মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

পহেলা বৈশাখ ঘিরে বাড়ে গুরুত্ব: বাংলা সনের অতীত-বর্তমান

সাখাওয়াত হোসাইন
প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৯ এএম

শেয়ার করুন:

পহেলা বৈশাখ ঘিরে বাড়ে গুরুত্ব: বাংলা সনের অতীত-বর্তমান
পহেলা বৈশাখ ঘিরে বাড়ে গুরুত্ব। ছবি: ঢাকা মেইল

বাংলা সনের কথা মানুষ মনে না রাখলেও পহেলা বৈশাখ আসলেই আলোচনায় আসে বাংলা সনের। সেইসঙ্গে বাংলা সনের বাড়ে গুরুত্ব, বাঙালির ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পালন করা হয় পহেলা বৈশাখ। নানা আয়োজনের মাধ্যমে বরণ করে নেওয়া হয় বাংলা সন। দিনটিকে ঘিরে সারাদেশেই বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। তাই বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ কেবল একটি বর্ষপঞ্জি নয়— এটি বাঙালি জাতির হাজার বছরের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বাংলা সনেও ইংরেজি আর আরবির মতো রয়েছে ১২টি মাস। যথা-বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র। এরমধ্যে বাঙালির কাছে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বৈশাখ। পহেলা বৈশাখে খাজনা পরিশোধের দিন 'পুণ্যাহ' উৎসব হতো, যা বর্তমানে ব্যবসার 'হালখাতা' ও সংস্কৃতির ধারক হয়ে উঠেছে।


বিজ্ঞাপন


উৎপত্তি ও প্রবর্তনের ইতিহাস

বাংলা সনের সূচনা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য থাকলেও সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো— মুঘল সম্রাট আকবরের আমলেই এর প্রচলন ঘটে। ১৬শ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে কৃষিকাজ মূলত ঋতুর উপর নির্ভরশীল ছিল, কিন্তু খাজনা আদায় করা হতো হিজরি সনের ভিত্তিতে, যা ছিল চন্দ্রনির্ভর। ফলে কৃষকদের জন্য তা ছিল অসুবিধাজনক।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য আকবর তার রাজকীয় জ্যোতির্বিদ ও পণ্ডিতদের দিয়ে একটি নতুন সনের প্রবর্তন করান। ১৫৮৪ সালে এই নতুন বর্ষপঞ্জি চালু হয়, যা ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল। পরে এটি ‘বাংলা সন’ বা ‘বঙ্গাব্দ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

বাংলা সনের গণনা শুরু ধরা হয় ৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে। অর্থাৎ ইংরেজি সনের সঙ্গে বাংলা সনের ব্যবধান প্রায় ৫৯৩ বছর (কখনও ৫৯৪, বছরের শুরুর পার্থক্যের কারণে)।


বিজ্ঞাপন


প্রায় ১৩০০ বছরের দীর্ঘ বিবর্তনে বাংলা ভাষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রচুর পরিমাণে দেশীয় এবং বিদেশি শব্দ। বহু শতাব্দী পর ১৯ শতকে এসে রাজা রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগরের হাতে বাংলা চূড়ান্ত রূপ পায়। বর্তমানে বাংলা ভাষা মানব সভ্যতার ইতিহাসে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি স্বতন্ত্র ভাষা। বিশ্ব জুড়ে প্রায় ৩০ কোটি মানুষের মাতৃভাষা ভাষা বাংলা। পৃথিবীর ভাষাগুলোর মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহৃত মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার অবস্থান পঞ্চম এবং শুধু কথ্য ভাষা হিসেবে অবস্থান ষষ্ঠ।

boi_1

কৃষি ও অর্থনীতিতে বাংলা সনের ভূমিকা

বাংলা সনের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের সুবিধা দেওয়া। ফসল তোলার মৌসুম অনুযায়ী খাজনা আদায় করা সহজ করতে এই সন চালু করা হয়। ফলে কৃষকরা আর আগাম বা অসময়ে কর দিতে বাধ্য হতেন না। গ্রামীণ জীবনে আজও বাংলা সনের প্রভাব স্পষ্ট। জমির হিসাব, ফসলের সময়সূচি, বীজ বপন ও ফসল কাটার সময় নির্ধারণ— সবকিছুতেই বাংলা সনের ব্যবহার দেখা যায়।

বৈশাখে শোভাযাত্রা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের সকালে শোভাযাত্রা বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। সেখানে সব শ্রেণি-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। এর জন্য বানানো হয় বিভিন্ন রঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি। ১৯৮৯ সাল থেকে এই শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখ উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ঢাকায় পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সংগীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহ্বান।

আধুনিক জীবনে বাংলা সনের ব্যবহার

বর্তমানে বাংলাদেশে বাংলা সন সরকারি ও সাংস্কৃতিকভাবে ব্যবহৃত হয়। জাতীয় দিবস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন উৎসবে বাংলা তারিখ ব্যবহার করা হয়। যদিও দৈনন্দিন কাজকর্মে ইংরেজি ক্যালেন্ডার বেশি ব্যবহৃত হয়, তবুও বাংলা সন তার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব হারায়নি। বরং এটি বাঙালির পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

boi_3

জানতে চাইলে বাংলাবিদ অধ্যাপক শাহানাজ আখতার ঢাকা মেইলকে বলেন, বাংলা সন শুধুমাত্র সময় গণনার একটি পদ্ধতি নয়— এটি বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনবোধের প্রতিচ্ছবি। কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে আধুনিক নগরসভ্যতা— প্রতিটি স্তরে এর ছাপ বিদ্যমান।

তিনি আরো বলেন, বিশ্বায়নের এই যুগেও বাংলা সন আমাদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। তাই বাংলা সনের আদ্যোপান্ত জানা মানে নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন করে আবিষ্কার করা।

অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, বাংলা সনের উৎপত্তি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না, এটি ছিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। মুঘল আমলে কৃষকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই এই সনের প্রচলন করা হয়। এর মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই, কীভাবে একটি ক্যালেন্ডার সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। বাংলা সন আমাদের ইতিহাসের একটি জীবন্ত দলিল।

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলা সনের সঙ্গে ঋতুচক্র ও কৃষিকাজের যে সম্পর্ক, তা বিশ্বের অনেক ক্যালেন্ডারের তুলনায় বেশি বাস্তবধর্মী ও প্রাকৃতিক।’

ইতিহাসবিদ ও লেখক অধ্যাপক সোহানা মাহবুব বলেন, বাংলা সন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি শক্তিশালী প্রতীক। পহেলা বৈশাখ আজ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বহিঃপ্রকাশ।

তিনি আরো বলেন, বাংলা অ্যাকাডেমির সংস্কারের ফলে বাংলা সন আধুনিক জীবনের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। তবে আমাদের উচিত দৈনন্দিন জীবনেও বাংলা সনের ব্যবহার বাড়ানো, যাতে নতুন প্রজন্ম এর সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে পারে।

এসএইচ/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর