদের সঠিকভাবে তালিকা করে তাদের পুনর্বাসন করা প্রথম জরুরি। এরপর ফুটপাত ও সড়ক নজরদারিতে রাখতে হবে, যেন নতুন করে কেউ না আসে।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রত্যেকটা ফুটপাতে হকার নিয়ন্ত্রণ করে গড়ে উঠা সিন্ডিকেট। পুলিশ প্রশাসন থেকে সিটি করপোরেশন- সব জায়গা এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম। এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। অন্যথায় যতই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হোক, সিন্ডিকেটের হাত ধরে তারা আবারও ফিরে আসবে।’
কী প্রক্রিয়ায় পুনর্বাসন হচ্ছে?
হকার উচ্ছেদে পুলিশের অভিযানের পরপরই প্রস্তাবিত আইনের অধীনে পুনর্বাসন কার্যক্রমের তোড়জোড় শুরু করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা নিয়েই এবার হকারদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন তারা। এক্ষেত্রে হকারদের প্রাইমারি তালিকা প্রণয়ন করছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। তারা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে যাচাই-বাছাই করে তালিকা তৈরি করে সিটি করপোরেশনে পাঠাচ্ছে। সেই তালিকা ধরে চূড়ান্ত যাচাইয়ের পর নিবন্ধনের আওতায় হকারদের আনা হচ্ছে। নিবন্ধন কার্যক্রম শেষে তাদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র দিচ্ছে। এরপর তাদের নির্দিষ্ট জায়গা ও সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্র জানায়, গত ৩০ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) থেকে ডিজিটাল পরিচয়পত্র হস্তান্তর শুরু হলেও মঙ্গলবার (৫ মে) পর্যন্ত মাত্র ১৮৯ জন হকারকে পরিচয়পত্র হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছে। আরও ২২১টি পরিচয়পত্র প্রস্তুত হলেও তা নিতে আসেননি হকাররা। তবে সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত ৫৬৬ হকারের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সূত্র জানায়, ২০২ জন হকারের মাঝে ডিজিটাল পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০২ জনকে মিরপুর-১০ এলাকা থেকে মিরপুর-১৩ ওয়াসা রোডে এবং বাকি ১০০ জনকে গাবতলী কাঁচা বাজার সংলগ্ন ফাঁকা স্থানে স্থানান্তর করা হয়। তবে তালিকাভুক্ত ৮২৯ জন হকারের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চালাচ্ছে সংস্থাটি।

দুই সিটি করপোরেশনের প্রাপ্ত তথ্যমতে, ডিএমপির ট্রাফিক পুলিশের মাধ্যমে নিবন্ধনের জন্য এখন পর্যন্ত দুটি এলাকা তথা গুলিস্তান ও মিরপুরের কিছু অংশের হকাররা সিটি করপোশেনের তালিকাভুক্তি হয়েছেন। যার মোট ১৩৯৫ জন। তবে কিছু কিছু এলাকায় তালিকার কাজ চললেও অনেক এলাকায় এখনও তালিকার কাজ শুরু হয়নি।
তোড়জোরেও কেন ধীরগতি?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গুলিস্তান অংশের হকারদের তালিকার কাজ শুরু করলেও এখনো অন্যান্য এলাকার তালিকা করেনি ডিএমপি মতিঝিল ট্রাফিক বিভাগ। ডিএমপি লালবাগ ট্রাফিক বিভাগের ফুলবাড়িয়া জোনের অধীনে গুলিস্তানের একাংশের কিছু হকারদের তালিকা হয়েছে। পাশাপাশি একই বিভাগের কোতয়ালি জোনের অধীনেও কিছু হকারের তালিকা হয়েছে। তবে ডিএসসিসি এলাকায় ট্রাফিক বিভাগের অন্যান্য জোনে হকারদের তালিকার কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি।
জানতে চাইলে ডিএমপি লালবাগ ট্রাফিক বিভাগের লালবাগ জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মাহতাব হোসেন তার এলাকার হকার তালিকার কাজ শুরু না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন।
ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো এটা (তালিকা) করিনি। আসলে আগে যে জায়গাগুলোতে সমস্যা তৈটি হচ্ছে সেসব জায়গার তালিকার কাজ আগে করা হচ্ছে।’
হকারদের সঠিক হিসাব না থাকলেও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও হকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর ধারণা, ঢাকায় প্রায় ৩/৫ লাখ হকার রয়েছেন। সেখানে সিটি করপোরেশনের চলমান কার্যক্রমে তালিকাভুক্ত হয়েছেন মাত্র দেড় হাজারের কম হকার।
নিবন্ধনের আওতায় আসা হকারদের বর্তমান সংখ্যা যে কত, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানিং (এসটিপি)-এর প্রতিবেদনের তুলনার মাধ্যমে।
এসটিপি অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীতে প্রায় ৩৮৮ কিলোমিটার ফুটপাতের প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার ফুটপাথ দখল করে রাখেন হকাররা, যা মোট ফুটপাতের প্রায় ৪০ শতাংশ। সে হিসাবে, এখন পর্যন্ত তালিকাভুক্ত হকারদের সংখ্যা খুবই সামান্য বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃত হকারদের সঠিক তালিকা করতে নানা ধাপ সম্পন্ন করতে গিয়ে কার্যক্রমে সময় লাগছে।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) হকার নিবন্ধন কার্যক্রমের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ও সিস্টেম এনালিস্ট মো. আবু তৈয়ব রোকন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আসলে সঠিকভাবে তালিকা করতে হলে অনেক যাচাই-বাছাই করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘ধরুন, প্রথমে ফিল্ডে গিয়ে যাচাই-বাছাই করে তালিকা করে পুলিশ। এরপর সেই তালিকা সিটি করপোরেশনে আসে। এরপর আবারো তালিকা যাচাই করা হয়। হকারদের ছবি তোলা হয়। হকাদের তথ্যের ওপর কিউআর কোর্ড তৈরি করা হয়। এরপর ডিজিটাল পরিচয়পত্র তৈরি শেষে হস্তান্তর করা হয়। এই প্রক্রিয়াগুলো না করা হলে প্রশ্ন উঠবে।’
অগ্রগতির বিষয় জানতে চাইলে ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ এস এম শফিকুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, এটি আমাদের সম্পত্তি বিভাগ দেখছে তারাই ভালো বলতে পারবেন। উদ্যোগ তো শুরু হলো, এখন দেখা যাবে বাস্তবতা কি দাঁড়ায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘ফুটপাতে পথচারীরা বাধাহীন ও স্বস্তি নিয়ে চলাচল করতে পারেন এবং হকাররাও ব্যবসা করে পরিবার চালাতে পারেন- তেমন পরিকল্পনা নিয়েই কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।’
ইতিবাচক অনেকে হকার
গুলিস্তানসহ কয়েকদিন সরেজমিনে ঘুরে প্রতিটি এলাকার ফুটপাতে হকারদের দখল দেখা গেছে। তবে সিটি করপোরেশনের চলমান কার্যক্রমে অনেক হকারই ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছেন। তারা তালিকা কার্যক্রম শুরু হলে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তবে নতুন স্থানের আইডি কার্ড হাতে পেলেও আগের জায়গাতেই ব্যবসা চালাচ্ছেন অনেকে। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থান বুঝে পেলে সেখানে যেতে অনাগ্রহ নেই বলেও জানান তারা।
গুলিস্তান রমনা ভবনের পাশের ফুটপাতে শার্টের ব্যবসা করেন আনোয়ার হোসেন। মঙ্গলবার দুপুরে সিটি করপোরেশন থেকে পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেন তিনি। আইডি কার্ড অনুযায়ী তাকে রমনা ভবন সংলগ্ন লিংক রোডে ব্যবসার জন্য স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে আনোয়ার বলেন, ‘কোন এলাকায় বসবো তা এখন (সিটি করপোরেশন) বলেনি। আপতত যেখানে আছি সেখানেই বসেছি। পরে সিটি করপোরেশন যেখানে দেবে সেখানেই যাবো।’
একই কথা জানিয়েছেন জুতা বিক্রেতা মো. নিরুজ। তাকেও রমনা ভবন সংলগ্ন লিংক রোডে ব্যবসার জন্য স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবারই তিনি সিটি করপোরেশন থেকে আইডি কার্ড হাতে পেয়েছেন। নিরুজ বলেন, ‘সেখানে আছি সেখানেই বসুম। নতুন জায়গা দিলে চলে যামু।’
রমনা ভবন সংলগ্ন লিংক রোডে ব্যবসার জন্য স্থান পাওয়া গেঞ্জি প্যান্ট বিক্রেতা কামাল হোসেন তালুকদার ও মাইনউদ্দিন জানান, তাদেরও সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত জায়গায় বসতে কোনো আপত্তি নেই।
হোসেন তালুকদার বলেন, ‘সিটি করপোরেশন ব্যবসা করার জন্য জায়গা নির্ধারণ করে দিলে সেখানে যেতে আমার কোনো আপত্তি নাই।’
হকার মাইনউদ্দিন বলেন, ‘ব্যবসা না করতে পারলে সংসার চালাবো কীভাবে। সরকারের কাছে যে চাওয়া ছিল, সেটি যেহেতু পেয়েছি এখন আর কোনো অভিযোগ নাই।’
মুক্তাঙ্গনের দক্ষিণ অংশে জিপিও মোড়ে স্যুট-কোর্টের ব্যবসা করেন ফখরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আজ ৪০ বছর ধরে এই ব্যবসা করি। তালিকায় নাম দিছি। আজই (মঙ্গলবার) ছবি তুলে আসছি। এখন দেখি কী হয়।’
এদিকে, নিবন্ধন না করলেও নতুন উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেকে। গোলাপ শাহ মাজার মোড়ের ফল বিক্রেতা মাদারীপুরের আরিফ বলেন, ‘শুনছি, লোকজন আইছিল। তালিকা কইরা নিছে। কিন্তু আমি হেই দিন ছিলাম না। আমিও নাম দিমু।’
গুলিস্তান সুপার মার্কের্টের উল্টোপাশের ফুটপাতে প্যান্ট বিক্রেতা মো. সুমন বলেন, ‘নিবন্ধন এখনো করি নাই, তবে করব।’
গুলিস্তান মোড়ের স্যান্ডো গেঞ্জি বিক্রেতা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘সবাই (নিবন্ধন) করলে আমিও করব।’
তালিকাভুক্ত হতে অনীহা অনেকের
তবে সিটি করপোরেশনের চলমান কার্যক্রমে সন্দিহান অনেক হকার। নির্ধারণ স্থানে গিয়ে কাঙিক্ষত ব্যবসা করা যাবে কিনা তা নিয়েও ধোঁয়াশা আছে কারও কারও মধ্যে। তাছাড়া অতীতে বিভিন্ন এমন উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ায় নতুন কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হতে অনীহা আছে কারও কারও।
১৯৯০ সাল থেকে গুলিস্তান এলাকায় হকারি করছেন কুমিল্লার মো. মাহফুজ। দীর্ঘ এই সময় নানা পণ্য নিয়ে ব্যবসা করেছেন। এখন তিনি মানিব্যাগের বিক্রেতা। মঙ্গলবার তিনি হকি স্টেডিয়ামের উল্টোপাশের ফুটপাতে ব্যবসা করছিলেন। তবে এখনো তিনি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হননি।
মাহফুজ বলেন, ‘আগ্রহ নাই, তাই তালিকায় নাম দেই নাই। আইডি কার্ড দিয়া কিরমু। দিব গোলাপবাগ, হেয়ানে কে জাইবো? ওইহানে কাস্টমার পাবো? না পাইলে ব্যবসা করমু কি?’
তিনি আরো বলেন, ‘৯০ সাল থেকে কতবার দেখছি তালিকা হইতে। এই পর্যন্ত কোনো তালিকাই টেকে নাই, এইবার টেকবো গেরান্টি কি? তাই এমনিই (ব্যবসা) করতাছি। আমার আইডি কার্ড লাগবে না।’
জায়গা পরিবর্তন করে দিলে ব্যবসা হবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান থাকায় তালিকাভুক্ত হননি হকার আবুল হাসনাতও। তিনি জিপিও ভবনের সামনের ফুটপাতে স্যুট-কোটের ব্যবসা করেন।
আবুল হাসনাত বলেন, ‘২০০৬ সাল থেকে এখানে ব্যবসা করে আসছি। সবাই জানেন, স্যুট-কোর্ট এখানে বিক্রি হয়। এখন যদি অন্য কোথাও সরিয়ে দেই তাহলে কাস্টমার পাবো কই। তখন ব্যবসাই গুটায়া নিতে হইবো। তাই নিবন্ধন করি নাই।’
গুলিস্তান মোড়ের গামছা বিক্রেতা মো. আনোয়ার নিবন্ধন সম্পর্কে জানেনই না। তবে নিবন্ধনেরও আগ্রহ নেই বলেই জানান তিনি।
আনোয়ার বলেন, ‘অভিযানের সময় বাড়ি চলে গেছিলাম। ১৫/২০ পরে আজ আসছি। নিবন্ধনের কোনোকিছু বলতে পারি না। কেউ কিছু জানায়নি। আর নিবন্ধন করে কি হবে?’
নিবন্ধনে বৈধতা পাবেন জানালে তিনি বলেন, ‘গরিবের আর বৈধ-অবৈধ। আমগো এই আছি, ধাক্কা দিলেই নাই। বৈধ-অবৈধ আমাগোর কোনো কিছুই যায় আসে না।’
কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকার দুই সিটি কররেশনের পরিকল্পনাকে ইতিবাচক হলেও তা বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই বলে মনে করছেন হকার নেতারা। হকারদের নতুন তালিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তালিকা প্রণয়নে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করছে বলে অভিযোগ তাদের। ফলে চলমান উদ্যোগ কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত কতদূর হবে তা নিয়ে শঙ্কার প্রকাশ করেছেন তারা।
হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াৎ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান উদ্যোগগুলোতে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও, বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবের কারণে সেগুলো কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।’
তিনি আশঙ্কা করছেন, সিটি করপোরেশনের চলমান উদ্যোগ হকারদের সাধারণ পথচারী ও ব্যবসায়ীদের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
সেকেন্দার হায়াৎ বলেন, ‘তারা যে উদ্যোগটা নিচ্ছে এটাতে সাধারণ পথচারীরা কিন্তু খুশি নয়। এবং যারা ব্যবসায়ী, যারা দোকানপাট ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছে- তারাও কিন্তু প্রচণ্ড রাগ এই ঘটনায়। এতে পথচারী ও ব্যবসায়ীদের মুখোমুখি হকারদের দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।’
সাম্প্রতিক পুলিশি অভিযানের শুরু থেকেই পুনর্বাসনের আগে হকার উচ্ছেদ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলে হকার সংগঠনগুলো। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে হকার্স ইউনিয়ন। এমনকি ‘বৃহত্তর আন্দোলন’ গড়ে তোলারও হুমকি দেয় সংগঠনটি।
পাশাপাশি পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ না করা, হকারদের তালিকা প্রণয়ন এবং হয়রানি বন্ধের দাবিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে স্মারকলিপিও দেয় সংগঠনটি।
হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার বলেন, ‘আমরা স্মারকলিপি দিয়েছিলাম। ওই সময় কথা বলেছিলাম। এরপর আর আমাদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখেনি। তারা নিজেদের মতো করেই কার্যক্রম চালাচ্ছে।’
সেকেন্দার হায়াৎ আক্ষেপ করে বলেন, ‘এতো বড় একটা উদ্যোগ দুই সিটি করপোরেশন নিল, আমাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বসেনি। আমাদের তো প্রত্যেক ইউনিটে কমিটি আছে। সঠিক তালিকার জন্য তো আমরাও সহযোগিতা করতে পারতাম, কিন্তু আমাদের ডাকেনি। আমাদের বাদ দিলাম, হকারদের কোনো পক্ষকেই এই কার্যক্রমে ডাকেনি। নিজেদের মতো করেই তালিকা করা হচ্ছে।’
বিএনপির সমর্থকদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ
চলমান কার্যক্রমকে ‘ভুল পরিকল্পনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন সেকেন্দার হায়াৎ। তিনি বলেন, ‘এই পরিকল্পনা তো একটা ভুল পরিকল্পনা। কারণ প্রথম কাজ হচ্ছে হকারদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন করা। এই তালিকা প্রণয়ন নিয়েই বিগত ত্রিশ বছর ধরে জটিলতা। কারণ তালিকা হলেই দলীয় লোকজন ও বড় ব্যবসায়ীদের নাম থাকে বা তাদের স্বজনদের নাম থাকে। একটা ভূয়া তালিকা হয়। পুনর্বাসনের যখন কোনো সরকারি সুবিধা আসে তখন ওনারাই তা ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রকৃত হকাররা এটা (সুবিধা) পাই না।’
সিটি করপোরেশন এবার ধাপে ধাপে যাচাই-বাছাইয়ে সঠিক তালিকা করার কথা বলছে, প্রকৃত হকারদের তালিকা হলে কি প্রশ্ন থাকবে, উত্তরে এই হকার নেতা বলেন, ‘সঠিক তালিকাটি কীভাবে হবে? সঠিক তালিকার প্রথম শর্ত হচ্ছে- সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি থাকবে, পুলিশের প্রতিনিধি থাকবে, হকার প্রতিনিধি থাকবে এবং সাংবাদিক প্রতিনিধি থাকবে। এই চারজনের সমন্বয়ে তালিকাটা হবে। কিন্তু তালিকা করার ক্ষেত্রে কোনো হকার প্রতিনিধি রাখা হয়নি। কোনো সাংবাদিকদের ডাকা হয়েছে কিনা জানা নেই। তাহলে সঠিক তালিকাটা কীভাবে হয়?’
তার অভিযোগ, ‘এটা (হকাদের তালিকা) নয়া বন্দোবস্ত করতেছে। (বিএনপি) ক্ষমতায় যাওয়ার পরে তাদের দলের তো হাজার হাজার কর্মী, এদের তো আর্থিক সুবিধা দিতে পারেনি- তাই এই বন্দোবস্তর মধ্যে তাদের একটা ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘(হকার) আইডি কার্ডগুলো কাদের দিচ্ছে? একটু খেয়াল করে দেখবেন, সব দিচ্ছে তাদের (বিএনপি) মনোভাবাপন্ন লোকজনকে। যারা প্রকৃত হকার তারা পাচ্ছে না। এই জায়গায় ঘুষ দুর্নীতিও ঢুকে গেছে। তালিকায় অন্তর্ভুক্তি হওয়ার জন্য অনেকের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে- এমন নানা ধরণের আলাপ-আলোচনা এখানে আছে।’
নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রত্যাশা প্রশাসকদের
নতুন উদ্যোগে দীর্ঘদিনের হকার সমস্যা নিরসনে সমাধানের পথ দেখছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসকরা। তারা বলছেন, হকারদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে।
প্রস্তাবিত হকার পুনর্বাসন নীতিমালা, ২০২৬-এর আওতায় নিবন্ধনের মধ্যমে হকার পুনর্বাসন উদ্যোগকে মানবিক ও যুগান্তকারী উল্লেখ করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম।
গত ৩০ এপ্রিল নগরভবনে হকারদের ডিজিটাল কার্যক্রম উদ্বোধনকালে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, ‘হকার, পুলিশ, সিটি কর্পোরেশন ও সাধারণ মানুষ সবাই মিলে সহযোগিতা করলে এই ঢাকা শহরকে সুন্দরভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।’
আরও পড়ুন: গুলিস্তানে হকার-পুলিশের লুকোচুরি খেলা!
চলমান কার্যক্রমে ফুটপাতের চাঁদাবাজি বন্ধ হবে বলেও আশা করেন তিনি। আবদুস সালাম বলেন, ‘আগে হকারদের চাঁদা দিতে হতো, এখন আর কাউকে চাঁদা দিতে হবে না। তবে সিটি করপোরেশনকে কিছু ফি দিতে হবে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তা ও সহযোগিতা করবে।’
একইদিন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার হকারদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র প্রদান অনুষ্ঠানে প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘এই পরিচয়পত্র স্থায়ী বন্দোবস্ত নয়।’
তিনি বলেন, ‘হকার পুনবার্সনে আরও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন। ভবিষ্যতে হকার্স মার্কেটের ব্যবস্থা করা হবে। তবে আগের জায়গায় আর কেউ বসবেন না।’
এএম/এমআর




