টানা ভারী বৃষ্টিপাত, কালবৈশাখী ঝড়, সঙ্গে পাহাড়ি ঢল। একে একে আক্রান্ত হচ্ছে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণাসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা। হাওর ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে চোখের সামনেই ডুবছে কৃষকের স্বপ্নের ফসল। শোনা যাচ্ছে বন্যার পদধ্বনিও।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) ঢাকা মেইলের বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনে এমনই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন বলছে, জেলাগুলোর মানুষের কপালে চিন্তার ভাজ। ঘর আর ফসল বাঁচানোর দুশ্চিন্তায় ঘুম হারাম সবার। দেখে নেওয়া যাক, কোন জেলার কী অবস্থা।
বিজ্ঞাপন
আকস্মিক বন্যার শঙ্কায় সিলেটের মানুষ
এই জেলায় চলছে ভারী বৃষ্টি ও বজ্রঝড়, যা আগামী কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। ভারী বর্ষণের ফলে পাহাড়ি ঢল এবং আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে সিলেটে। জেলার নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ জেলায় ২ মে পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

হবিগঞ্জে বিশাল এলাকা পানির নিচে, ফসল হারিয়ে সংকটে কৃষক
বিজ্ঞাপন
জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। গত কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণ ও দমকা হাওয়ায় হাওরের বিশাল এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বছরের একমাত্র বোরো ফসল হারিয়ে চরম সংকটের মুখে পড়েছেন জেলার হাজার হাজার কৃষক।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুরের দত্তগাঁও অংশে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে ও উপচে পানি হাওরে প্রবেশ করতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে শত শত একর ফসলি জমি প্লাবিত হয়।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক জানান, ভারী বর্ষণের ফলে ইতোমধ্যে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর ধানি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওরে এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ ধান কাটতে বাকি রয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আবহাওয়ার উন্নতি না হলে অবশিষ্ট ধানটুকুও সম্পূর্ণ তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফসল তলিয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় সুনামগঞ্জের লাখো কৃষক
এই জেলায় জমি থেকে ধান তোলা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন ১০ লাখের বেশি কৃষক। কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণ, উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল, বজ্রপাত, শ্রমিক সংকট, জ্বালানি সংকটসহ নানা সমস্যায় এখানকার কৃষকদের চোখে এখন কেবলই অনিশ্চয়তার ছায়া।

গত তিন দিন ধরে সুনামগঞ্জে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। একইসঙ্গে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি নামছে জেলার হাওর ও নদীগুলোতে। এতে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে ৩৫ সেন্টিমিটার। এতে হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধে পানির চাপ ও পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ভেঙে গেছে এরনবিল হাওরের বাঁধ। মুহূর্তেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে কয়েকশ একর জমির আধাপাকা ও পাকা ধান।
জেলার কৃষকরা যখন কাস্তে হাতে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই প্রকৃতির এমন আচরণে ম্লান হয়ে গেছে হাওরের ধান গোলায় তোলার সব আনন্দ। অনেক কৃষককে কোমরসমান পানিতে নেমে আধপাকা ধান কেটে শেষ সম্বলটুকু রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করতে দেখা গেছে।
শুধু হাওরেই নয়, জলাবদ্ধতা হানা দিয়েছে কৃষকের আঙিনাতেও। জেলার কৃষকরা যে ধান রোদে শুকানোর জন্য খলায় দিয়েছিলেন, ভারী বৃষ্টিতে সেই খলাগুলো এখন ছোটখাটো জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। শুকনো ধান এখন পানির নিচে। সারা বছরের আহার চোখের সামনে পচে যাচ্ছে আর কৃষক সে ফসল রক্ষার যুদ্ধ করছেন।
মৌলভীবাজারে ৩০ গ্রাম প্লাবিত, ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
এ জেলায় মুষলধারে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে গোগালিছড়া ও বালিয়াছড়ার বাঁধ ভেঙে প্রায় ৩০ গ্রাম প্লাবিত ও ছয়শ হেক্টর জমির বোরো ধান ও আউশের বীজতলা পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বেরিয়ে গেছে শতাধিক পুকুরের মাছ।
জেলার কলমগঞ্জ উপজেলায় ছড়ার একটি স্থানে বাঁধ ভেঙে যাওয়া এবং আরও তিনটি পয়েন্ট দিয়ে পানি উপচে পড়ার ফলে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ধান কাটার আগ মুহূর্তে চোখের সামনে সোনালি ফসল তলিয়ে যেতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন এলাকার শত শত কৃষক।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বালিয়াছড়ার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির তীব্র চাপে ছড়ার একটি অংশ ভেঙে পানি ঢুকছে ফসলি জমিতে। এছাড়া পাড় নিচু হওয়ায় তিনটি স্থান দিয়ে পানি উপচে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা এখন প্লাবিত। বর্তমানে উত্তর বালিগাঁও গ্রামের অধিকাংশ জমি পানির নিচে।
হাড়ভাঙা খাটুনি আর চড়া সুদে ঋণ নিয়ে জেলার কৃষকরা এবার চাষাবাদ করেছিলেন। এখন ফসল হারিয়ে তারা নিঃস্ব। অনেক কৃষককে বুক সমান পানিতে নেমে আধা-পাকা ধান কাটার নিরর্থক চেষ্টা করতে দেখা গেছে। কিন্তু পানির কাছে তারা অসহায়।
নেত্রকোনায় তলিয়ে গেছে ২২০০ হেক্টর জমির ধান
এ জেলায় ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে কয়েকটি নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এপর্যন্ত ২২১৫ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক তাদের একমাত্র ফসল হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেল ৩টার তথ্য অনুযায়ী, জেলার কলমাকান্দা উপজেলায় উপদাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ০.৬০ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। খালিয়াজুরীতে কংস নদের পানি বিপৎসীমার ০.৯৩ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া সোমেশ্বরী, ভোগাই, ধনু ও মগড়া নদীতে পানি বিপৎসীমার কিছুটা নিচে রয়েছে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শাখাওয়াত হোসেন জানান, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। আরও বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, ২২১৫ হেক্টর জমির ধান ঝুঁকিতে রয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এর পরিমাণ আরও বাড়বে। যদিও হাওরাঞ্চলে ৬৫ শতাংশ ধান কাটা ইতোমধ্যে শেষ।
কিশোরগঞ্জে হাওরে ভাসছে কৃষকের স্বপ্নের ফসল
টানা চার দিনের ভারী বর্ষণে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চলে প্রায় সাড়ে নয়শ হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। ফলে বোরো ধান কাটতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন কৃষকরা। বৃষ্টির কারণে মাঠ থেকে কেটে আনা ধান শুকাতে না পেরেও বিপাকে পড়েছেন তারা।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে নিকলী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের সিনিয়র পর্যবেক্ষক আখতার ফারুক জানান, মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৯১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামীকালও (বৃহস্পতিবার) বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমি ইতোমধ্যে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। দিনদিন তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ বাড়ছে।
ঝড়ে লন্ডভন্ড কুমিল্লা, ১৭৩৩ হেক্টর ফসলের ক্ষতি
চলমান কালবৈশাখী ঝড় আর টানা বৃষ্টিতে কুমিল্লায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিপর্যয় নেমে এসেছে জনজীবনে। মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এ জেলায় ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। বুধবার সকালে ৩৬.২ মিলিমটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা আগের দিনের তুলনায় অনেক কম। তবে বুধবার সকাল থেকে টানা বৃষ্টি ও হালকা ঝড়ো হাওয়া বইছে। এতে জেলার ১৭টি উপজেলার কৃষি ও বিদ্যুতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, কুমিল্লার ১৭টি উপজেলার মোট ১ হাজার ৭৩৩ হেক্টর ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তার মধ্যে ভুট্টা ৫৫০ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন সবজি ৩৬৪ হেক্টর এবং ৯১ হেক্টর তিল।
জেলাজুড়ে ১ লাখ ৭২ হাজার ২১৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ হলেও তারমধ্যে ২৩ শতাংশ কাটা হয়েছে। তাই বেশিরভাগ ধান পেকে যাওয়ায় চলমান কালবৈশাখী ঝড়ে ধানে তেমন ক্ষতি দেখছে না কৃষি অফিস।
ঝড়-বৃষ্টি-বন্যা নিয়ে আবহাওয়া বার্তায় যা পাওয়া যাচ্ছে
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, টানা ভারী বৃষ্টি ও অতিভারী বৃষ্টিতে দেশের পাঁচ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে মৌলভীবাজার ও নেত্রকোনার নিচু এলাকায় পানি ঢুকতে শুরু করেছে। সিলেট, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলেও বন্যা ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানাচ্ছে, ভুগাই কংস, মনু, সোমেশ্বরী ও মগরা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এদের মধ্যে মনু নদী ছাড়া বাকি তিনটিই নেত্রকোনার ওপর দিয়ে প্রবাহিত। এসব নদী তুলনামূলক ছোট হওয়ায় ভারী বৃষ্টিতে দ্রুত পানি বাড়ে। তবে বৃষ্টিপাত কমলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
এদিকে বুধবার (২৯ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের পাঁচ বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
পূর্বাভাসে আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম জানান, বিরাজমান লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। আজ সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা/ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
সেই সঙ্গে ময়মনসিংহ, ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরণের ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। সারাদেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
এএইচ




