শনিবার, ২ মে, ২০২৬, ঢাকা

‘সব তলায়া গেছে, কিছুই পাই নাই’

ঢাকা মেইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২ মে ২০২৬, ০৭:৪৬ পিএম

শেয়ার করুন:

floood
তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর ফসল। ছবি কোলাজ: ঢাকা মেইল

‘সব তলায়া গেছে। কিছুই পাই নাই। ধার-দেনা কইরা সার বীজ কীটনাশক কিনছিলাম। কেমনে শোধ অইবো, আর কেমনে কী করবাম জানি না,’ বলছিলেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হালুয়ারগাঁও এলাকার কৃষক আনোয়ার হোসেন।

আকাশের মেঘ যেমন কাটছেই না, সঙ্গে কমছে না হাওরের কৃষকের দুশ্চিন্তা। বরং, বাংলাদেশের বেশির ভাগ এলাকায় আগামী কয়েক দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরপ্রধান এলাকায় রয়েছে বন্যার পানি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও।


বিজ্ঞাপন


বৃষ্টি অব্যাহত থাকা কারণে হাওর অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে এবং বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে প্রতিদিনই পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ বাড়ছে। ফলে একদিকে প্রায় পাকা ধান পানিতে নিমজ্জিত হচ্ছে, আবার তড়িঘড়ি করে কিছু এলাকায় ধান কাটা হলেও রোদ না থাকায় সেইসব ধানও পচে যাচ্ছে।

Hour5

আবার বৃষ্টির কারণে নদ-নদীর পানিও বাড়ছে। যদিও তা এখনো বিপদসীমায় পৌঁছেনি বলে বিভিন্ন জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।


বিজ্ঞাপন


সুনামগঞ্জের চাষি আনোয়ার হোসেন বলছিলেন, এবার দেড় কানি (প্রায় ৬০ শতাংশ) জমিতে ধান চাষ করলেও সামান্য পরিমাণ ধানও তিনি তুলতে পারেননি। তাদের পুরো অঞ্চলের চিত্রই প্রায় একই এবং কেউই তাদের পুরো ফসল ঘরে তুলতে পারেনি ধানসহ জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কারণে।

একই ধরনের অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাহপুর-খয়েরপুর ইউনিয়নের গয়েশপুর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ জসিম।

‘হাজার হাজার কানি ক্ষেত এখন পানির তলে। ধানটা লাল হয়ে আসছিল। কমলার মতো রং। সকাল কাজ করে আসলাম, আর দুপুরে গিয়া দেখি পানি। কাটার সময়ই পাইলাম না। পরদিন পুরোটাই তলায়া গেল,’ নিজের জমির ধান পানিতে তলিয়ে যাবার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি এভাবে।

আরও পড়ুন

উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার পদধ্বনি, ডুবছে কৃষকের স্বপ্ন

তিনি বলেন, কেউ কেউ ধান কেটে আনলেও রোদের জন্য স্তূপ করে রাখা সেসব ধান রোদ না থাকায় নষ্ট হতে শুরু করেছে। ‘এক দিনের রইদে (রোদ) এই ধান শুকাইবো না। কিন্তু সেই রইদ-ই তো পাওয়া যাইতাসে না। ওইদিকে নদীর পানি আরও বাড়তেছে,’ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের মতোই নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও আশেপাশের পুরো হাওড় অঞ্চলেরই চিত্র এমন বলে জানা যাচ্ছে।

Hour4

এর মধ্যে নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জ জেলায় ইতোমধ্যেই বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং সামনে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে, সঙ্গে নতুন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে বলেও জানিয়েছে বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

'পানিতে নিমজ্জিত জমি বাড়ছে'

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান বলছেন, আজ শনিবারও সেখানে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে এবং সে কারণে পানিতে নিমজ্জিত হওয়া জমির পরিমাণ দ্রুতগতিতে বাড়ছে।

‘এখানে সারাদিন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। মনে হচ্ছে পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ আজ নাগাদ প্রায় সাত হাজার একর ছাড়িয়ে যাবে। ওদিকে রোদ না থাকায় ধান শুকাতে পারছেন না কৃষকরা। ফলে উঠানো ধান পচে যাচ্ছে। আমরা তাও কৃষকদের বলছি যেখানে সুযোগ আছে সেখানে যেন ধান কেটে ফেলে,’ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন সাদিকুর রহমান।

এর আগে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির পর বৃহস্পতিবার কিশোরগঞ্জে রোদ ওঠার পর কিছুটা স্বস্তি এসেছিল বোরো ধান নিয়ে উদ্বেগে থাকা কৃষকদের মধ্যে।

