মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

বাঙালি ঐতিহ্যের টেপাপুতুল-টেরাকোটার রূপকার কে এই মরন চাঁদ?

মোস্তাফিজুর রহমান
প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৮ পিএম

শেয়ার করুন:

বাঙালি ঐতিহ্যের টেপাপুতুল-টেরাকোটার রূপকার কে এই মরন চাঁদ?
টেপাপুতুল-টেরাকোটার রূপকার মরন চাঁদ

নরম এঁটেল মাটি হাতে টিপে টিপে পুতুলে পরিণত হয় বলেই ‘টেপাপুতুল’, যা বাঙালী ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। বিশেষত বৈশাখী উৎসবে টেপাপুতুলের আবেদন অনন্য। বৈশাখী আনন্দে শিশু-কিশোরদের বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গই এই পুতুল।

ঐতিহ্যের এই পুতুলের সঙ্গে একটি নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, তিনি মরন চাঁদ পাল। যিনি টেপা পুতুলের বৈচিত্র‍্য এনে করেছিলেন আধুনিকায়ন। এমনকি এই টেপা পুতুলেই তিনি বাঙালীর কারুশিল্পকে পরিচয় করিয়েছেন বিশ্বব্যাপী। তার তৈরি টেপা পুতুল সংরক্ষিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসেও। পুতুলটি মুগ্ধ হয়ে হোয়াইট হাউজে নিয়ে গিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন।


বিজ্ঞাপন


মরন চাঁদ মাটির গন্ধে সিক্ত হয়ে পোড়া মাটির শিল্পকে আন্তর্জাতিককরন করেছেন। প্রচলিত কোনো ডিগ্রি ছাড়াই তিনি হয়ে উঠেছিলেন দেশের একজন কারুশিল্প প্রতিনিধি। টেপা পুতুলের আধুনিকায়নে ‘মরণ পালের পুতুল’ হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি দেশের সমকালীন টেরাকোটা শিল্পেরও রূপকার।

টেপাপুতুল, টেরাকোটাসহ মরন চাঁদের নানা শিল্পকর্ম রফতানি হয়েছে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। সেসব দেশে তার শিল্পকর্মগুলো ব্যাপক সুনামও অর্জন করে। বিভিন্ন সময় সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে তার শিল্পকর্ম বিশ্বের নানা দেশকে উপহার হিসেবেও দেওয়া হয়েছে।

তার টেরাকোটার কাজ স্থান করে নিয়েছে ‎বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিবি), মার্কিন দূতাবাস, ব্রিটিশ দূতাবাস, বাংলাদেশ ব্যাংক, ইত্তেফাক ভবনে। রাজধানী শাহবাগস্থ জাতীয় জাদুঘরে তার শিল্পকর্মের একটি বিশেষ কর্ণারও রয়েছে। সেসব শিল্পকর্মেই তাকে পৌঁছেছে দিয়েছে শিল্পের উচ্চতর আসনে।

‘সাদাকালো’ লক্ষ্মী নারায়ণ

গৌরবময় রাজবংশে জন্ম নিয়েও মরন চাঁদ পালের প্রথম জীবন ছিল সাদাকালো। সেসময় তিনি মরন চাঁদ হয়ে উঠেননি, তার নামও ছিল লক্ষ্মী নারায়ণ পাল। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বরে। ঢাকার রায়েরবাজারের ভূমিপুত্র তিনি। তার পিতা গোপাল হরিপাল ও মাতা ছিলেন সুরবালা পাল।

গরীব পরিবারে জন্ম হওয়ায় লেখাপড়া করা হয়নি মরন চাঁদের। তাই উপার্জনের পথে পা বাড়ান ছোটকালেই। নানা ধরনের মৃৎপাত্র তৈরির দক্ষ কারিগর হয়ে উঠেছিলেন কৈশোরেই। জীবনের মোড়ও ঘুরিয়েছিল এই কাজেই। তবে সে পথ ছিল বহু দীর্ঘ।

সেদিন কাজেই ছিল কিশোর লক্ষ্মী নারায়ণ। অবলীলায় চালাচ্ছিল হুইল থ্রোইং। হাতের জাদুতে একে একে তৈরি হচ্ছিল মৃৎপাত্র। ঠিক তখনই ঘটে যায় এক বিস্ময়কর ঘটনা।

পঞ্চাশ/ষাটের দশকে ক্যাম্পাসের বাইরে চারুকলার শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের অন্যতম পছন্দের জায়গা ছিল রায়েরবাজার। সেদিন কিশোর লক্ষ্মী নারায়ণের মৃৎপাত্র তৈরির ছবি আঁকেন চারুকলার শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের উৎসাহ যোগাতে সেখানে গিয়েছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনও। তিনি কিশোর লক্ষ্মী নারায়ণের হুইল ঘুরানোর মুনশিয়ানা দেখে অভিভূত হন।

সে মৃৎপাত্র তৈরির দক্ষতা ও প্রতিভায় কেড়ে নেন শিল্পীর মন। আর সেই থেকেই লক্ষ্মী নারায়ণ থেকে মরন চাঁদের যাত্রা শুরু হয়ে যায়। তখন থেকেই তিনি হয়ে যান জয়নুল আবেদিনের শিল্প আন্দোলনের সহযোদ্ধা।

putul_22

লক্ষ্মী নারায়ণ থেকে মরন চাঁদ

তখন ১৯৬১ সালে। চারুকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন বিভাগ চালুর উদ্যোগ নেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। প্রতিষ্ঠা করেন মৃৎশিল্প বিভাগ, যেটি পরবর্তীতে ‘পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়’ নামকরণ করা হয়েছিল। বিভাগটির প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হন শিল্পী মীর মোস্তফা আলী। তার সঙ্গে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হন জাপানি মৃৎশিল্পী কোইচি তাকিতা।

মৃৎশিল্প বিভাগ চালু হতেই কপাল খুলে যায় কিশোর লক্ষ্মী নারায়ণের। নতুন এই বিভাগের প্রথম ব্যাচে চারুকলা ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগ থেকে ডিগ্রি নেওয়া চার শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাকেও ভর্তি করা হয়। অথচ নারায়ণের কোনো সার্টিফিকেট বা ভর্তি হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল না। মূলত বিশেষ বিবেচনায় তাকে ভর্তি করেছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময়ও তার নাম লক্ষ্মী নারায়ণ পালই ছিল। তবে নিজেকে মেলে ধরে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়। ক্রমেই নিজের পরিচিতি পান ‘মরন চাঁদ পাল’ হিসেবে।

প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই শিক্ষক

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও পারিবারিকভাবে মৃৎশিল্পের বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন মরন চাঁদ। সার্টিফিকেট কোর্সে ভর্তি হয়ে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে পারিবারিক শিক্ষার মিশেলে মৃৎশিল্পে তিনি হয়ে উঠেন আরও তীক্ষ্ণ। তিনি হয়ে উঠেন আরও বেশি সচেতন। তার তৈরি মৃৎশিল্পও পায় ভিন্ন মাত্রা।

মরন চাঁদ মৃৎশিল্প বিভাগের পড়াশোনা শেষ করেন সফলভাবে। তিনি বাজিমাত করেন ফলাফলেও। প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। এতে মুগ্ধ হয়েছিলেন সবাই। পরবর্তিতে ১৯৬৩ সালে বিভাগীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া তাকে। সে থেকে তার নতুন পথ চলা শুরু।

পরবর্তিতে ১৯৬৫ সালে তৎকালীন আর্ট কলেজে যোগদান করেন মরণ চাঁদ পাল। তিনি টানা ৪২ বছর শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। ২০০৭ সালে জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের মৃৎশিল্প বিভাগের শিক্ষক হিসেবে তিনি অবসরে যান।

দেশে-বিদেশে বহু অর্জন

প্রচলিত কোনো ডিগ্রি না থাকলেও দেশে ও দেশের বাইরে থেকে বহু অপ্রচলিত সার্টিফিকেট অর্জন করেন মরন চাঁদ। এরমধ্যে ১৯৭৯ সালে ভারত থেকে একটি সার্টিফিকেট অর্জন করেন। দেশটির সরকারি পটারি উন্নয়ন কেন্দ্রে মৃৎশিল্পের ওপর কোর্স সম্পন্ন করে সেই সার্টিফিকেট লাভ করেছিলেন। তাছাড়া ১৯৮৬ সালে এশিয়ান রিজিওনাল আর্টিশিয়ান ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করে ‘মাস্টার ক্রাফটসম্যান’ সার্টিফিকেট লাভ করেন তিনি।

মৃৎশিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য মরন চাঁদ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। তিনি বিশেষ অবদানের জন্য ‘শিলু আবেদ পুরস্কার’ লাভ করেন। তিনি কারিকা স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।

১৯৬৭ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ হস্তশিল্প প্রদর্শনীতে মৃৎশিল্পের ওপর শ্রেষ্ঠ পুরস্কার লাভ করেন এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প কর্পোরেশন থেকে শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী হিসেবে পুরস্কৃত হন। ২০০০ সালে কারিকা বাংলাদেশ হস্তশিল্প সমবায় ফেডারেশন লিমিটেড কর্তৃক মাস্টার ক্রাফটসম্যান মৃৎশিল্পী হিসেবে আজীবন শিল্পকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানপত্র গ্রহণ করেন।

তিনি ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত তিনি কারিকা বাংলাদেশ হস্তশিল্প সমবায় ফেডারেশন লিমিটেডের পরিচালকের দায়িত্ব এবং ১৯৭৬-১৯৭৭ পর্যন্ত সমাজকল্যাণ অধিদফতরের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

putul33

ছিলেন মানবিক কাজেও

মরন চাঁদ গবেষণামূলক কাজও করেছেন। তিনি গবেষণার জন্য নিজ গৃহে স্টুডিও ও চুল্লি স্থাপন করেন। তার হাতের ছোঁয়ায় কাদা মাটি হয়েছে প্রাণবন্ত। তিনি চমৎকার সব পটারি ও টেপাপুতুল তৈরি করতেন। তার তৈরি টেপাপুতুল বিদেশেও রফতানি হয়েছে।

শুধু গবেষণা আর শিক্ষকতাই নয়, তিনি স্থানীয় যুবক ও যুব মহিলাদের মৃৎশিল্পের ওপর প্রশিক্ষণও দেন। পাল পরিবারের পাশাপাশি বহু মুসলমান পরিবারের সদস্যরা তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শিল্পচর্চা এবং সচ্ছলভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে সক্ষম হন।

‘আর্ট অ্যান্ড লাইফ ইন বাংলাদেশ’ গ্রন্থে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে শিল্পী মরণ চাঁদ পালের জীবন এবং শিল্পকর্মকে স্থান দিয়েছেন ফোকলোর প্রফেসর হেনরি গ্লাসি। এই গ্রন্থটি ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি প্রেস কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, মরণ চাঁদ পাল ২০১৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ওই বছরের ৬ মার্চ বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। তিনি স্ত্রী, ২ মেয়ে, ১ ছেলে, নাতি-নাতনী রেখে যান।

এএম/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর