প্রকল্প শুরুর ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা স্মার্ট কার্ড পাননি সাড়ে পাঁচ কোটির মতো ভোটার। কবে তারা এই কার্ড পাবেন তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।
নাগরিকদের উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র (স্মার্ট কার্ড) দিতে দেড় দশক আগে ২০১১ সালে প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। পাঁচ বছর পর ২০১৬ সালের অক্টোবরে স্মার্ট কার্ড বিতরণ শুরু করে তৎকালীন ইসি। তখন ৯ কোটি ভোটার বিবেচনায় পরের বছর নাগাদ সবার হাতে এই কার্ড তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল সাংবিধানিক সংস্থাটি। তবে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর কয়েক বছর কেটে গেলেও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। কবে নাগাদ সবার হাতে স্মার্ট কার্ড পৌঁছাবে, তাও সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না ইসি।
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট নিবন্ধিত ভোটারের প্রায় ৪৩ শতাংশ, অর্থাৎ ৫ কোটি ৪৬ লাখের বেশি মানুষ এখনো স্মার্ট কার্ড হাতে পাননি।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে স্মার্ট কার্ড পেয়েছেন ৭ কোটি ৩০ লাখ ৩১ হাজার ২৪৬ জন। এখনো কার্ড পাননি ৫ কোটি ৪৬ লাখ ৮০ হাজার ৫৫৭ জন ভোটার।
ইসির তৈরি এনআইডির স্মার্ট কার্ড বিতরণের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এখন পর্যন্ত ইসি মোট স্মার্ট কার্ড পেয়েছে ৮ কোটি ৬৭ লাখ ১২ হাজার ২৬৬টি। এর মধ্যে নাগরিকদের হাতে দেওয়া হয়েছে ৭ কোটি ৩০ লাখ ৩১ হাজার ২৪৬টি। অবশিষ্ট রয়েছে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৮১ হাজার ২২টি।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে ৫২২টি উপজেলার মধ্যে স্মার্ট কার্ড বিতরণ কাজ শেষ করা হয়েছে ৪০৪টি উপজেলায়। বিতরণ কার্যক্রম চলমান ছিল একটি উপজেলায়, যা বর্তমানে স্থগিত। কার্ড প্রিন্ট করা হয়েছে কিন্তু বিতরণ হয়নি-এমন উপজেলা রয়েছে ২টি, আর প্রিন্ট করা হয়নি ১১৫টি উপজেলায়।
স্বল্প পরিসরে প্রিন্টিং কার্যক্রম চালু, দেওয়া হচ্ছে জরুরি প্রয়োজনে
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই ব্ল্যাংক স্মার্ট কার্ডের সংকটের কারণে স্মার্ট কার্ড প্রিন্টিং কার্যক্রম সীমিত করা হয়। যাদের অতি জরুরি প্রয়োজন, নির্বাচন কমিশনে আবেদন করলে নির্দিষ্ট ফি প্রদানের মাধ্যমে তাদের স্মার্ট কার্ড দেওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনআইডি অনুবিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, কার্ড সংকট ও প্রিন্টিং মেশিনের ত্রুটির কারণে স্মার্ট কার্ড প্রিন্টিং কার্যক্রম পুরোদমে চলছে না। সংকট কাটিয়ে উঠলেই তা পুরোদমে চালু করা হবে। বর্তমানে আমরা সামগ্রিকভাবে স্মার্ট কার্ড না দিলেও যাদের জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন তাদের দিচ্ছি। যেমন প্রবাসী, বিদেশগামী ছাত্রছাত্রী, এছাড়া নানা কারণে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সেবা গ্রহণকারীর এনআইডির স্মার্ট কার্ড চেয়ে থাকে—তাদেরকে আবেদনের প্রেক্ষিতে আমরা স্মার্ট কার্ড দিচ্ছি।
৪০৬ কোটি টাকার স্মার্ট কার্ড ক্রয়, তবুও নেই গতি
গত বছর নির্বাচন কমিশনের জন্য ৪০৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯৯ হাজার ৮৪০ টাকার ব্ল্যাংক কার্ড কেনার অনুমতি দেওয়া হলে নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়, কার্ড কেনার যাবতীয় কার্যক্রম শেষ হলে নাগরিকদের হাতে দ্রুত স্মার্ট কার্ড দেওয়ার কাজ শুরু করা হবে।
ইতোমধ্যে ফ্রান্সে গিয়ে ব্ল্যাংক স্মার্ট কার্ডের গুণগত মান যাচাই কার্যক্রম (পিএসআই) শেষ করে এসেছে সংস্থাটি। তবুও এ কার্যক্রমে এখনো গতি আসেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, নতুন যে ব্ল্যাংক স্মার্ট কার্ড কেনার পরিকল্পনা হয়েছিল, তা থেকে এখন পর্যন্ত আমরা ৮ থেকে ১০ লাখের মতো স্মার্ট কার্ড পেয়েছি। আশা করছি নতুন অর্থবছরে সব স্মার্ট কার্ড হাতে পেয়ে যাব। এরপর নাগরিকদের এ সেবা পুরোদমে দেওয়া সম্ভব হবে।
গত বছর স্মার্ট কার্ডের সংকটের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছিলেন, ‘কিছুদিন ধরে এনআইডির (স্মার্ট কার্ড) ব্ল্যাংক কার্ডের একটি সংকট তৈরি হয়েছে। তিন কোটি কার্ড কেনার জন্য সেনাবাহিনীর সঙ্গে চুক্তি হয়। কিন্তু ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেনাবাহিনী আমাদের কার্ড দিতে পারছে না মর্মে চিঠি দেয়। পরে এটি নিয়ে অনেক আলোচনা হয় এবং সিদ্ধান্ত হয়, তারা ১৭২ টাকা করে আমাদের কার্ড দেবে।’
ইসি সূত্র জানায়, ২০০৭ ও ২০০৮ সালে প্রথম ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়নের কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরবর্তীতে এ ভোটার কার্ডের তথ্য ব্যবহার করে নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর প্রেক্ষিতে নাগরিকদের উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০১১ সালে আইডিইএ (স্মার্ট কার্ড) প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়।
নানা জটিলতা কাটিয়ে চার বছর পর ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি ১৮ মাসের মেয়াদে ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান অবার্থার টেকনোলজিসের সঙ্গে ৯ কোটি নাগরিকের জন্য ৯ কোটি স্মার্ট কার্ড তৈরির চুক্তি করে ইসি। এরপর ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর স্মার্টকার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে সংস্থাটি।
কিন্তু মেয়াদ বৃদ্ধির পরও ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত শর্ত অনুযায়ী কার্ড দিতে না পারায় চুক্তি বাতিল করা হয় এবং ওই বছরের শেষে অবার্থারের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, ২০১৭ সাল পর্যন্ত অবার্থার ১ দশমিক ৫১ ডলার দরে ৭ কোটি ৭৩ লাখ কার্ড সরবরাহ করতে পেরেছিল। সে সময়ই কার্ডের ঘাটতি ছিল ১ কোটি ২৭ লাখ। এই কয়েক বছরে ভোটার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৯৩ জন। সব মিলিয়ে আরও প্রায় ৪ কোটি ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৫৩৫টি ব্ল্যাংক কার্ড প্রয়োজন পড়বে সকল নাগরিককে উন্নতমানের এ কার্ড দিতে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, অবার্থারের সঙ্গে চুক্তি শেষ হলে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বিএমটিএফের কাছ থেকে এই কার্ড নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। এদিকে ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গেও স্মার্ট কার্ড প্রকল্পের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। এরপর রাজস্ব খাত থেকে প্রকল্পের ব্যয় মেটানো হচ্ছে। আইডিইএ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর আইডিইএ দ্বিতীয় প্রকল্প হাতে নেয় কমিশন। এই প্রকল্পের আওতায় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিএমটিএফের কাছ থেকে ৪০৬ কোটি ৫০ লাখ টাকায় তিন কোটি ব্ল্যাংক স্মার্ট কার্ড সরবরাহ করার কথা ছিল।
কয়েক বছরে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় চুক্তিতে পরিবর্তন এনে কার্ডপ্রতি ১৩৫ দশমিক ৫০ টাকার পরিবর্তে ৩৬ দশমিক ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১৭২ টাকা করে ২ কোটি ৩৬ লাখ কার্ড কেনার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।
বর্তমানে সব নতুন ভোটারকে সাধারণ কার্ড দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। পুরোনোদের স্মার্ট কার্ড বিতরণ শেষ হলে নতুন ভোটারদের জন্য উন্নতমানের এই এনআইডি কার্ড দেওয়ার কার্যক্রম নেওয়া হবে।
এমএইচএইচ/এমআর