আরও পড়ুন

চোখের সামনে ডুবছে স্বপ্নের ফসল

ওইদিন ও পরে শুক্রবার বেশ কিছু এলাকায় পাকা ধান কেটেছেন অনেকে। কিন্তু শনিবার আবার থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে কাটা ধান নিয়ে উল্টো বিপাকে পড়েছেন অনেকে।

Hour3

আবার বৃষ্টি কমে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির পরিমাণও কমে আসছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ড ওই সময় কৃষকদের ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিল।

কিন্তু শুক্রবার রাত থেকেই আবারও বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হওয়ায় এখন যারা ধান কাটেননি আবার যারা কেটে স্তূপ করে রেখেছিলেন, তারা উভয়েই সংকটে পড়েছেন। আজও সকাল থেকে জেলার বিভিন্ন জায়গায় বজ্রবৃষ্টি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলছেন, দুপুর নাগাদ বৃষ্টি বন্ধ হয়ে রোদ দেখা গেলেও জেলার চারটি নদীর মধ্যে ভৈরবে মেঘনা ছাড়া আর অন্যগুলোর পানি বেড়েছে।

আরও পড়ুন

জ্বালানি সংকটে দিশেহারা কৃষক, ফসলে বিপর্যয়ের শঙ্কা

‘বেশির ভাগ নদনদীর পানিই বেড়েছে। তবে পানি বিপৎসীমার নিচে আছে, কিন্তু বাড়ছে। কিছু এলাকায় পানি সরানোর জন্য বাঁধ কেটে দেওয়া হচ্ছে,’ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, এবার পুরো সিলেট বিভাগেই বৃষ্টি বেশি হওয়ায় পুরো অঞ্চলজুড়ে চাষের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, সেখানেও আগামী কয়েকদিনে বৃষ্টি আরও বেড়ে যাওয়ার পূর্বাভাস আছে।

‘বাঁধগুলো সুরক্ষিত আছে, কিন্তু যেসব এলাকায় জমির ধান কাটা হয়েছে সেখানে বাঁধ কেটে পানি যাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কারণ এর মধ্যেই বন্যায় তলিয়ে গেছে কিছু এলাকা,’ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন পাউবোর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার।

জেলা কৃষি অফিসের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলছেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে হাওরে ধান কাটায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে। শনিবার আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তবে ভারী বৃষ্টি না হলে ধান কাটা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

‘কৃষকের সারা বছরের খোরাকি মাঠে। বৃষ্টির কারণে সময়মত ধান কাটা যায়নি। এখনো ১৮ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে। হাওর এলাকায় ৭১ শতাংশ জমি থেকে ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। আর হাওড় ও হাওড়ের বাইরের সব মিলিয়ে গড়ে ৬০ শতাংশ জমির ধান তোলা সম্ভব হয়েছে। এখন ৪০ শতাংশ ধান মাঠে,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ওমর ফারুক।

একই ধরনের চিত্র নেত্রকোনাতেও। ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে কংস নদ ও উব্দাখালী নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

Hour2

বাড়ছে সোমেশ্বরীসহ আরও কয়েকটি নদীর পানি। শুক্রবার নাগাদ প্রায় সাড়ে ৯ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ।

কিছু এলাকার ধান কেটে তোলা সম্ভব হলেও বিপুল পরিমাণ ধান এখনো পানির নিচেই আছে বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আমিরুল ইসলাম। তার মতে, মার্চের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি, দুই ধাপে শিলাবৃষ্টি এবং এরপর কিছুদিন টানা বৃষ্টির ফলে বোরো ধান ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

জেলা প্রশাসন অবশ্য বলেছে, নতুন করে বৃষ্টি না হলে অবস্থার অবনতির আশঙ্কা কম।

হাওর অঞ্চলে বছর একবার যে ফসল হয়ে সেটি বোরো ধান। মূলত ১৫ এপ্রিল থেকে ১৫ মে পর্যন্ত এই সময়টি হাওরে বোরো ধান কাটার সময় বলে জানান কৃষি কর্মকর্তারা।এবার এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই বৃষ্টির কারণে ধান কাটতে শুরু করতে পারেনি কৃষকরা।

এর আগে মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকেই বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি এবং ভারী ও অতি ভারী বৃষ্টি শুরু হওয়ায় এই বোরো ধান কাটার প্রস্তুতির কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলছে কৃষি অফিসগুলো।

যদিও সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাওরাঞ্চলে ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার করার কথা জানিয়েছেন। সূত্র: বিবিসি বাংলা

জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর