সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের উদ্যোগে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় হকার উচ্ছেদ অভিযানে সাময়িকভাবে কিছুটা সফলতা মিললেও হকারদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য দূরীকরণের পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।
একই সঙ্গে রাজধানীর হকারকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি, ফুটপাত বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে যে অবৈধ সিন্ডিকেট এবং সেটার রাজনৈতিক অর্থনীতি আছে, তার পেছনের শক্তিগুলো চিহ্নিত করা দরকার বলেও মনে করছে সংগঠনটি।
বিজ্ঞাপন
আইপিডি বলছে, বিচ্ছিন্নভাবে হকার উচ্ছেদ অতীতে টেকসই হয়নি, এবারের অভিযানে ও সেটা হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের পাঠানো এক বিবৃতিতে এমনটাই জানানো হয়। এতে সার্বিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই হকার উচ্ছেদ, ব্যবস্থাপনা, বিকল্প কর্মসংস্থান ও নগর দারিদ্র্যদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরি করার দাবিও জানানো হয়। পাশাপাশি ১০ দফা সুপারিশও করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের দরিদ্র লোকেরা কর্মসংস্থান এর জন্য ঢাকার রাজপথে হকার বাণিজ্যকে দীর্ঘদিন ধরেই অনানুষ্ঠানিক বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এই ব্যবস্থার এক ধরনের অর্থনৈতিক প্রভাব ও গুরুত্ব আছে। এতদসত্ত্বেও ২ কোটির অধিক জনসংখ্যাকে ধারণ করা ঢাকা শহরের মতো মেগা শহরে পথচারী ও যানবাহনের চলাচলের জন্য ফুটপাতগুলোকে হকারদের অনুমোদনহীন ব্যবসা থেকে মুক্ত করে পথচারীদের চলাচলের জন্য সুযোগ করে দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ফলে সামগ্রিকভাবে আমাদের হকার ও নগর দারিদ্র্য সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই সমাধান খুঁজতে হবে সরকারকে। এটা নিশ্চিতভাবেই বলা দরকার, সারা বাংলাদেশের দারিদ্র্যতা সমাধান ঢাকার রাজপথ হতে পারে না। ঢাকার রাজপথে কোনো ধরনের অনুমোদন ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অবাধে হকার বাণিজ্য করবার অবাধ সুযোগ থাকলে কোনো ধরনের বিকল্প ব্যবস্থাই হকার সমস্যার টেকসই সমাধান দিতে পারবে না।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক হকার উচ্ছেদ অভিযানের ফলাফল হচ্ছে— কিছু এলাকায় হকার উচ্ছেদে সাময়িক সফলতা এসেছে, ফলে নাগরিকেরা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারছে। কোথাও কোথাও উচ্ছেদকৃত এলাকায় হকাররা পুনরায় ফিরে এসেছে। কোনো কোনো এলাকায় উদ্ধারকৃত রাস্তায় অবৈধ গাড়ি পার্কিংসহ অন্যান্য ব্যবহার আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। উচ্ছেদ অভিযানের দোহাই দিয়ে কোথাও আগের চেয়ে বেশি চাঁদাও চাওয়া হচ্ছে, নতুন রাজনৈতিক দখলদার ও চাঁদাবাজ অনেক এলাকায় সক্রিয় হচ্ছে। এই ধরনের জটিল বাস্তবতায় ঢাকা মহানগরীর হকার সমস্যার সমাধানে তার প্রকৃত কারণসমূহ উদঘাটন করে সমস্যার টেকসই সমাধান পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।
বিজ্ঞাপন
আইপিডি বলছে, এটা বিস্ময়কর যে, মেগাসিটি ঢাকায় এখনো কোনো কার্যকর হকার নীতিমালা কিংবা আইন নেই। ফলে উচ্ছেদ অভিযান হয়ে উঠছে সাময়িক ব্যবস্থা, আর আড়ালেই থেকে যাচ্ছে হকার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট। হকার উচ্ছেদের আগে যারা হকার বসায় বিশেষ করে লাইনম্যান, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী চাঁদার ভাগ পায়, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। কিন্তু কোনো সরকারই এ সিন্ডিকেট ভাঙতে তৎপর হয়নি; বরং বারবার আঘাত নেমে এসেছে হকারদের ওপরই। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নগরীর নিম্ন আয়ের মানুষ। দখলদার ও চাঁদাবাজ এই সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নেবার দাবি জানাচ্ছে আইপিডি। এর জন্যে প্রয়োজন সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কারণ হকার সংশ্লিষ্ট চাঁদাবাজদের অনেকেই সরকারি দলের রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে থাকেন।
সংগঠনটি বলছে, ঢাকা থেকে হকার উচ্ছেদে দীর্ঘমেয়াদী সুফল পেতে কেবল উচ্ছেদ না করে পরিকল্পিত পুনর্বাসন ও হকারদের তালিকাভুক্ত করা প্রয়োজন। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া উচ্ছেদ কার্যকর হয় না, যা হকারদের আবারো ফুটপাতে ফিরিয়ে আনে। ঢাকার ফুটপাত ও রাজপথকে সারাদেশের দরিদ্রদের ভার নিতে হবে, এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে এলাকাভিত্তিক হকার ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করতে হবে । ফুটপাত উচ্ছেদ কেবল একটি অভিযান না হয়ে, এটি একটি নিয়মিত ব্যবস্থাপনার অংশ হওয়া উচিত।
সংগঠনটি আরো বলছে, হকার সমস্যার সমাধানে সিটি কর্পোরেশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও হকারদের নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ফুটপাতে কে, কখন বসছেন— তা চিহ্নিত করতে হকারদের ডাটাবেজ তৈরি করে তালিকাভুক্ত করা জরুরি, অন্যথায় হকারের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে উচ্ছেদের পাশাপাশি নির্দিষ্ট স্থানে বা সময়ে বসবার ব্যবস্থা করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
বিবৃতিতে ঢাকা মহানগরীর হকার সমস্যার টেকসই সমাধানে আইপিডির পক্ষ থেকে দশ দফা প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। এগুলো হলো—
১. পরিকল্পিত হকার জোন: গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাত ও করিডোর দখলমুক্ত রাখবার পাশাপাশি, যেসব সড়কে সুযোগ আছে, সেখানে পরিকল্পনামাফিক নির্দিষ্ট এলাকায় বৈধভাবে হকার বসার ব্যবস্থা করা।
২. হকার নিয়ন্ত্রণ: অনুমোদনহীন হকার যত্রতত্র অবাধে নতুন করে হকার বসবার বিভিন্ন বন্দোবস্তকে প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের স্থানীয় কাউন্সিল এর মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি করে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
৩. লাইসেন্সিং ও ডাটাবেজ তৈরি: বিদ্যমান হকারদের বায়োমেট্রিক আইডেন্টিফিকেশন, জিও-লোকেশন চিহ্নিতকরণ, ডিজিটাল আইডি, লাইসেন্স, নিবন্ধিত হকার তালিকা অতি দ্রুত প্রণয়ন করবার মাধ্যমে হকারদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা। পাশাপাশি নগরে নির্দিষ্ট স্থান ও এলাকা চিহ্নিত করবার মাধ্যমে পিক আওয়ারে ফুটপাত পথচারীর জন্য ও অফ-পিক সময়ে নিয়ন্ত্রিত হকার কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া।
৪. পুনর্বাসন ও বিকল্প বাজার: হলিডে মার্কেট, নাইট মার্কেট, অস্থায়ী/স্থায়ী মার্কেট শেড তৈরি করা।
৫. কাঠামোগত সংস্কার: চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ এর জন্য সিটি কর্পোরেশন, ওয়ার্ড কাউন্সিল, পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বয়ে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা।
৬. অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা: হকার, নাগরিক ও পথচারী, ব্যবসায়ী, সিটি কর্পোরেশন ও প্রশাসন— সব পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করে হকার ও দারিদ্র্য সমস্যার সমন্বিত সমাধানের জন্য অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা।
৭. চাঁদাবাজ সিন্ডিকটদের আইনের আওতায় আনা: হকার সংশ্লিষ্ট চাঁদাবাজি ও দখলদারদের যে অবৈধ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তাদের চিহ্নিত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা এবং জড়িতদের রাজনৈতিক-সামাজিক-অফিসিয়াল পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে অতিসত্বর আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৮. নীতিমালা ও আইন: হকার ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করে বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
৯. সামাজিক সুরক্ষা: যে সকল হকারদের পুনর্বাসন সম্ভবপর হবে না, নগর দরিদ্র হিসেবে তাদের চিহ্নিত করে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় নিয়ে এসে ফ্যামিলি কার্ড এর বন্দোবস্ত করা দরকার ।
১০. বিকল্প কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ: হকারদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় এনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ইকোনমিক জোনসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি দেশের কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করে ঢাকামুখী দরিদ্র লোকদের অভিগমন রোধ করতে হবে।
এএম/এফএ




